‘দ্য জেন্টলমেন ২’–এর দৃশ্য। আইএমডিবি
‘দ্য জেন্টলমেন ২’–এর দৃশ্য। আইএমডিবি

৭ দিনে ১ কোটি ভিউ! বাংলাদেশেও ঝড় তুলেছে যে সিরিজ

ব্রিটিশ অভিজাত পরিবার, রাজকীয় প্রাসাদ, দামি পোশাক, বাগানবাড়ি—সবকিছুর আড়ালে চলছে মাদকের ব্যবসা। সেই ব্যবসার মালিক হয়ে উঠছেন এক ডিউক। সঙ্গে অপরাধজগতের এক প্রভাবশালী নারী, ইতালীয় মাফিয়া, রাজনীতির অন্দরমহল আর ক্ষমতার জন্য রক্তাক্ত লড়াই। গাই রিচির ‘দ্য জেন্টলমেন’-এর দ্বিতীয় মৌসুমে গল্পটা তাই শুধু অপরাধের নয়; বরং পুরোনো অভিজাত ক্ষমতা আর নতুন অপরাধসাম্রাজ্যের অদ্ভুত মেলবন্ধনের গল্প।

৩ সেপ্টেম্বর নেটফ্লিক্সে মুক্তির পর থেকেই আলোচনায় ‘দ্য জেন্টলমেন’–এর দ্বিতীয় মৌসুম। বাংলাদেশের নেটফ্লিক্সের সর্বশেষ তালিকায় সিরিজটি আছে ২ নম্বরে। শুধু বাংলাদেশেই নয়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের তালিকাতেও সিরিজটির দাপট দেখা যাচ্ছে। নেটফ্লিক্সের বৈশ্বিক হিসাব অনুযায়ী, ৭ থেকে ১৩ সেপ্টেম্বর—এই এক সপ্তাহে দ্বিতীয় মৌসুমটি দেখেছেন প্রায় ১ কোটি দর্শক। একই সময়ে প্রথম মৌসুমও ফিরে এসেছে বৈশ্বিক তালিকার ৩ নম্বরে, পেয়েছে ৫৫ লাখ ভিউ। অর্থাৎ নতুন মৌসুমের টানে পুরোনো মৌসুমও আবার দর্শকের নজরে এসেছে।

দ্বিতীয় মৌসুমের অন্যতম বড় আকর্ষণ নতুন ভূগোল। প্রথম মৌসুমে ব্রিটিশ গ্রামাঞ্চলের প্রাসাদ, বন, শিকার আর অভিজাত সমাজের ভেতরে অপরাধের গল্প তৈরি করেছিলেন গাই রিচি। এবার সেই জগতের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ইতালির বিলাসবহুল উপকূল, নতুন অপরাধী গোষ্ঠী এবং আন্তর্জাতিক ব্যবসার বিস্তার।

গল্পে এবার আরও বড় সাম্রাজ্য
প্রথম মৌসুমের শেষে এডি হর্নিম্যান (থিও জেমস) আর আগের সেই অনিচ্ছুক ডিউক নন। বাবার কাছ থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া বিশাল সম্পত্তির সঙ্গে তিনি আবিষ্কার করেছিলেন আরেকটি গোপন সাম্রাজ্য—গাঁজার ব্যবসা। সেই ব্যবসার সঙ্গে জড়িয়ে ছিল সুজি গ্লাসের (কায়া স্কোডেলারিও) অপরাধী পরিবার।

দ্বিতীয় মৌসুম শুরু হচ্ছে প্রথম মৌসুমের ঘটনার প্রায় এক বছর পর। এডি ও সুজি এখন অংশীদার। তাঁদের ব্যবসাও আর ইংল্যান্ডের একটি অভিজাত এস্টেটের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এবার সেটি ছড়িয়ে পড়ছে ইতালির দিকে। সেখানে যুক্ত হচ্ছে নতুন চরিত্র, নতুন প্রতিপক্ষ এবং আরও বড় ঝুঁকি।

