ব্লেক লাইভলি ও জাস্টিন বালডোনি। কোলাজ
ব্লেক লাইভলি ও জাস্টিন বালডোনি। কোলাজ

ব্যক্তিগত বার্তা ফাঁস, যৌন হয়রানির মামলায় নতুন মোড়

হলিউডের তারকাবহুল এক আইনি লড়াইয়ে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে অভিনেত্রী ব্লেক লাইভলির ব্যক্তিগত বার্তা। দীর্ঘদিনের বন্ধু টেইলর সুইফটের সঙ্গে আদান–প্রদান করা টেক্সট মেসেজ ও ইমেইলসহ বিপুল পরিমাণ ব্যক্তিগত যোগাযোগ প্রকাশ্যে এনেছেন অভিনেতা–পরিচালক জাস্টিন বালডোনির আইনজীবীরা। আদালতে বিচার শুরুর প্রস্তুতির অংশ হিসেবে এসব নথি জনসমক্ষে উন্মুক্ত করা হয়েছে।
এই মামলার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ২০২৪ সালের আলোচিত রোমান্টিক ড্রামা ‘ইট এন্ডস উইথ আস’। ছবিটির শুটিং চলাকালে নিজের সঙ্গে দুর্ব্যবহার ও যৌন হয়রানির অভিযোগ এনে ব্লেক লাইভলি মামলা করেন জাস্টিন বালডোনি ও তাঁর নিয়োজিত এক ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞের বিরুদ্ধে। লাইভলির অভিযোগ, তিনি শুটিং সেটে বালডোনির আচরণ নিয়ে আপত্তি জানানোর পর, পরিকল্পিতভাবে তাঁর সুনাম ক্ষুণ্ন করার একটি প্রচারণা চালানো হয়।

প্রকাশ্যে আসা নথি ও আইনি প্রেক্ষাপট
নিউইয়র্ক সিটির একটি ফেডারেল আদালতে গতকাল বৃহস্পতিবার এ–সংক্রান্ত শুনানির আগেই নথিগুলো উন্মুক্ত করা হয়। আদালতে আলোচনার বিষয় ছিল—এই দীর্ঘ এক বছরের তিক্ত আইনি লড়াই আদৌ বিচার পর্যন্ত গড়াবে কি না। ইতিমধ্যেই এই মামলা হলিউডের ক্ষমতার কাঠামো, প্রভাব বিস্তার নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
এর আগে বালডোনি এবং তাঁর প্রযোজনা সংস্থা ওয়েফেয়ারার স্টুডিও পাল্টা মামলা করেছিলেন ব্লেক লাইভলি ও তাঁর স্বামী, ‘ডেডপুল’ অভিনেতা রায়ান রেনল্ডসের বিরুদ্ধে। অভিযোগ ছিল মানহানি ও চাঁদাবাজির। তবে গত বছরের জুনে বিচারক লুইস জে. লাইম্যান সেই মামলা খারিজ করে দেন। লাইভলির মূল মামলার বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত রায় দেননি তিনি।

বর্তমানে বিচার শুরু হওয়ার সম্ভাব্য তারিখ নির্ধারিত রয়েছে ১৮ মে। লাইভলির আইনি দলের এক নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে, টেইলর সুইফট ছাড়াও এই মামলার বিষয়ে তথ্য থাকতে পারে সুপারমডেল জিজি হাদিদ, অভিনেতা এমিলি ব্লান্ট, অ্যালেক্সিস ব্লেডেল, আমেরিকা ফেরেরা, হিউ জ্যাকম্যান, ক্যান্ডেস ওউয়েন্স, মিডিয়া ব্যক্তিত্ব পেরেজ হিলটন ও ডিজাইনার অ্যাশলি অ্যাভিনিওনের।

