বাংলাদেশের জনপ্রিয় দুই ওয়েব সিরিজ ‘মহানগর’ ও ‘বোহেমিয়ান ঘোড়া’ এবার দেখা যাবে নেটফ্লিক্সে। আশফাক নিপুণ পরিচালিত ‘মহানগর’ এবং অমিতাভ রেজা চৌধুরীর ‘বোহেমিয়ান ঘোড়া’সহ হইচইয়ের ১৪টি সিরিজ যুক্ত হচ্ছে বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় এই স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মে। তবে নেটফ্লিক্সে ‘বোহেমিয়ান ঘোড়া’ মুক্তি পাবে ‘শাদি কা সিয়াপ্পা’ নামে। হইচই ও নেটফ্লিক্সের নতুন অংশীদারত্বের আওতায় বাংলা ভাষার এসব গল্প হিন্দি, তামিল ও তেলুগু ভাষায় দেখার সুযোগ পাবেন দর্শকেরা।
আজ বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) আনুষ্ঠানিকভাবে এই অংশীদারত্বের ঘোষণা দিয়েছে হইচই। প্রতিষ্ঠানটির সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, আগামী দুই বছরে হইচইয়ে মুক্তি পাওয়া সব নতুন সিরিজ হিন্দি, তামিল ও তেলুগু ভাষায় একচেটিয়াভাবে নেটফ্লিক্সে দেখানো হবে। পাশাপাশি হইচইয়ের আগে মুক্তি পাওয়া নির্বাচিত সিরিজও যুক্ত হবে প্ল্যাটফর্মটিতে। দুই প্রতিষ্ঠান যৌথভাবে নতুন মৌলিক সিরিজ নির্মাণেরও পরিকল্পনা করেছে।
নেটফ্লিক্সে বাংলাদেশের দুই সিরিজ
এই অংশীদারত্বের ঘোষণায় বাংলাদেশের দর্শকদের জন্য বিশেষ আকর্ষণ ‘মহানগর’ ও ‘বোহেমিয়ান ঘোড়া’। দুটি সিরিজই হইচইয়ে মুক্তির পর দর্শকমহলে আলোচনা তৈরি করেছে।
আশফাক নিপুণ পরিচালিত ক্রাইম থ্রিলার ‘মহানগর’-এর কেন্দ্রীয় চরিত্র ওসি হারুন। এই চরিত্রে অভিনয় করেছেন মোশাররফ করিম। থানাকে কেন্দ্র করে ক্ষমতার অপব্যবহার, অপরাধ, রাজনৈতিক প্রভাব ও নানা স্বার্থের দ্বন্দ্ব উঠে এসেছে সিরিজটির গল্পে। প্রচলিত পুলিশি চরিত্রের বাইরে ওসি হারুনের উপস্থিতি, তাঁর সংলাপ ও ঘটনাপ্রবাহ দর্শকদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি করে। সিরিজটির একাধিক মৌসুম নির্মিত হয়েছে।
অন্যদিকে অমিতাভ রেজা চৌধুরী পরিচালিত ‘বোহেমিয়ান ঘোড়া’য়ও রয়েছেন মোশাররফ করিম। তাঁর সঙ্গে অভিনয় করেছেন রুনা খান, সাদিয়া আয়মান, তানজিকা আমিন, মৌসুমী হামিদসহ অনেকে। সম্পর্ক, ব্যক্তিগত টানাপোড়েন ও বিচিত্র সব পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে এগিয়েছে সিরিজটির গল্প। হাস্যরসের পাশাপাশি এতে রয়েছে মানবিক সম্পর্কের নানা জটিলতা। নেটফ্লিক্সে সিরিজটির নাম রাখা হয়েছে ‘শাদি কা সিয়াপ্পা’। হিন্দিভাষী দর্শকদের কাছে গল্পটি নতুন নামে পরিচিতি পাবে। অন্যদিকে ‘মহানগর’ থাকছে ‘মহানগর’ নামেই।
তবে বাংলাদেশের এই দুই সিরিজ ঠিক কবে থেকে নেটফ্লিক্সে দেখা যাবে, তা এখনো নির্দিষ্ট করে জানানো হয়নি। কোন কোন দেশে সিরিজ দুটি পাওয়া যাবে, সে বিষয়েও আলাদা কোনো বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
