নেটফ্লিক্সের নতুন সিনেমা ‘দ্য বিগ ফেক (ইল ফালসারিও)’ আমাদের ফিরিয়ে নিয়ে যায় ৭০–এর দশকের রোমে। সে এক অস্থির, সন্দেহপ্রবণ সময়, যখন রাজনীতি, সন্ত্রাস, গুপ্তচরবৃত্তি আর অপরাধ একে অপরের সঙ্গে এমনভাবে জড়িয়ে ছিল যে সত্য আর মিথ্যার সীমারেখা প্রায় মুছে যেত। ছবিটি মুক্তির পর বেশ সাড়া ফেলেছে, রয়েছে প্ল্যাটফর্মটির বৈশ্বিক তালিকার আটে। ছবিটিতে নির্মাতা বলেছেন, ‘এটি একটি “ভুলভাবে অনুপ্রাণিত” সত্য ঘটনা। বাস্তবের টনি চিকিয়ারেল্লি ছিলেন এমন একজন মানুষ, যিনি শুধু ছবি জাল করেননি—তিনি নিজেই ইতিহাসকে জাল করে দিয়েছিলেন।
পিয়েত্রো কাস্তেলিত্তোর অভিনয়ে টনি চিকিয়ারেল্লিকে ছবিতে অনেক সময় পরিস্থিতির শিকার বলে মনে হয়। অথচ বাস্তবে আন্তোনিও ‘টনি’ চিকিয়ারেল্লি ছিলেন দ্বিমুখী খেলায় সিদ্ধহস্ত এক চরিত্র। ১৯৪৮ সালে ইতালির আব্রুজ্জো অঞ্চলে জন্ম নেওয়া মানুষটি রোমে এসে এমন এক প্রতিভার পরিচয় দেন, যা এতটাই বিপজ্জনক ছিল যে ক্ষমতার কেন্দ্রগুলো তাঁকে ‘সুরক্ষিত সম্পদ’ হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করে।
বাস্তবের টনি শুধু একজন শিল্পকর্ম জালিয়াত ছিলেন না। তিনি ছিলেন তিনটি ভিন্ন জগতের সংযোগকারী সেতু—যে তিনটি জগৎ প্রকাশ্যে একে অপরের শত্রু। প্রথমত, কুখ্যাত বান্দা দেলা মাজলিয়ানা অপরাধ চক্র। টনি সেখানে কেবল সরবরাহকারী ছিলেন না; তিনি ছিলেন গ্যাংয়ের সবচেয়ে রাজনৈতিক নেতা দানিলো আব্রুচিয়াতির ঘনিষ্ঠ সহযোগী। এই সূত্রে তিনি এমন এক জগতে প্রবেশ করেন, যেখানে ব্যাংক ডাকাতির অর্থে চলে মাদক পাচার ও উচ্চপর্যায়ের দুর্নীতি।
দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক চরমপন্থা। টনি ঘোরাফেরা করতেন বামপন্থী চরম সংগঠন অটোনোমিয়াপেরাইয়ার বলয়ে, তেমনি তাঁর যোগাযোগ ছিল নব্য-ফ্যাসিস্ট সন্ত্রাসী গোষ্ঠী এনএআরের সঙ্গেও। এই দ্বৈত অবস্থান তাঁকে এক প্রেতচ্ছায়ার মতো চলাফেরা করার সুযোগ দেয়—যে কাউকে, যেকোনো মতাদর্শের মানুষকে ভুয়া পরিচয়পত্র বা নিরাপদ আশ্রয় দিতে তিনি প্রস্তুত ছিলেন, যদি দাম ঠিক থাকে।
তৃতীয় ও সবচেয়ে শিউরে ওঠার মতো বিষয় হলো—রাষ্ট্রের ছত্রচ্ছায়া পাওয়া। পরে প্রকাশিত নথি ও বিচারপ্রক্রিয়ায় উঠে এসেছে, চিকিয়ারেল্লি ছিলেন ইতালির গোয়েন্দা সংস্থার তথ্যদাতা, এমনকি কিছু সূত্রে ইসরায়েলের মোসাদের সঙ্গেও তাঁর যোগাযোগের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। তিনি শুধু জালিয়াত নন; রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনে তদন্তকে বিভ্রান্ত করা ও রেড ব্রিগেডসের কাছে সাংকেতিক বার্তা পাঠানোর একটি ‘যন্ত্র’ হিসেবেও তাঁকে ব্যবহার করা হয়েছে
