সুপারহিরো সিনেমা ও সিরিজের বাজারে ক্লান্তির কথা যখন ক্রমেই জোরালো হচ্ছে, তখন ডিসি ইউনিভার্স থেকে এল এক চমকপ্রদ খবর। ‘ল্যান্টার্নস’ মুক্তির প্রথম তিন দিনেই বিশ্বজুড়ে টেনেছে ৯ দশমিক ৩ মিলিয়ন বা ৯৩ লাখ দর্শক। যুক্তরাষ্ট্রেই দর্শকসংখ্যা ৬ দশমিক ৬ মিলিয়ন। এইচবিও ও এইচবিও ম্যাক্স মিলিয়ে পাওয়া এই হিসাব ‘ল্যান্টার্নস’কে ডিসি স্টুডিওর সবচেয়ে বড় সিরিজ প্রিমিয়ারে পরিণত করেছে। প্ল্যাটফর্মটির ইতিহাসে এটি সেরা পাঁচ প্রিমিয়ারেরও একটি।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, গ্রিন ল্যান্টার্নকে নিয়ে আগের ব্যর্থতার স্মৃতি যেখানে এখনো দর্শকের মনে টাটকা, সেখানে নতুন সিরিজটি কীভাবে এত দ্রুত দর্শকের আস্থা পেল? উত্তরটা শুধু সুপারহিরোতে নয়। বরং সুপারহিরো গল্পকে সরিয়ে সামনে নিয়ে আসা হয়েছে রহস্য, চরিত্র, অপরাধ আর সম্পর্কের গল্পকে।
শুধু সুপারহিরো সিরিজ নয়
‘ল্যান্টার্নস’কে শুরুতেই অন্য রকম করার চেষ্টা করেছেন নির্মাতারা। গ্রিন ল্যান্টার্ন মানেই মহাকাশ, এলিয়েন, অদ্ভুত গ্রহ আর বিশাল যুদ্ধ—এমন ধারণা থাকলেও সিরিজটির প্রথম গল্পের বড় অংশের পটভূমি যুক্তরাষ্ট্রের ছোট্ট শহর।
নতুন গ্রিন ল্যান্টার্ন জন স্টুয়ার্ট ও অভিজ্ঞ হ্যাল জর্ডান সেখানে একটি হত্যাকাণ্ডের তদন্তে নামে। সেই তদন্ত যত এগোয়, ততই বেরিয়ে আসতে থাকে ভয়ংকর সব রহস্য। পৃথিবীর একটি আপাত সাধারণ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িয়ে যায় ভিনগ্রহ, গোপন সংগঠন ও আরও বড় বিপদের ইঙ্গিত।
ফলে দর্শক শুধু ‘কে কাকে হারাবে’—এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজেন না। বরং জানতে চান, খুনটি কে করেছে, কেন করেছে এবং এর পেছনে আসলে কী আছে।
এই রহস্যের কাঠামোই ‘ল্যান্টার্নস’কে প্রচলিত সুপারহিরো সিরিজ থেকে আলাদা করেছে।
‘ট্রু ডিটেকটিভ’-এর আবহে গ্রিন ল্যান্টার্ন
সিরিজটির সবচেয়ে বড় আকর্ষণ সম্ভবত এর গোয়েন্দা গল্পের ধরন। সমালোচকেরা বারবার ‘ট্রু ডিটেকটিভ’-এর সঙ্গে এর তুলনা করেছেন। ছোট শহর, অস্বস্তিকর পরিবেশ, অমীমাংসিত হত্যাকাণ্ড, স্থানীয় মানুষের গোপন অতীত—সব মিলিয়ে প্রথম দিকে এটি অনেকটা ক্রাইম থ্রিলারের মতো এগোয়। এর মধ্যে ধীরে ধীরে প্রবেশ করে গ্রিন ল্যান্টার্নের বিশাল মহাবিশ্ব।
এই কৌশলটির সুবিধা হলো, যাঁরা কমিকসের ভক্ত নন, তাঁরাও গল্পে ঢোকার সুযোগ পাচ্ছেন। আর যাঁরা গ্রিন ল্যান্টার্নের দীর্ঘ ইতিহাস জানেন, তাঁদের জন্য রাখা হয়েছে কমিকসের নানা সূত্র ও ইস্টার এগ।
অর্থাৎ নতুন দর্শকের জন্য রহস্য, পুরোনো ভক্তের জন্য কমিকসের সংযোগ—দুই দিকই সামলানোর চেষ্টা করেছে সিরিজটি।
দুই নায়কের সম্পর্কই আসল শক্তি
‘ল্যান্টার্নস’-এর কেন্দ্রে রয়েছেন দুজন—হ্যাল জর্ডান ও জন স্টুয়ার্ট। তাঁদের চরিত্রে কাইল চ্যান্ডলার ও অ্যারন পিয়েরের অভিনয় সিরিজটির অন্যতম বড় শক্তি হয়ে উঠেছে।
হ্যাল অভিজ্ঞ, আত্মবিশ্বাসী, কিছুটা বেপরোয়া। আর জন নতুন, নিয়ম মেনে চলতে অভ্যস্ত এবং নিজের দায়িত্ব সম্পর্কে ভীষণ সচেতন। একজনের অভিজ্ঞতা আর অন্যজনের আদর্শবাদ—দুই বিপরীত স্বভাবের মানুষকে একসঙ্গে কাজ করতে হয়।
