‘রান অ্যাওয়ে’র দৃশ্য। আইএমডিবি
‘রান অ্যাওয়ে’র দৃশ্য। আইএমডিবি

৫ কোটি ৩ লাখ ভিউ! বছরের আলোচিত থ্রিলারটি দেখেছিলেন কি

একটি পরিবার। বাইরে থেকে দেখলে সবকিছুই নিখুঁত—সুখী দাম্পত্য, তিন সন্তান, সুন্দর বাড়ি, ভালো চাকরি। কিন্তু সেই ছবির ভেতরেই লুকিয়ে আছে এমন কিছু সত্য, যা একে একে সামনে এলে পুরো পরিবারটাই ভেঙে পড়তে পারে। আর সেই গোপন সত্যের দরজা খুলে দেয় পরিবারের বড় মেয়ে পেইজ গ্রিনের নিখোঁজ হয়ে যাওয়া।
২০২৬ সালের শুরুতে নেটফ্লিক্সে মুক্তি পাওয়া ব্রিটিশ সিরিজ ‘রান অ্যাওয়ে’ ঠিক এমনই এক গল্প নিয়ে তৈরি। বাবার চোখে মেয়েকে খুঁজে ফেরার গল্প দিয়ে শুরু হলেও আট পর্বের সিরিজটি ধীরে ধীরে পরিণত হয় খুন, নিখোঁজ মানুষ, মাদক, পারিবারিক গোপনীয়তা ও বহু বছর আগের ঘটনার জটিল রহস্যে।

সিরিজটির স্রষ্টা জনপ্রিয় থ্রিলার লেখক হরলান কোবেন। তাঁর ২০১৯ সালের একই নামের উপন্যাস অবলম্বনে তৈরি হয়েছে ‘রান অ্যাওয়ে’। চিত্রনাট্য করেছেন ড্যানিয়েল ব্রকেলহার্স্ট, টম ফ্যারেলি ও আমান্ডা ডিউক; কোবেনও লেখার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। সিরিজের আটটি পর্বের পাঁচটি পরিচালনা করেছেন নিমের রাশেদ, বাকি তিনটি ইশার সাহোতা।

গল্পটা কী নিয়ে
সাইমন গ্রিনের জীবন একসময় ছিল বেশ গোছানো। স্ত্রী ইনগ্রিড, তিন সন্তান, ভালো চাকরি—সব মিলিয়ে মধ্যবিত্ত সুখী পরিবারের যে চেনা ছবি, তাঁর জীবনটাও অনেকটা তেমন। কিন্তু বড় মেয়ে পেইজ বাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়ার পর সেই সংসারে ফাটল ধরে।
মাদকাসক্ত হয়ে পড়া পেইজের কোনো খোঁজ পাচ্ছিল না পরিবার। শেষ পর্যন্ত সাইমন তাকে একটি শহরের পার্কে খুঁজে পান। মেয়েকে ফিরে পাওয়ার সুযোগ এসেছে ভেবে তিনি এগিয়ে যান। কিন্তু পেইজ তখন একা নয়। তার সঙ্গে থাকা এক ব্যক্তির সঙ্গে সাইমনের তর্ক হঠাৎ সহিংসতায় গড়ায়। এরপর ঘটে যায় খুনের ঘটনা। আর সাইমন আবারও মেয়েকে হারিয়ে ফেলেন।

‘রান অ্যাওয়ে’র দৃশ্য। আইএমডিবি

এবার পেইজকে খুঁজে বের করার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠেন তিনি। কিন্তু মেয়েকে খুঁজতে গিয়ে সাইমন এমন এক অন্ধকার জগতে ঢুকে পড়েন, যেখানে প্রতিটি মানুষেরই যেন কোনো না কোনো গোপন অতীত আছে।

পরিস্থিতি আরও জটিল হয়, যখন একটি খুনের ঘটনায় পুলিশের সন্দেহ গিয়ে পড়ে সাইমনের ওপর। ফলে মেয়েকে খুঁজে বের করার পাশাপাশি নিজের নির্দোষিতাও প্রমাণ করতে হয় তাঁকে।

এদিকে আরেকটি নিখোঁজ ব্যক্তির তদন্ত করতে গিয়ে ব্যক্তিগত গোয়েন্দা এলেনা রেভেনসক্রফটের সঙ্গে সাইমনের পথ মিলে যায়। দুই তদন্ত ধীরে ধীরে একই রহস্যের দিকে এগোতে থাকে।

কে কোন চরিত্রে
সাইমন গ্রিনের চরিত্রে অভিনয় করেছেন জেমস নেসবিট। একজন উদ্বিগ্ন বাবার ভূমিকায় তাঁকে দেখা যায়, যে মেয়েকে ফিরিয়ে আনতে গিয়ে নিজের পরিবার ও অতীতের নানা অস্বস্তিকর সত্যের মুখোমুখি হয়।
ইনগ্রিড গ্রিনের চরিত্রে রয়েছেন মিনি ড্রাইভার। শুরুতে স্ত্রী ও মা হিসেবে তাঁর চরিত্রটি সাইমনের পরিবারের স্থিতিশীলতার অংশ বলেই মনে হয়। কিন্তু গল্প যত এগোয়, তাঁর চরিত্র নিয়েও নতুন প্রশ্ন তৈরি হয়।

ব্যক্তিগত গোয়েন্দা এলেনা রেভেনসক্রফটের ভূমিকায় রুথ জোন্স। এলেনা নিজের তদন্তে নিখোঁজ একজনকে খুঁজছেন। সাইমনের অনুসন্ধানের সঙ্গে তাঁর তদন্তের যোগসূত্র তৈরি হওয়ায় গল্পে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ স্তর যুক্ত হয়।
আলফ্রেড এনক অভিনয় করেছেন গোয়েন্দা আইজ্যাক ফ্যাগবেনলের চরিত্রে। তাঁর সঙ্গে রয়েছেন গোয়েন্দা রুবি টডের চরিত্রে অ্যামি গ্লেডহিল। তাঁরা সাইমনের ব্যাপারে সন্দেহপ্রবণ হয়ে ওঠেন।

‘রান অ্যাওয়ে’র পোস্টার। আইএমডিবি

এ ছাড়া কর্নেলিয়াস ফ্যাবারের চরিত্রে লুসিয়ান এমসামাতি, পেইজের চরিত্রে এলি ডি ল্যাং, ইনগ্রিডের চরিত্রে মিনি ড্রাইভারসহ আরও অনেক চরিত্র গল্পকে এগিয়ে নেয়। নেটফ্লিক্সের চরিত্র পরিচিতিতেও বলা হয়েছে, সিরিজটির প্রায় প্রত্যেক গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রই কোনো না কোনো গোপন তথ্য লুকিয়ে রাখে।

জেমস নেসবিটের অভিনয়
‘রান অ্যাওয়ে’র অন্যতম শক্তি জেমস নেসবিট। মেয়েকে খুঁজতে থাকা বাবার অসহায়ত্ব, রাগ, অপরাধবোধ ও উদ্বেগ—সবকিছুই তাঁর অভিনয়ে উঠে এসেছে।
দ্য গার্ডিয়ানের সমালোচনায়ও নেসবিটের অভিনয়কে সিরিজটির বড় আকর্ষণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, ‘অস্থির, বিপর্যস্ত সাধারণ মানুষ’ ধরনের চরিত্রে নেসবিটের দক্ষতা এখানে আবারও সামনে এসেছে।
এই চরিত্রে তাঁকে কোনো অতিমানবীয় নায়ক হিসেবে দেখানো হয়নি। বরং একজন বাবা হিসেবে মেয়েকে ফিরে পাওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষাই তাঁর সবচেয়ে বড় চালিকা শক্তি। আর সেই আবেগ থেকেই তিনি এমন সব সিদ্ধান্ত নিতে থাকেন, যা তাঁকে আরও গভীর বিপদের দিকে নিয়ে যায়।

মিনি ড্রাইভারও গুরুত্বপূর্ণ। স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের আড়ালে যে অস্বস্তি ও অজানা ইতিহাস ধীরে ধীরে প্রকাশ পায়, সেটিকে তিনি সংযত অভিনয়ে ধরে রেখেছেন। অন্যদিকে রুথ জোন্সের এলেনা চরিত্রটি সিরিজে আলাদা মাত্রা যোগ করেছে—বাহ্যিকভাবে শান্ত হলেও তদন্তের ক্ষেত্রে তিনি যথেষ্ট দৃঢ়।

হরলান কোবেনের গল্পের স্বাক্ষর
‘রান অ্যাওয়ে’কে বুঝতে হলে হরলান কোবেনের গল্প বলার ধরনটাও বুঝতে হবে। তাঁর থ্রিলারের সাধারণ বৈশিষ্ট্য হলো—একটি পারিবারিক সমস্যা দিয়ে গল্প শুরু হলেও সেটি শেষ পর্যন্ত অনেক বড় রহস্যে গিয়ে পৌঁছায়। চরিত্ররা নিজেদের অতীতের এমন কিছু বিষয় লুকিয়ে রাখে, যা ধীরে ধীরে প্রকাশ পায়।

‘রান অ্যাওয়ে’র দৃশ্য। আইএমডিবি

‘রান অ্যাওয়ে’তেও সেই কৌশল ব্যবহার করা হয়েছে। প্রথম প্রশ্ন—পেইজ কোথায়? এরপর প্রশ্ন বদলে যায়—সে কেন পালিয়েছিল? তার সঙ্গে কারা ছিল? যে মানুষটি মারা গেল, তার সঙ্গে পেইজের সম্পর্ক কী? সাইমনের পরিবারে আসলে কী ঘটেছিল? আর নিখোঁজ অন্য মানুষটির ঘটনাই বা এর সঙ্গে কীভাবে যুক্ত? প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর মিলতে না মিলতেই নতুন প্রশ্ন তৈরি হয়।

কোবেন নিজেই সিরিজটিকে একটি ‘আবেগের রোলার কোস্টার’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তাঁর মতে, অন্য অনেক কাজের তুলনায় এই সিরিজ দর্শককে বেশি সময় ধরে অনিশ্চয়তার মধ্যে রাখবে।

দর্শক টেনেছে কতটা?
সংখ্যার বিচারে ‘রান অ্যাওয়ে’কে ছোট সাফল্য বলা যাবে না। নেটফ্লিক্সের জানুয়ারি-জুন ২০২৬ সময়ের দর্শকসংখ্যার হিসাবে সিরিজটি পেয়েছে ৫ কোটি ৩ লাখ ভিউ। এই সময়ে নতুন সিরিজগুলোর মধ্যে এটি ছিল নেটফ্লিক্সের সবচেয়ে বেশি দেখা সিরিজগুলোর একটি।

মুক্তির পরপরই সিরিজটি নেটফ্লিক্সের বৈশ্বিক সেরা দশে জায়গা করে নেয়। ১২ থেকে ১৮ জানুয়ারির সপ্তাহে বিশ্বজুড়ে ৬১ লাখ ভিউ নিয়ে ছিল তৃতীয় অবস্থানে। পরের সপ্তাহেও ৩৬ লাখ ভিউ নিয়ে সেরা দশে ছিল।

একটি পর্যায়ে টানা চার সপ্তাহ বৈশ্বিক সেরা দশে থাকার তথ্যও প্রকাশিত হয়েছে। সিরিজটি ৮৪টি দেশের সেরা দশে জায়গা করে নেয়।
অর্থাৎ এটি শুধু যুক্তরাজ্যকেন্দ্রিক সাফল্য ছিল না; বিভিন্ন দেশের দর্শকও সিরিজটির রহস্য ও পারিবারিক নাটকের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন।

‘রান অ্যাওয়ে’র দৃশ্য। আইএমডিবি

সমালোচকদের প্রতিক্রিয়া
সমালোচকদের প্রতিক্রিয়াও মোটের ওপর ইতিবাচক। রটেন টমেটোজে সিরিজটির সমালোচক স্কোর ৮৩ শতাংশ, ২৯টি পর্যালোচনার ভিত্তিতে।

সমালোচকদের একটি অংশের কাছে এর সবচেয়ে বড় আকর্ষণ দ্রুতগতির গল্প ও পরপর টুইস্ট। রটেন টমেটোজের সারাংশেও জেমস নেসবিটের অভিনয় এবং গল্পের গতিকে সিরিজটির শক্তি হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।

দ্য গার্ডিয়ান সিরিজটিকে কোবেনের সাম্প্রতিক কাজগুলোর মধ্যে একটি ‘ফর্মে ফেরার’ উদাহরণ হিসেবে দেখেছে। বিশেষ করে নেসবিট, রুথ জোন্স ও ট্রেসি-অ্যান ওবারম্যানের অভিনয় প্রশংসা পেয়েছে।

তবে দর্শকদের সবাই যে একমত, তা নয়। অনলাইনে কিছু দর্শক গল্পের কয়েকটি মোড়, চরিত্রের সিদ্ধান্ত ও তদন্তের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। অর্থাৎ সিরিজটি নিয়ে প্রতিক্রিয়ায় প্রশংসার পাশাপাশি সমালোচনাও রয়েছে।

‘রান অ্যাওয়ে’র দৃশ্য। আইএমডিবি

কেন এত দর্শক দেখলেন?
‘রান অ্যাওয়ে’র জনপ্রিয়তার প্রথম কারণ, পরিবারের গল্প। বড় কোনো অপরাধের তদন্ত দিয়ে সিরিজটি শুরু হয়নি। শুরু হয়েছে একটি বাবার মেয়েকে খুঁজে ফেরার ব্যক্তিগত যন্ত্রণা দিয়ে। ফলে রহস্যের পাশাপাশি আবেগও শুরু থেকেই কাজ করে।
দ্বিতীয় কারণ, একাধিক রহস্যকে পাশাপাশি এগিয়ে নেওয়া। পেইজ কোথায়—এটি যেমন একটি প্রশ্ন, তেমনি খুনের তদন্ত, আরেক নিখোঁজ ব্যক্তির ঘটনা, পরিবারের পুরোনো গোপনীয়তা—সবকিছুই আলাদা প্রশ্ন তৈরি করে। দর্শক একটি উত্তরের জন্য এগোতে গিয়ে নতুন রহস্যে আটকে যান।

তৃতীয় কারণ, প্রতিটি চরিত্রকে সন্দেহের মধ্যে রাখা। সাইমনকে যেমন পুলিশ সন্দেহ করে, তেমনি পরিবারের অন্য সদস্যদের নিয়েও দর্শকের মনে প্রশ্ন তৈরি হয়। কে সত্য বলছে আর কে কিছু লুকাচ্ছে—এই অনিশ্চয়তা সিরিজের টান বাড়ায়।

চতুর্থ কারণ হরলান কোবেনের জনপ্রিয়তা। তাঁর উপন্যাস অবলম্বনে নেটফ্লিক্স এর আগে ‘দ্য স্ট্রেঞ্জার’, ‘দ্য উডস’, ‘দ্য ইনোসেন্ট’, ‘স্টে ক্লোজ’, ‘ফুল মি ওয়ান্স’-এর মতো সিরিজ তৈরি করেছে। ফলে কোবেনের গল্পের সঙ্গে নেটফ্লিক্স দর্শকের একটি আলাদা পরিচিতি তৈরি হয়েছে। তাঁর বিশ্বজুড়ে ১০ কোটির বেশি বই বিক্রি হয়েছে এবং তাঁর বই ৪৬টি ভাষায় প্রকাশিত হয়েছে।

আরেকটি বিষয় হলো সীমিত সিরিজের কাঠামো। মাত্র আট পর্বের গল্প। অর্থাৎ দীর্ঘ কয়েক মৌসুম ধরে অপেক্ষা করার প্রয়োজন নেই। শুরু করলে দর্শক দ্রুত গল্পের শেষ পর্যন্ত যেতে পারেন। প্রতিটি পর্বের শেষে নতুন প্রশ্ন বা মোড় থাকায় একের পর এক পর্ব দেখার প্রবণতাও তৈরি হয়।

‘রান অ্যাওয়ে’র দৃশ্য। আইএমডিবি

শুধু থ্রিলার নয়, ভাঙা পরিবারের গল্পও
‘রান অ্যাওয়ে’কে শুধু খুন-রহস্যের সিরিজ হিসেবে দেখলে এর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক বাদ পড়ে যায়। এর কেন্দ্রে রয়েছে একটি পরিবার, যার সদস্যরা একে অপরের কাছ থেকে অনেক কিছু লুকিয়ে রেখেছে।

একজন বাবা মেয়েকে ফিরিয়ে আনতে চান। একজন মা নিজের গোপনীয়তা নিয়ে বেঁচে আছেন। সন্তানেরাও নিজেদের জগতের নানা সত্য গোপন করছে। আর পরিবারের বাইরে থাকা মানুষগুলোর জীবনও কোনো না কোনোভাবে সেই গোপন অতীতের সঙ্গে যুক্ত।

ফলে সিরিজের আসল প্রশ্ন শুধু ‘খুনি কে?’ নয়। বরং একটি পরিবারকে টিকিয়ে রাখতে কতটা সত্য লুকানো যায়, আর সেই সত্য প্রকাশ পেলে সম্পর্কগুলো কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়—সেটিও গল্পের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

আইএমডিবি, নেটফ্লিক্সডটকম ও ভ্যারাইটি অবলম্বনে