ছবির একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্ব—যেখানে ‘দর্জি’ নামের এক রহস্যময় চরিত্র টনিকে রেড ব্রিগেডসের নামে একটি লিফলেট জাল করতে বাধ্য করে—তা নিছক কল্পনা নয়। বাস্তব ইতিহাসের অন্যতম বিতর্কিত অধ্যায়ের প্রতিফলন এটি। ছবির ‘দর্জি’ আসলে ১৯৭০–এর দশকের এক গোপন সংস্থার প্রতীক। সেই সময় ইতালির গোয়েন্দা ব্যবস্থার একটি অংশ নিজেদের গোপন এজেন্ডা নিয়ে কাজ করত—ডান ও বাম উভয় চরমপন্থাকেই ব্যবহার করে দেশে ‘উত্তেজনার কৌশল’ বজায় রাখতে।
১৮ এপ্রিল ১৯৭৮। সাবেক প্রধানমন্ত্রী আলদো মোরো তখনো নিখোঁজ। ঠিক সেই সময় রেড ব্রিগেডসের নামে প্রকাশিত হয় ‘কমুনিকাতো নম্বর ৭’, যেখানে দাবি করা হয়—মোরোর লাশ লেকো দেলা দুচেসা হ্রদে ফেলে দেওয়া হয়েছে। হাজার হাজার পুলিশ দিনভর হ্রদ তল্লাশি করেও কিছু পায়নি। পরে বিচারপ্রক্রিয়ায় প্রমাণিত হয়, এই ভুয়া লিফলেটটির ছড়িয়েছিলেন টনি চিকিয়ারেল্লি। তবে আজও সরকারিভাবে জানা যায়নি—কে তাঁকে এই কাজের জন্য নিয়োগ দিয়েছিল। বহু গবেষকের ধারণা, এটি ছিল গোয়েন্দা সংস্থার একটি ‘পরীক্ষা’, রেড ব্রিগেডসের প্রতিক্রিয়া যাচাইয়ের জন্য।
ছবিতে শতাব্দীর ডাকাতি হিসেবে দেখানো হয় ১৯৮৪ সালের ব্রিঙ্কস সিকিউরমার্ক ভল্ট লুট—যা টনির মুক্তির টিকিট বলে মনে হয়। বাস্তবে ২৩ মার্চ ১৯৮৪ সালে রোমে সংঘটিত এই ডাকাতিতে টনি ও তাঁর সহযোগীরা প্রায় ৩৫ মিলিয়ন লিরা লুট করেন। ঘটনার পর তদন্তকারীদের বিভ্রান্ত করতে টনি রেখে যান একের পর এক সাংকেতিক চিহ্ন—আলদো মোরোর পোলারয়েড ছবি, গুলির খোসা, রেড ব্রিগেডসের প্রতীক, এমনকি দর্জির মাপজোখের ফিতা। এগুলো ছিল নিছক ধাঁধাঁ নয়; ক্ষমতার কেন্দ্রগুলোর উদ্দেশে পাঠানো ‘বিশেষ বার্তা’—যেন বলা হচ্ছে, রাষ্ট্রের গোপন সত্যগুলো তাঁর জানা।
নেটফ্লিক্স ছবিটির সবচেয়ে বড় কল্পনা হলো এর শেষাংশ। পর্দায় দেখা যায়, টনি পরিচয় বদলের এক বুদ্ধিদীপ্ত কৌশলে বন্ধুকে নিজের জায়গায় মরতে দিয়ে নিজে নতুন জীবনে পালিয়ে যান। বাস্তব ইতিহাস অবশ্য এতটা রোমান্টিক নয়। ২৮ সেপ্টেম্বর ১৯৮৪—ডাকাতির মাত্র ছয় মাস পর—রোমে পেশাদার আততায়ীদের হামলায় টনি চিকিয়ারেল্লি নিহত হন। ছয়টি গুলি করা হয় তাঁকে। তাঁর বান্ধবী ক্রিস্তিনা চিরিল্লি মাথায় গুলি লেগেও বেঁচে যান, আর পেছনের সিটে অক্ষত অবস্থায় পাওয়া যায় তাঁদের শিশুপুত্রকে। খুনিরা আজও অজ্ঞাত, আর লুট হওয়া অর্থের বড় অংশও আর কখনো উদ্ধার হয়নি।
টনি চিকিয়ারেল্লির গল্প ইতালির সবচেয়ে অন্ধকার রহস্যগুলোর একটি। ‘দ্য বিগ ফেক’ আমাদের আশাবাদী, সিনেমাটিক গল্প শোনালেও বাস্তবতা বলে দেয়—সেই সময়ের গুপ্তচরবৃত্তির জগতে গোপন তথ্যের মূল্য প্রায়ই দিতে হতো রক্ত দিয়ে। টনি ছিলেন রাষ্ট্রের চালক নাকি দাবার ঘুঁটি—এই প্রশ্নের উত্তর আজও অস্পষ্ট। তবে এ কথা নিশ্চিত, তার ‘মাস্টারপিস’গুলো ইতালির ইতিহাসের গতিপথ চিরতরে বদলে দিয়েছে।
দ্য রিভিউ পারস্পেকটিভ অবলম্বনে