‘ইট এন্ডস উইথ আস’ সিনেমার দৃশ্যে জাস্টিন বালডোনি ও ব্লেক লাইভলি। আইএমডিবি

টেইলর সুইফটের বার্তায় বালডোনিকে ঘিরে সমালোচনা
গত মঙ্গলবার রাতে যে টেক্সট ও ইমেইলগুলো প্রকাশ্যে আসে, তার বেশির ভাগই বালডোনির আইনজীবীদের দাখিল করা নথির অংশ। তাঁদের দাবি, এসব বার্তা প্রমাণ করে যে ব্লেক লাইভলি তাঁর ক্ষমতাধর ও প্রভাবশালী বন্ধুদের ব্যবহার করে কৌশলগতভাবে বালডোনির জনইমেজ নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছিলেন।

বার্তাগুলোতে দেখা যায়, দ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে আসার আগে ও পরে—উভয় সময়েই টেইলর সুইফট লাইভলিকে হলিউডের ক্ষমতার সমীকরণ কীভাবে নিজের পক্ষে ব্যবহার করা যায়, সে বিষয়ে পরামর্শ দিচ্ছিলেন।

২০২৪ সালের এপ্রিল মাসে ব্লেক লাইভলি টেইলর সুইফটকে ‘ইট এন্ডস উইথ আস’ ছবির ট্রেলারের একটি লিংক পাঠান। ট্রেলারটি তখনো আনুষ্ঠানিকভাবে মুক্তি পায়নি, তবে সেখানে ব্যবহার করা হয়েছিল সুইফটের গান।

টেইলর সুইফট

জবাবে টেইলর সুইফট লেখেন, ‘ওরা যেভাবে গানটা ব্যবহার করেছে, সেটা আমার খুব ভালো লেগেছে। ওয়েলকাম টু হলিউড, জাস্টিন।’
এরপর দুজনেই আলোচনা করেন, ট্রেলারে গান ব্যবহারের বিষয়টি দর্শক কীভাবে ব্যাখ্যা করতে পারে।

সুইফট লেখেন, ‘জাস্টিন যদি কৌশলী হতো, তাহলে সে ট্রেলারে টেইলর সুইফটের গান রাখত না। কারণ, এতে ছবির ওপর তোমার প্রভাব আরও বেড়ে যায়।’
লাইভলি জবাবে লেখেন, ‘তুমি একদম ঠিক। আর এটা ধরার জন্য তুমি ভীষণ বুদ্ধিমান। তার উচিত ছিল তোমার গান থেকে দূরে থাকা। আমি এটা একেবারেই ভাবিনি। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে—সে কতটা বোকামি করেছে। ওপরে থাকার ভাব দেখানোর এটাই ছিল তার একমাত্র সুযোগ।’

‘আমি আর আগের মতো নেই’—বন্ধুত্বের টানাপোড়েন
আরেকটি বার্তালাপে, ২০২৪ সালের ৪ ডিসেম্বর ব্লেক লাইভলি টেইলর সুইফটকে লেখেন, তিনি নিজেকে ‘খারাপ বন্ধু’ মনে করছেন। কারণ, কয়েক মাস ধরে তিনি শুধু নিজের সমস্যার কথাই বলে যাচ্ছেন।
লাইভলি লেখেন, ‘এই পুরো সময়টায় তুমি শুধু আমার পাশে থাকোনি, বরং আমাকে ছাড়ও দিয়েছো—আমি কতটা ডুবে ছিলাম সেটা বুঝে। কিন্তু তবু মনে হয়, কোথাও কিছু ঠিক নেই।’
জবাবে টেইলর সুইফট খোলাখুলি জানান, লাইভলির কথাবার্তায় তিনি একধরনের পরিবর্তন লক্ষ করেছেন।

‘ইট এন্ডস উইথ আস’ সিনেমার দৃশ্যে ব্লেক লাইভলি ও জাস্টিন বালডোনি। আইএমডিবি

সুইফট লেখেন, ‘আমি আগেও এমন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে গেছি। জানি, এটা কতটা গ্রাস করে ফেলে। বলতে খারাপ লাগছে, কারণ তোমার মেসেজগুলোর উদ্দেশ্য খুব ভালো—কিন্তু শেষ কয়েকটা পড়ে মনে হয়েছে, যেন ২০০ জন কর্মীর কাছে পাঠানো কোনো করপোরেট ইমেইল পড়ছি। তুমি “আমরা” শব্দটা ১৮ বার ব্যবহার করেছ।’
তিনি আরও লেখেন, ‘আমি আমার সেই পুরোনো, স্বাভাবিক বন্ধুটাকে মিস করি—যে একবচনে কথা বলে, বারবার “আমরা” বলে না।’

