
অভিনয়শিল্পীর কাছে পর্দার চরিত্র আর বাস্তব জীবনের মানুষ—দুটি আলাদা সত্তা। কিন্তু পরিবারের সদস্যদের কাছে সেই সীমারেখা সব সময় এতটা স্পষ্ট থাকে না। বিশেষ করে প্রিয় মানুষটিকে পর্দায় অন্তরঙ্গ বা নগ্ন দৃশ্যে দেখলে অস্বস্তিতে পড়তে পারেন পরিবারের সদস্যরা। এমন অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে হলিউড অভিনেত্রী সিডনি সুইনিকেও। ‘ইউফোরিয়া’ সিরিজে ক্যাসি হাওয়ার্ড চরিত্রে অভিনয় করে ব্যাপক পরিচিতি পাওয়া এই অভিনেত্রীর অন্তরঙ্গ দৃশ্য দেখে তাঁর পরিবারে লোকদের প্রতিক্রিয়া কেমন ছিল?
বাবাকে কিছুই বলেননি সিডনি
‘ইউফোরিয়া’ সিরিজে ক্যাসি চরিত্রে অভিনয় করে সিডনি সুইনি আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিতি পান। ২০১৯ সালে শুরু হওয়া এই সিরিজে তাঁর চরিত্রের গল্পের গুরুত্বপূর্ণ অংশজুড়েই রয়েছে সম্পর্ক, যৌনতা, শরীর নিয়ে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি ও মানসিক টানাপোড়েন। ফলে চরিত্রটির প্রয়োজনে বেশ কিছু অন্তরঙ্গ ও নগ্ন দৃশ্যেও অভিনয় করতে হয়েছে তাঁকে।
তবে সিরিজটি দেখার আগে পরিবারের সবাইকে এসব বিষয়ে জানাননি সিডনি। ২০২৩ সালে এনবিসির সানডে টুডে উইথ উইলি গাইস্ট অনুষ্ঠানে নিজের পরিবারের প্রতিক্রিয়ার কথা বলতে গিয়ে অভিনেত্রী জানান, তাঁর মা আগে থেকেই জানতেন সিরিজে কী ধরনের দৃশ্য থাকতে পারে। কারণ, তিনি কয়েকবার শুটিং সেটে গিয়েছিলেন। মেয়ের চরিত্র ও গল্প নিয়েও তাঁর সঙ্গে কথা হয়েছিল।
কিন্তু বাবাকে এসব কিছু জানাননি সিডনি। বরং বাবার সঙ্গে কাজ নিয়ে কথা বলার বিষয়টি তাঁর কাছে কিছুটা অস্বস্তিকর ছিল। সিডনি বলেন, বাবার সঙ্গে তাঁর সাধারণত বাবা-মেয়ের সম্পর্কের বিষয়েই কথা হয়, কাজের বিষয়ে খুব বেশি আলোচনা হয় না। তাই ‘ইউফোরিয়া’–তে তাঁর চরিত্রে কী আছে, সেটি বাবাকে কীভাবে বলবেন, তা তিনি বুঝতে পারেননি।
চুপি চুপি সিরিজ দেখতে বসে...
এরপর ঘটে মজার ঘটনা। সিডনিকে না জানিয়েই তাঁর বাবা নিজের বাবা-মায়ের সঙ্গে বসে সিরিজটি দেখতে শুরু করেন। অর্থাৎ সিডনির বাবা এবং দাদা দুজনই একসঙ্গে সিরিজটি দেখতে বসেছিলেন। কিন্তু পর্দায় মেয়েকে এমন দৃশ্যে দেখার পর তাঁরা খুব বেশি সময় তা দেখতে পারেননি। সিডনির ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁর বাবা ও দাদা সিরিজটি বন্ধ করে দিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যান। ২০২৩ সালের ওই সাক্ষাৎকারে ঘটনাটি বলতে গিয়ে অভিনেত্রী হেসেছিলেন।
অবশ্য পরিবারের অন্য সদস্যদের প্রতিক্রিয়া ছিল ভিন্ন। সিডনি জানান, তাঁর দাদি বরং তাঁর কাজের বড় ভক্ত। এমনকি অভিনেত্রী বিভিন্ন দেশে শুটিংয়ে গেলে অনেক সময় দাদিকেও কখনো সঙ্গে নিয়ে যান। কোনো কোনো প্রজেক্টে দাদিকে অতিরিক্ত চরিত্র হিসেবেও ক্যামেরার সামনে আনার কথা বলেছেন তিনি।
অন্তরঙ্গ দৃশ্যের জন্য ট্রলের শিকার
সিডনির জন্য ‘ইউফোরিয়া’ সিরিজের অন্তরঙ্গ দৃশ্যের বিষয়টি শুধু পরিবারের অস্বস্তিতেই থেমে থাকেনি। সিরিজটি জনপ্রিয় হওয়ার পর তাঁর চরিত্রের নগ্ন দৃশ্যের স্ক্রিনশট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। আরও অস্বস্তিকর বিষয় ছিল, সেসব ছবি তাঁর পরিবারের সদস্যদের ট্যাগ করেও ছড়ানো হয়।