এডির চরিত্রের সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এখানেই। প্রথম মৌসুমে অপরাধজগতের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া ছিল তাঁর মূল লড়াই। দ্বিতীয় মৌসুমে তিনি নিজেই ক্ষমতার স্বাদ পেতে শুরু করেছেন। ডিউক হিসেবে পাওয়া বংশগত ক্ষমতা আর অপরাধী হিসেবে অর্জন করা ক্ষমতা—দুই জগৎকে একসঙ্গে ব্যবহার করতে চান তিনি।

নেটফ্লিক্সের ভাষ্য অনুযায়ী, এডির লক্ষ্য এখন তাঁর অপরাধসাম্রাজ্যকে আরও বড় করা। কিন্তু যত বড় হচ্ছে সাম্রাজ্য, ততই জটিল হচ্ছে সুজি ও তাঁর বাবা ববি গ্লাসের (রে উইনস্টোন) সঙ্গে সম্পর্ক। এডির উচ্চাকাঙ্ক্ষা একসময় অংশীদারত্বকেই প্রশ্নের মুখে ফেলে দেয়।

ইতালিতে গিয়ে বদলে যায় খেলা
দ্বিতীয় মৌসুমের অন্যতম বড় আকর্ষণ নতুন ভূগোল। প্রথম মৌসুমে ব্রিটিশ গ্রামাঞ্চলের প্রাসাদ, বন, শিকার আর অভিজাত সমাজের ভেতরে অপরাধের গল্প তৈরি করেছিলেন গাই রিচি। এবার সেই জগতের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ইতালির বিলাসবহুল উপকূল, নতুন অপরাধী গোষ্ঠী এবং আন্তর্জাতিক ব্যবসার বিস্তার।

‘দ্য জেন্টলমেন ২’–এর দৃশ্য। আইএমডিবি

ফলে গল্পের পরিসরও বড় হয়েছে। শুধু একটি এস্টেটের মালিকানা বা স্থানীয় মাদক ব্যবসা নয়, এখন প্রশ্ন হচ্ছে, পুরো সাম্রাজ্য নিয়ন্ত্রণ করবে?
এডি, সুজি ও ববি—তিনজনের সম্পর্কও এই মৌসুমের অন্যতম চালিকা শক্তি। প্রত্যেকের লক্ষ্য আলাদা, কিন্তু কেউই অন্যের ওপর পুরোপুরি ভরসা করতে পারছেন না। আর গাই রিচির গল্প বলার ধরন অনুযায়ী, এমন সম্পর্কের শেষ পরিণতি সাধারণত খুব শান্ত হয় না।

দ্বিতীয় মৌসুমে মোট আটটি পর্ব। থিও জেমস ও কায়া স্কোডেলারিওর পাশাপাশি রে উইনস্টোন, ড্যানিয়েল ইংস, জোয়েলি রিচার্ডসন, ভিনি জোন্স এবং নতুন মুখ হিসেবে জিয়ানকার্লো এসপোসিতোও আছেন।

সিনেমা থেকে সিরিজ, তারপর নিজের জগৎ
‘দ্য জেন্টলমেন’-এর শিকড় ২০১৯ সালের একই নামের গাই রিচি পরিচালিত সিনেমায়। সিনেমাটিতে ম্যাথিউ ম্যাককনাহি, চার্লি হানাম, হিউ গ্রান্ট ও কলিন ফারেলের মতো তারকারা ছিলেন। তবে নেটফ্লিক্সের সিরিজটি সরাসরি সেই সিনেমার গল্পকে টেনে নেয়নি; বরং একই অপরাধজগতৎ, একই ধরনের রসবোধ ও গাই রিচির স্বাক্ষরধারী নির্মাণশৈলী নিয়ে নতুন চরিত্রের গল্প তৈরি করা হয়েছে।