‘তুমি জিতেছ’—বন্ধুর পাশে থাকার ঘোষণা
কয়েক সপ্তাহ পর টেইলর সুইফট লাইভলিকে লেখেন, ‘তুমি জিতেছ। তুমি করে দেখিয়েছ।’

এর সঙ্গে তিনি একটি প্রতিবেদন শেয়ার করেন, যেখানে বলা হয়েছিল—জাস্টিন বালডোনিকে তাঁর ট্যালেন্ট এজেন্সি বাদ দিয়েছে।
সুইফট লেখেন, ‘এত দ্রুত হবে ভাবিনি।’  তিনি আরও যোগ করেন, লাইভলি এমন অনেক মানুষকে সাহায্য করেছেন, যাদের আর কখনো এমন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে হবে না।

লাইভলি আবেগঘন জবাবে লেখেন, ‘আমি তোমাকে ভীষণ ভালোবাসি। তুমি না থাকলে এই পুরো সময়টা আমি সামলাতে পারতাম না।’

ব্লেক লাইভলি। ছবি: রয়টার্স

আদালতে উত্তপ্ত বিতর্ক
গত বৃহস্পতিবার আদালতে বালডোনির আইনজীবী জনাথন বাখ অভিযোগ করেন, লাইভলির মামলায় এমন অনেক ‘তুচ্ছ ও খুঁটিনাটি অভিযোগ’ রয়েছে, যা শত্রুভাবাপন্ন কর্মপরিবেশ প্রমাণ করার আইনি মানদণ্ড পূরণ করে না।
এতে বিচারক পাল্টা বলেন, ‘অনেক ছোট ছোট বিষয় একসঙ্গে মিলেই তো বড় কিছু হয়ে উঠতে পারে।’

লাইভলির আইনজীবী এসরা হাডসন আদালতে বলেন, শুটিং সেটে একাধিকবার লাইভলির ব্যক্তিগত সীমা লঙ্ঘন করা হয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, একবার কোনো পূর্ব আলোচনা ছাড়াই বালডোনি দৃশ্যের বাইরে গিয়ে লাইভলিকে চুমু খেতে এগিয়ে আসেন।
হাডসনের ভাষায়, ‘সেই মুহূর্তে তাঁর সীমা স্পষ্টভাবেই লঙ্ঘিত হয়েছে। এটা ছিল অপ্রত্যাশিত।’

বিচারক যখন বলেন, চলচ্চিত্রের সেটে সম্মতির বিষয়টি কীভাবে ব্যাখ্যা করা যায়, তা বুঝতে তাঁর সমস্যা হচ্ছে—তখন হাডসন আদালতকে পুরো পরিস্থিতির সামগ্রিকতা বিবেচনা করার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, একাধিক ঘটনায় লাইভলিকে অপমানজনক ও অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে ফেলা হয়েছে, এমনকি একবার তাঁকে অপ্রত্যাশিতভাবে অস্বস্তিকর এক যৌন দৃশ্যের অনুকরণ করতে বাধ্য করা হয়।
ব্লেক লাইভলি–জাস্টিন বালডোনি মামলাটি এখন আর শুধু দুই অভিনেতার আইনি দ্বন্দ্ব নয়। এটি হলিউডে ক্ষমতা, বন্ধুত্ব, প্রভাব ও নারীদের কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা নিয়ে এক বৃহত্তর আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ব্যক্তিগত বার্তা প্রকাশের মাধ্যমে সেই বিতর্ক আরও তীব্র হয়েছে—এখন দেখার বিষয়, আদালতের রায়ে শেষ পর্যন্ত কোন দিকটি প্রাধান্য পায়।

এপি অবলম্বনে