তালিকায় আরও যেসব সিরিজ
নেটফ্লিক্সের ঘোষিত প্রথম তালিকায় মোট ১৪টি সিরিজ রয়েছে। বাংলাদেশের দুটি প্রযোজনার পাশাপাশি এতে জায়গা পেয়েছে কলকাতার বিভিন্ন ঘরানার আলোচিত ওয়েব সিরিজ।
তালিকায় রয়েছে ‘ম্যাডাম ইন্সপেক্টর’, ‘সম্পূর্ণা’, ‘লজ্জা’, ‘একেন স্যারজি’, ‘আনজান সায়ে’, ‘দ্য কার্স অব পর্ণশবরী’, ‘ব্লাডলাইনস’, ‘দ্য অ্যাডভেঞ্চার্স অব দাদি অ্যান্ড জগ্গা’, ‘রাত অভি বাকি হ্যায়’, ‘অচিন্ত: ট্রায়াল বাই ল’, ‘কুইন্স’এবং ‘পরিণীতা: আ লাভ স্টোরি’।
এসব সিরিজের গল্পে রয়েছে অপরাধ ও রহস্যের অনুসন্ধান, গোয়েন্দা অভিযান, লোককথাভিত্তিক ভৌতিক ঘটনা, নারীর ব্যক্তিগত ও সামাজিক সংকট, আদালতের লড়াই এবং প্রেমের নানা গল্প।
নেটফ্লিক্স জানিয়েছে, বিভিন্ন স্বাদের গল্পের এই সংগ্রহের উদ্দেশ্য দর্শকদের সামনে বাংলা বিনোদনের বৈচিত্র্য তুলে ধরা। ফলে যাঁরা বাংলা ভাষা বোঝেন না, তাঁরাও নিজেদের পরিচিত ভাষায় গল্পগুলো উপভোগ করার সুযোগ পাবেন।
৬ নভেম্বর আসছে প্রথম নতুন সিরিজ
অংশীদারত্বের আওতায় শুধু পুরোনো সিরিজই নয়, হইচইয়ের নতুন সিরিজও বাংলা ভাষায় মুক্তির সঙ্গে সঙ্গে হিন্দি, তামিল ও তেলুগু ভাষায় নেটফ্লিক্সে আসবে।
এই উদ্যোগের প্রথম নতুন সিরিজ ‘দ্য কার্সড টেম্পল অব কৌরিবুড়ি’। আগামী ৬ নভেম্বর মুক্তির কথা রয়েছে লোককথানির্ভর এই ভৌতিক সিরিজের। এতে অভিনয় করেছেন জিতু কমল, শোলাঙ্কি রায় ও পাওলি দাম।
লোকবিশ্বাস, রহস্য ও অতিপ্রাকৃত ঘটনাকে কেন্দ্র করে নির্মিত সিরিজটি হইচইয়ে বাংলায় মুক্তি পাবে। একই সময়ে নেটফ্লিক্সে পাওয়া যাবে এর হিন্দি, তামিল ও তেলুগু সংস্করণ। পরবর্তী মাসগুলোতে পর্যায়ক্রমে আরও নতুন সিরিজ যুক্ত হবে বলে জানিয়েছে নেটফ্লিক্স। তবে সেসব সিরিজের পূর্ণাঙ্গ তালিকা ও মুক্তির দিনক্ষণ এখনো প্রকাশ করা হয়নি।
শুধু সম্প্রচার নয়, তৈরি হবে নতুন সিরিজও
নেটফ্লিক্স ও হইচইয়ের এই সহযোগিতা কেবল কনটেন্ট সম্প্রচারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না। দুটি প্রতিষ্ঠান একসঙ্গে নতুন মৌলিক সিরিজও তৈরি করবে।
নেটফ্লিক্সের ঘোষণা অনুযায়ী, হইচইয়ের নির্বাচিত কিছু গল্প নতুনভাবে রূপান্তর করা হবে। এসব সিরিজ প্রযোজনা করবে হইচই স্টুডিওজ। পরিচিত গল্পগুলোকে ভিন্ন আঙ্গিক, নতুন নির্মাণশৈলী ও সৃজনশীল দৃষ্টিভঙ্গিতে দর্শকদের সামনে উপস্থাপন করাই এ উদ্যোগের লক্ষ্য।
অর্থাৎ আগে নির্মিত সিরিজ অন্য ভাষায় ডাবিং করার পাশাপাশি একই গল্পের নতুন সংস্করণ তৈরিরও সুযোগ তৈরি হচ্ছে। এসব প্রকল্পে নতুন নির্মাতা, চিত্রনাট্যকার ও অভিনয়শিল্পীদের যুক্ত করার পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছে প্রতিষ্ঠান দুটি।