প্রথম মৌসুম মুক্তির পর থেকেই সিরিজটির আলাদা দর্শক তৈরি হয়। দ্বিতীয় মৌসুমে সেই দুনিয়াকেই আরও বিস্তৃত করা হয়েছে। গাই রিচি এবারও নির্মাতা ও নির্বাহী প্রযোজক হিসেবে যুক্ত। তাঁর সঙ্গে পরিচালক হিসেবে আছেন এরান ক্রিভি ও নিক রোল্যান্ড। লেখকদের দলে রয়েছেন রিচি, ম্যাথিউ রিড, ড্যানিয়েল ওয়ার্ড, জন জ্যাকসন ও ইয়ান ওয়েদারবি।

দ্বিতীয় মৌসুমে মোট আটটি পর্ব। থিও জেমস ও কায়া স্কোডেলারিওর পাশাপাশি রে উইনস্টোন, ড্যানিয়েল ইংস, জোয়েলি রিচার্ডসন, ভিনি জোন্স এবং নতুন মুখ হিসেবে জিয়ানকার্লো এসপোসিতোও আছেন।

‘দ্য জেন্টলমেন ২’–এর দৃশ্য। আইএমডিবি

গাই রিচির সেই পুরোনো স্বাদ
‘দ্য জেন্টলমেন’-এর জনপ্রিয়তার অন্যতম কারণ এর গল্পের চেয়ে গল্প বলার ধরন। গাই রিচির সিনেমার ভক্তরা যে দ্রুতগতির সংলাপ, ডার্ক হিউমার, হঠাৎ সহিংসতা, অদ্ভুত চরিত্র এবং অপরাধজগতের সঙ্গে ব্রিটিশ অভিজাত সংস্কৃতির সংঘাত পছন্দ করেন, সিরিজেও সেগুলো রয়েছে।

এখানে একজন ডিউক একই সঙ্গে মাদক ব্যবসায়ী। দামি স্যুট পরা মানুষজনের আলোচনা কখনো হঠাৎ রক্তাক্ত সংঘর্ষে গিয়ে ঠেকে। আবার ভয়ংকর অপরাধীর মুখেও থাকে এমন সংলাপ, যা পরিস্থিতির চেয়ে বেশি হাস্যকর।
সিরিজটির সৌন্দর্যও সেই বৈপরীত্যে। একদিকে ইংল্যান্ডের পুরোনো জমিদারবাড়ি, শিকারি পোশাক ও রাজকীয় পরিবেশ; অন্যদিকে মাদক, অস্ত্র, খুন ও অপরাধের অন্ধকার জগৎ।

দ্বিতীয় মৌসুমে সেই বৈপরীত্য আরও বড় হয়েছে। ইতালির রৌদ্রোজ্জ্বল বিলাসী পরিবেশের সঙ্গে অপরাধের অন্ধকার জগৎকে পাশাপাশি রেখে সিরিজটি তার নিজস্ব চেহারা ধরে রেখেছে।

‘দ্য জেন্টলমেন ২’–এর দৃশ্য। আইএমডিবি

সমালোচকের চোখে কেমন
অনেকের মতে, প্রথম মৌসুমে যে সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগানো যায়নি, এবার সিরিজটি কিছুটা নিজের জায়গা খুঁজে পেয়েছে।

‘রজারএবার্ট ডটকম’-এর সমালোচক কাইয়া শুন্নায়াত লিখেছেন, দ্বিতীয় মৌসুমে এসে সিরিজটি ধীরে ধীরে নিজের পরিচয় খুঁজে পাচ্ছে। তাঁর মতে, এডি এখন আর সেই অনিচ্ছুক ডিউক নন; তিনি হয়ে উঠেছেন এমন একজন অপরাধী, যার খ্যাতি যেমন ভয় তৈরি করছে, তেমনি অন্যদের মধ্যে ঈর্ষাও জাগাচ্ছে।

তবে প্রশংসার পাশাপাশি আপত্তিও আছে। ‘দ্য গার্ডিয়ান’-এর সারাহ ডেম্পস্টারের রিভিউতে সিরিজটির দৃশ্যায়ন ও হাস্যরসের প্রশংসা থাকলেও গল্পকে অতিরিক্ত দীর্ঘ এবং মাঝেমধ্যে উদ্দেশ্যহীন মনে হয়েছে। তাঁর মতে, সিরিজটি একই সঙ্গে বিরক্তিকর, দারুণভাবে নির্মিত, অতিরিক্ত দীর্ঘ, উদ্ভট এবং মাঝেমধ্যে অত্যন্ত মজার।

‘রটেন টমেটোজ’-এ দ্বিতীয় মৌসুমের সমালোচক স্কোর ৮৫ শতাংশ, ২৬টি সমালোচনার ভিত্তিতে। দর্শক স্কোরও ৮৭ শতাংশের ওপরে। অর্থাৎ সমালোচকদের মধ্যে কিছু আপত্তি থাকলেও দর্শকদের প্রতিক্রিয়া তুলনামূলকভাবে ইতিবাচক।
সমালোচনার বড় জায়গা মূলত একই—গাই রিচির পুরোনো কৌশলগুলোই কি আবার ব্যবহার করা হচ্ছে? দ্রুত সংলাপ, অতিরঞ্জিত চরিত্র, রক্তাক্ত অ্যাকশন ও অদ্ভুত হাস্যরস ভক্তদের কাছে আকর্ষণীয় হলেও যাঁরা নতুন কিছু প্রত্যাশা করছেন, তাঁদের কাছে এসব কখনো পুনরাবৃত্তি বলে মনে হতে পারে।

‘দ্য জেন্টলমেন ২’–এর দৃশ্য। আইএমডিবি

দর্শক কেন ফিরছেন
দ্বিতীয় মৌসুমের প্রথম তিন দিনে সিরিজটি পেয়েছিল ৬৭ লাখ ভিউ। সে হিসাবে এটি প্রথম মৌসুমের উদ্বোধনী সময়ের তুলনায় পিছিয়ে ছিল। কিন্তু পরের সপ্তাহেই চিত্র বদলে যায়। ৭ থেকে ১৩ সেপ্টেম্বরের মধ্যে দ্বিতীয় মৌসুমের ভিউ বেড়ে দাঁড়ায় ৯৯ লাখে এবং ইংরেজি ভাষার সিরিজের বৈশ্বিক তালিকায় এটি উঠে আসে ১ নম্বরে।
আরও উল্লেখযোগ্য হলো, একই সপ্তাহে প্রথম মৌসুমও ৫৫ লাখ ভিউ পায়। অর্থাৎ দ্বিতীয় মৌসুম দেখতে গিয়ে অনেক দর্শক প্রথম মৌসুমেও ফিরে গেছেন।

এটা সিরিজটির জনপ্রিয়তার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। নতুন মৌসুম শুধু পুরোনো দর্শককে ধরে রাখেনি; নতুন দর্শকের মধ্যেও আগের গল্প দেখার আগ্রহ তৈরি করেছে।
দ্বিতীয় মৌসুম মুক্তির আগেই নেটফ্লিক্স সিরিজটির তৃতীয় মৌসুম অনুমোদন করেছে। অর্থাৎ প্ল্যাটফর্মটির কাছে এই অপরাধজগৎকে আরও এগিয়ে নেওয়ার যথেষ্ট কারণ আছে।

তৃতীয় মৌসুম নিয়ে গাই রিচির বক্তব্যও সেই দিকেই ইঙ্গিত করে। তাঁর মতে, সিরিজটির উচ্চাকাঙ্ক্ষা বেড়েছে, জগৎ আরও বিস্তৃত হয়েছে এবং এর পরিণতির ওজনও বেড়েছে; তাই তৃতীয় মৌসুমকে তিনি স্বাভাবিক পরবর্তী পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন।
গাই রিচির স্টাইল, নির্মাণ আর গল্প মিলিয়ে সিরিজটি তাই দর্শক টেনেছে।

ভ্যারাইটি ও ডেডলাইন অবলম্বনে