২০২২ সালে দ্য ইনডিপেনডেন্টকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে সিডনি বলেন, ‘সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আমার চরিত্রের দৃশ্যের ছবি ছড়িয়ে পড়ার বিষয়টি কষ্ট দিয়েছিল। ছোট ভাইয়ের অ্যাকাউন্টেও এসব পোস্টের ট্যাগ পৌঁছায়। আমাকে নিয়ে পরিবারের সদস্যদের এমন পরিস্থিতির মধ্যে পড়তে হবে, যা আমার জন্য অসম্মানজনক ও কষ্টদায়ক।’ ২০২৩ সালেও তিনি জানান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ট্রল করে তাঁর নগ্ন দৃশ্যের স্ক্রিনশট নিয়ে পরিবারের বাইরে কাছের অনেক মানুষকেও পাঠানো হয়েছিল। এই অভিনেত্রীর মতে, পর্দায় তিনি যে চরিত্রে অভিনয় করেন, সেটি তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের পরিচয় নয়। তাই চরিত্রের দৃশ্যকে কেন্দ্র করে পরিবারের সদস্যদের টেনে আনা তাঁর কাছে অন্যায্য।
‘নগ্নতার জন্য অভিনয় নিয়ে আলোচনা হয় না’
সিডনি সুইনির আরেকটি আক্ষেপ রয়েছে। ‘ইউফোরিয়া’–তে তাঁর অভিনয় প্রশংসিত হলেও অনেক সময় তাঁর অভিনয়ের চেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে নগ্ন দৃশ্য। ২০২২ সালে দ্য ইনডিপেনডেন্টকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, ‘আমি “ইউফোরিয়া” অভিনয় নিয়ে গর্বিত। কিন্তু নগ্ন দৃশ্যের কারণে অনেকে আমার অভিনয়ের দিকটি নিয়ে আলোচনা করেন না।’ সিডনির মতে, পর্দায় নগ্নতার ক্ষেত্রে নারী অভিনয়শিল্পীদের নিয়ে একধরনের দ্বৈত মানদণ্ড কাজ করে। তাঁর ভাষ্য, পুরুষ অভিনেতা অন্তরঙ্গ দৃশ্য বা শরীর দেখালেও অনেক সময় সেটি অভিনয়ের অংশ হিসেবেই মূল্যায়িত হয়। কিন্তু নারী অভিনেত্রীর ক্ষেত্রে নগ্ন দৃশ্যটিই আলোচনার কেন্দ্র হয়ে ওঠে।
পর্দার ক্যাসি আর বাস্তবের সিডনি এক নন
‘ইউফোরিয়া’ সিরিজে ক্যাসি হাওয়ার্ড এমন এক তরুণীর চরিত্র, যে ভালোবাসা, সম্পর্ক, শরীর এবং অন্যের স্বীকৃতির মধ্যে নিজের পরিচয় খুঁজতে থাকে। চরিত্রটির জীবনের নানা সংকট তুলে ধরতে সিরিজটিতে অন্তরঙ্গতা ও নগ্নতাকে গল্প বলার একটি উপাদান হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে।
কিন্তু বাস্তব জীবনে সিডনি সুইনি আর তাঁর অভিনীত ক্যাসি এক মানুষ নন। অভিনেত্রী নিজেও বারবার এই পার্থক্যের কথা বলেছেন। তাঁর পরিবারের সদস্যদের সামনে সিরিজটি দেখার অভিজ্ঞতা সেই পার্থক্যটাকেই আরও স্পষ্ট করে দেয়; দর্শকের কাছে যা একটি চরিত্রের দৃশ্য, পরিবারের কাছে সেটি তাঁদের পরিচিত একজন মানুষকে পর্দায় দেখার অভিজ্ঞতা।
আর সিডনির বাবা ও দাদার ক্ষেত্রে সেই অভিজ্ঞতা এতটাই অস্বস্তিকর হয়েছিল যে তাঁরা শেষ পর্যন্ত টেলিভিশন বন্ধ করে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যান। অন্যদিকে দাদি থেকে যান তাঁর অন্যতম সমর্থক হয়ে। এই দুই ধরনের পারিবারিক প্রতিক্রিয়াই দেখায়, পর্দায় তারকার শরীর বা অন্তরঙ্গ দৃশ্য দেখা দর্শকের জন্য যতটা সহজ, তার পরিবারের জন্য বিষয়টি সব সময় ততটা সহজ নয়।