তবে কোন গল্পগুলো নতুনভাবে নির্মিত হবে, কারা পরিচালনা করবেন কিংবা কবে থেকে এসব সিরিজের কাজ শুরু হবে, সে বিষয়ে এখনো বিস্তারিত জানানো হয়নি।
বাংলা কনটেন্টের নতুন বাজার
২০১৭ সালে ভারতের প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান এসভিএফের ডিজিটাল উদ্যোগ হিসেবে যাত্রা শুরু করে হইচই। বাংলা ভাষার সিনেমা ও ওয়েব সিরিজকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা প্ল্যাটফর্মটি পরে বাংলাদেশেও নিজস্ব কনটেন্ট নির্মাণে গুরুত্ব দেয়।
হইচইয়ের দেওয়া তথ্যানুযায়ী, তাদের সংগ্রহে রয়েছে দুই হাজার ঘণ্টার বেশি কনটেন্ট। এর মধ্যে শতাধিক মৌলিক সিরিজের পাশাপাশি রয়েছে সিনেমা, স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ও তথ্যচিত্র। বিশ্বজুড়ে বাংলাভাষী দর্শকদের কাছে পৌঁছানোর লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে প্রতিষ্ঠানটি।
২০২৩ সালে হইচই স্টুডিওজ চালুর মাধ্যমে চলচ্চিত্র প্রযোজনায়ও নিজেদের কার্যক্রম বিস্তৃত করে প্রতিষ্ঠানটি। হইচইয়ের সহপ্রতিষ্ঠাতা বিষ্ণু মোহতা এসভিএফের নির্বাহী পরিচালক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন।
অন্যদিকে নেটফ্লিক্স নিজস্ব প্রযোজনার পাশাপাশি বিভিন্ন প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান ও স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মের কনটেন্ট সংগ্রহের ওপরও গুরুত্ব দিচ্ছে। হইচইয়ের সঙ্গে এই অংশীদারত্ব তারই একটি নতুন উদাহরণ।
বিশেষ করে বাংলা সিরিজের হিন্দি, তামিল ও তেলুগু সংস্করণ প্রকাশের ফলে ভারতের আরও বড় দর্শকগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছানোর সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে নির্বাচিত গল্পের নতুন রূপান্তর নির্মিত হলে বাংলা কনটেন্টের বাজার আরও বিস্তৃত হতে পারে।
বাংলাদেশের জন্যও এই উদ্যোগ তাৎপর্যপূর্ণ। ‘মহানগর’ ও ‘বোহেমিয়ান ঘোড়া’র মতো দেশীয় প্রযোজনা ভারতের বিভিন্ন ভাষাভাষী দর্শকের কাছে পৌঁছানোর সুযোগ পাচ্ছে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের নির্মাতা, অভিনয়শিল্পী ও গল্পের সঙ্গে নতুন দর্শকদের পরিচয় ঘটতে পারে।
তবে নেটফ্লিক্সের ঘোষণায় মূলত ভারতজুড়ে বহুভাষিক সম্প্রচারের বিষয়টিই নির্দিষ্ট করা হয়েছে। ফলে সিরিজগুলো বিশ্বের সব দেশে একই সময়ে দেখা যাবে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
বাংলাদেশের দুই আলোচিত সিরিজের অন্তর্ভুক্তি এবং আগামী দুই বছর ধরে নতুন বাংলা সিরিজের বহুভাষিক সম্প্রচারের পরিকল্পনা—সব মিলিয়ে নেটফ্লিক্স ও হইচইয়ের এই অংশীদারত্ব বাংলা ওয়েব কনটেন্টের জন্য নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে।