‘আউটার ব্যাঙ্কস’–এর দৃশ্য। আইএমডিবি
‘আউটার ব্যাঙ্কস’–এর দৃশ্য। আইএমডিবি

সমুদ্র, গুপ্তধনের খোঁজ আর বন্ধুত্ব, শেষ হচ্ছে তরুণদের জনপ্রিয় সেই সিরিজ

সমুদ্রের নীল জল, রোদ ঝলমলে সৈকত, পুরোনো নৌকা, হারানো গুপ্তধনের খোঁজ, বিপদে ঝাঁপিয়ে পড়া একদল তরুণ আর তাদের অটুট বন্ধুত্ব—‘আউটার ব্যাঙ্কস’কে শুধু একটি টিন সিরিজ বললে এর জনপ্রিয়তার অনেকটাই বাদ পড়ে যায়। ২০২০ সালে নেটফ্লিক্সে যাত্রা শুরু করা সিরিজটি পাঁচ মৌসুমে এসে শেষ হচ্ছে। ২০ আগস্ট মুক্তি পাবে এর পঞ্চম ও শেষ মৌসুম। ১৫ আগস্ট লস অ্যাঞ্জেলেসে বিদায়ী সংবর্ধনায় সিরিজের মূল অভিনয়শিল্পীদের পাশাপাশি নির্মাতা জশ পেট ও জোনাস পেটও উপস্থিত ছিলেন। চেজ স্টোকস, ম্যাডেলিন ক্লাইন, ম্যাডিসন বেইলি, ড্রু স্টার্কি, জোনাথন ডেভিস ও কারলাসিয়া গ্রান্ট—প্রিয় চরিত্রদের অভিনেতারা যেন শেষবারের মতো একসঙ্গে দাঁড়ালেন ভক্তদের সামনে।

গল্পটা কী
‘আউটার ব্যাঙ্কস’–এ কেন্দ্র জন বি রুটলেজ। তার সঙ্গী কিয়ারা, পোপ, জেজে ও পরে ক্লিও। তারা নিজেদের বলে ‘পোগস’। সমাজের আর্থিকভাবে পিছিয়ে থাকা তরুণদের এই দলের বিপরীতে রয়েছে ‘কুকস’—ধনী ও সুবিধাভোগী শ্রেণির তরুণেরা। এই শ্রেণিবিভাজনই সিরিজের গল্পের অন্যতম ভিত্তি। জন বি ও তার বন্ধুরা একদিকে খুঁজছে হারানো গুপ্তধন, অন্যদিকে সামনে আসছে তাদের পরিবার, অতীত ও সম্পর্কের নানা রহস্য। এক অভিযানের পর আরেক অভিযান, এক বিপদের পর আরেক বিপদ—কখনো সমুদ্রে, কখনো জঙ্গলে, কখনো বিদেশের মাটিতে ছুটে বেড়িয়েছে তারা।

কিন্তু গুপ্তধন এখানে আসল বিষয় নয়; আসল হলো—এই তরুণেরা একে অপরের জন্য কতটা দূর যেতে পারে। বন্ধুত্বই সিরিজটির মূল ভিত্তি। তারা একে অপরের সঙ্গে ঝগড়া করে, ভুল–বোঝাবুঝিতে জড়ায়, প্রেমে পড়ে, বিচ্ছিন্ন হয়। কিন্তু বিপদ এলে আবার এক জায়গায় দাঁড়ায়। বাস্তব জীবনের বন্ধুত্বের মতোই তাদের সম্পর্ক নিখুঁত নয়; বরং সেই অসম্পূর্ণতাই একে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলেছে।

শ্রেণির লড়াই, ক্ষমতার লড়াই
‘পোগস’ বনাম ‘কুকস’—এই দ্বন্দ্বের ভেতর দিয়ে সিরিজটি অর্থনৈতিক বৈষম্যের কথাও বলে।
পোগসদের হাতে টাকা কম, কিন্তু তাদের স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা বেশি। অন্যদিকে কুকদের হাতে রয়েছে অর্থ, সামাজিক ক্ষমতা ও সুযোগ। দুই পক্ষের এই পার্থক্য শুধু গল্পে সংঘাত তৈরি করেনি, চরিত্রগুলোর সম্পর্ককেও জটিল করেছে। জন বি ও সারার প্রেম তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ।

দুই ভিন্ন সামাজিক বাস্তবতার মানুষ তারা। তাদের পরিবার, জীবনযাপন, ভবিষ্যৎ—সবকিছুতেই পার্থক্য। কিন্তু সেই পার্থক্য অতিক্রম করেই তৈরি হয়েছে প্রেম। এ কারণে সিরিজটিতে প্রেম কেবল রোমান্টিকতা নয়; বরং এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শ্রেণির দেয়াল ভাঙার আকাঙ্ক্ষাও।

সিরিজটির আরেকটি বড় শক্তি এর গতি। প্রায় প্রতিটি মৌসুমের শেষ দিকে এমন কিছু প্রশ্ন রেখে দেওয়া হয়, যার উত্তর জানতে দর্শককে পরের পর্বে যেতে হয়। আবার একটি পর্বের শেষ হয় এমন জায়গায়, যেখানে পরের পর্ব না দেখে ওঠা কঠিন।

‘আউটার ব্যাঙ্কস’–এর দৃশ্য। আইএমডিবি

করোনাকালে দ্রুত জনপ্রিয় হলো
সিরিজটির প্রথম মৌসুম মুক্তি পেয়েছিল ২০২০ সালের এপ্রিল মাসে—বিশ্বজুড়ে করোনা মহামারির কারণে মানুষ যখন ঘরবন্দী, সেই সময়ে দর্শকের সামনে হঠাৎ খুলে গেল এক সম্পূর্ণ বিপরীত পৃথিবী। সেখানে মানুষ সমুদ্রের ধারে ঘুরছে, নৌকায় ছুটছে, বন্ধুদের সঙ্গে অ্যাডভেঞ্চারে যাচ্ছে। এই সময়ের সঙ্গে সিরিজটির বিষয়বস্তু যেন অদ্ভুতভাবে মিলে গিয়েছিল। বাস্তবে যখন স্বাধীনতা সীমিত, তখন পর্দায় একদল তরুণের সীমাহীন স্বাধীনতার গল্প আরও আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছিল। আর একবার দর্শক পোগসদের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার পর তাদের ছেড়ে যাওয়া সহজ হয়নি।

চরিত্রগুলো নিখুঁত নয়
জন বি নায়ক, কিন্তু সে ভুল করে। সারা সাহসী, কিন্তু সে–ও ভুল সিদ্ধান্ত নেয়। পোপ বুদ্ধিমান, কিন্তু আবেগের কাছে হেরে যায়। কিয়ারা দৃঢ়চেতা, কিন্তু তারও দুর্বলতা আছে। জেজে বেপরোয়া, রাগী, অস্থির—কিন্তু বন্ধুদের জন্য জীবন দিয়ে দিতে পারে। এই চরিত্রগুলো আদর্শ মানুষ নয়; বরং দুর্বলতা, ভুল, রাগ, প্রেম ও ভয় তাদের বাস্তব করে তুলেছে। বিশেষ করে জেজে খুব দ্রুত দর্শকের প্রিয় হয়ে ওঠে। তার চরিত্রে ছিল একদিকে দুঃসাহস, অন্যদিকে গভীর পারিবারিক ক্ষত। সে হাসে, ঝগড়া করে, ঝুঁকি নেয়; কিন্তু ভেতরে–ভেতরে বহন করে নিজের একাকিত্ব।

চতুর্থ মৌসুমের শেষে মরক্কোয় জেজের মৃত্যু সিরিজটির গল্পকে অন্য জায়গায় নিয়ে গেছে। পঞ্চম মৌসুমে পোগসরা এমন এক অবস্থায় শুরু করছে, যেখানে তারা শুধু একজন বন্ধুকে হারায়নি; হারিয়েছে তাদের দলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আবেগের কেন্দ্রগুলোর একজনকে।

‘আউটার ব্যাঙ্কস’–এর দৃশ্য। আইএমডিবি

১৫ আগস্টের ফ্যান-ফেয়ার আয়োজনের তথ্যেও স্পষ্ট—শেষ মৌসুমের শুরুতে পোগসরা জেজের মৃত্যুতে শোকাহত। নিজেদের ভবিষ্যৎ ফিরে পাওয়ার পাশাপাশি জেজের মৃত্যুর প্রতিশোধ নেওয়ার চেষ্টা করছে। শেষ মৌসুমের গল্পের আবেগের কেন্দ্রে রয়েছে শোক।

একসময় যারা গুপ্তধনের সন্ধানে ছুটত, তারা এবার ছুটছে মৃত বন্ধুর জন্য ন্যায়বিচার পেতে। শেষ মৌসুমে পোগসরা নিজেদের সবচেয়ে কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যাবে। জেজে নেই। ব্লু ক্রাউন নেই। সামনে পুরোনো শত্রুরা। নিজেদের ভবিষ্যৎও অনিশ্চিত। তার ওপর তাদের আবার চ্যান্ডলার গ্রফ ও অন্য শত্রুদের সঙ্গে লড়াই করতে হবে। নিজেদের পুরোনো প্রতিদ্বন্দ্বী রাফের সঙ্গে তাদের জোটও করতে হচ্ছে। শেষ অধ্যায়ে ‘কে বন্ধু, কে শত্রু’—এই সীমারেখাও আগের মতো পরিষ্কার থাকবে না।

‘আউটার ব্যাঙ্কস’–এর পোস্টার থেকে। আইএমডিবি

ফ্যাশনেও প্রভাব ফেলেছে ‘আউটার ব্যাঙ্কস’

সিরিজটির প্রভাব শুধু গল্প বলায় নয়, পোশাকেও। ঢিলেঢালা শার্ট, টি-শার্ট, শর্টস, জিনস, ব্যান্ডানা, পুরোনো জুতা—পোগসদের পোশাকের মধ্যে ছিল স্বাভাবিক, আরামদায়ক ও সমুদ্রকেন্দ্রিক একটা ভাব। এখানে কোনো চরিত্রকে খুব বেশি সাজানো-গোছানো মনে হয় না। এটাই তরুণ দর্শকের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে। পর্দার চরিত্রের মতো পোশাক পরা, সমুদ্রসৈকতে ছবি তোলা, বন্ধুর সঙ্গে ‘পি৪এল’ লেখা ছবি পোস্ট করা—সামাজিক মাধ্যমে সিরিজটিরর প্রভাব এভাবেই ছড়িয়ে পড়েছে।

নেটফ্লিক্স ডটকম, আইএমডিবি ও টিন ভোগ অবলম্বনে