ফলে তাঁদের মধ্যে শুধু গুরু-শিষ্যের সম্পর্ক নয়, তৈরি হয় একধরনের বন্ধুত্ব, প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও পারস্পরিক অবিশ্বাসের মিশেল।
সমালোচকেরাও বিশেষভাবে চ্যান্ডলার ও পিয়েরের রসায়নের প্রশংসা করেছেন। রটেন টমেটোজের সমালোচকদের সারাংশেও তাঁদের অভিনয় ও পারস্পরিক রসায়নকে সিরিজটির বড় আকর্ষণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
এখানেই সিরিজটি কেবল কমিকসের চরিত্রের ওপর নির্ভর না করে মানবিক হয়ে উঠেছে।
সুপারহিরোরাও মানুষ
সুপারহিরোদের সাধারণত অসাধারণ ক্ষমতা থাকে। কিন্তু ‘ল্যান্টার্নস’ দেখাতে চেয়েছে, ক্ষমতা থাকলেই মানুষ নিজের ভয়, সংশয়, রাগ কিংবা অতীতের ক্ষত থেকে মুক্ত হয়ে যায় না।
গ্রিন ল্যান্টার্নের শক্তির উৎস তার আংটি। কিন্তু সেই শক্তিও অনেকাংশে নির্ভর করে তার মানসিক দৃঢ়তার ওপর। ফলে ভয় পেলে, আত্মবিশ্বাস হারালে কিংবা নিজের ওপর সন্দেহ তৈরি হলে নায়কের শক্তির ধারণাটিই প্রশ্নের মুখে পড়ে।
এই জায়গাটিই গল্পটিকে মানবিক করে। সমালোচকেরা লক্ষ করেছেন, সিরিজটি সুপারহিরোর শক্তির চেয়ে তার দুর্বলতা ও আত্মসংশয়কে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে।
আর আজকের দর্শকের কাছে সম্ভবত এটাই বেশি আকর্ষণীয়। কারণ, তাঁরা শুধু শক্তিশালী নায়ক দেখতে চান না; নায়ক কীভাবে ভেঙে পড়ে, আবার কীভাবে উঠে দাঁড়ায়, সেটাও দেখতে চান।
অ্যারন পিয়েরের নতুন পরিচয়
জন স্টুয়ার্ট চরিত্রে অ্যারন পিয়েরকে কাস্ট করাও সিরিজটির আলোচনার অন্যতম কারণ। চরিত্রটি একজন সাবেক মেরিন এবং নতুন গ্রিন ল্যান্টার্ন। ফলে তার মধ্যে সামরিক শৃঙ্খলা, দায়িত্ববোধ ও ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব—সবই রয়েছে।
পিয়েরের অভিনয়ে চরিত্রটির চুপচাপ, সংযত স্বভাব ফুটে উঠেছে। অন্যদিকে কাইল চ্যান্ডলার হ্যাল জর্ডানকে দিয়েছেন অভিজ্ঞ কিন্তু খানিকটা ক্লান্ত এক নায়কের রূপ।
দুজনের অভিনয়ের পার্থক্যই তাঁদের সম্পর্ককে আরও আকর্ষণীয় করেছে।
কাইল চ্যান্ডলার কেন এত গুরুত্বপূর্ণ
হ্যাল জর্ডান চরিত্রে কাইল চ্যান্ডলারকে বেছে নেওয়াও ছিল বড় সিদ্ধান্ত। তাঁর অভিনয়ে চরিত্রটি নিখুঁত সুপারহিরো নয়; বরং এমন একজন মানুষ, যে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করতে করতে ক্লান্ত।
ফলে হ্যালকে শুধু ‘সব পারে’ এমন নায়ক হিসেবে দেখা যায় না। তাঁর নিজেরও অতীত আছে, ভুল আছে, অহং আছে, ভয় আছে। এই অসম্পূর্ণতাই চরিত্রটিকে দর্শকের কাছাকাছি নিয়ে আসে।
প্রথম পর্বের শেষের একটি বড় মোড়ও দর্শকদের নাড়িয়ে দিয়েছে—যা সিরিজটির রহস্যকে আরও ঘনীভূত করেছে।
‘ল্যান্টার্নস’ শুধু একটি নতুন সিরিজ নয়; জেমস গান ও পিটার সাফরানের নেতৃত্বে নতুন ডিসি ইউনিভার্সের জন্যও এটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।
আগের ডিসি প্রকল্পগুলোর নানা সাফল্য-ব্যর্থতার পর নতুন ইউনিভার্সকে দর্শকের কাছে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলা সহজ কাজ নয়। বিশেষ করে গ্রিন ল্যান্টার্ন নামটির সঙ্গে ২০১১ সালের বহুল সমালোচিত সিনেমাটির স্মৃতি জড়িয়ে আছে।
সেই জায়গা থেকে নতুন সিরিজটি যদি দর্শকের মনে চরিত্রটির প্রতি আগ্রহ তৈরি করতে পারে, সেটি ডিসির জন্য বড় অর্জন।
‘ল্যান্টার্নস’ সেই পুরোনো ব্যর্থতাকে পাশ কাটিয়ে গ্রিন ল্যান্টার্নকে নতুনভাবে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছে—মহাকাশের সুপারহিরো হিসেবে নয়, বরং পৃথিবীর একটি হত্যাকাণ্ডের তদন্তকারী হিসেবে।
দর্শকের জন্য সহজ
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ‘ল্যান্টার্নস’ দেখতে গ্রিন ল্যান্টার্নের পুরো ইতিহাস জানা বাধ্যতামূলক নয়। সিরিজটি ধীরে ধীরে দর্শককে চরিত্র, নিয়ম ও এই মহাবিশ্বের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়। ফলে ডিসির দীর্ঘ ইতিহাস না জানা দর্শকও গল্পটি অনুসরণ করতে পারেন। একই সঙ্গে পুরোনো ভক্তদের জন্য রয়েছে পরিচিত চরিত্র, কমিকসের সূত্র ও ভবিষ্যৎ গল্পের ইঙ্গিত।
এটি বর্তমান সুপারহিরো কনটেন্টের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, নতুন কোনো দর্শক যদি একটি সিরিজ শুরু করেই মনে করেন, আগের ১০টি সিনেমা না দেখলে কিছুই বোঝা যাবে না, তাহলে আগ্রহ হারানোর ঝুঁকি থাকে। ‘ল্যান্টার্নস’ সেই বাধা কমিয়েছে।
সমালোচকদের প্রশংসাও কাজে দিয়েছে
দর্শকসংখ্যার পাশাপাশি সমালোচকদের প্রতিক্রিয়াও সিরিজটির পক্ষে গেছে। রটেন টমেটোজে প্রথম দিকের সমালোচকদের স্কোর ৯৫ শতাংশ পর্যন্ত উঠেছে।
অবশ্য সবাই সমান প্রশংসা করেননি। কিছু সমালোচকের মতে, সিরিজটির গল্প মাঝে মাঝে অতিরিক্ত জটিল হয়ে যায় এবং সুপারহিরো মিথলজি ও বাস্তবধর্মী ক্রাইম ড্রামার মধ্যে ভারসাম্য সব সময় ঠিক থাকে না। দ্য গার্ডিয়ানও সিরিজটির কিছু দুর্বলতার কথা বলেছে।
অর্থাৎ ‘ল্যান্টার্নস’ সর্বসম্মতভাবে নিখুঁত নয়। কিন্তু যে জায়গাগুলোতে সিরিজটি সফল—চরিত্র, রহস্য, অভিনয় ও আবহ—সেগুলো দর্শককে পরের পর্বে টেনে নেওয়ার মতো যথেষ্ট শক্তিশালী।
কেন এত দর্শক?
সব মিলিয়ে ‘ল্যান্টার্নস’-এর সাফল্যের পেছনে কয়েকটি বিষয়কে আলাদা করে দেখা যায়— প্রথমত, পরিচিত চরিত্র। গ্রিন ল্যান্টার্ন নামটির বিশাল কমিকস-ভক্তগোষ্ঠী রয়েছে। দ্বিতীয়ত, নতুন গল্প বলার কৌশল। শুধু সুপারহিরো অ্যাকশন নয়, হত্যাকাণ্ডের রহস্যকে সামনে আনা হয়েছে।
তৃতীয়ত, কাইল চ্যান্ডলার ও অ্যারন পিয়েরের রসায়ন। তাঁদের দ্বন্দ্ব ও বন্ধুত্ব গল্পকে প্রাণ দিয়েছে। চতুর্থত, প্রাপ্তবয়স্ক আবহ। সিরিজটি নায়কোচিত বক্তৃতা ও বড় বড় যুদ্ধের পাশাপাশি সম্পর্ক, ভুল, অপরাধ ও মানসিক দ্বন্দ্বকে গুরুত্ব দিয়েছে। পঞ্চমত, নতুন ডিসি ইউনিভার্সের কৌতূহল। জেমস গানের নতুন ডিসি দুনিয়া কোথায় যাচ্ছে, তা জানার আগ্রহও দর্শককে সিরিজটির দিকে টেনেছে।
আর সবচেয়ে বড় কথা, ‘ল্যান্টার্নস’ দর্শককে শুধু গ্রিন ল্যান্টার্নের শক্তি দেখাতে চায়নি; দেখাতে চেয়েছে সেই শক্তি ব্যবহার করা মানুষের দুর্বলতাও।
এই কারণেই সম্ভবত ৯৩ লাখ দর্শকের এই উদ্বোধন শুধু একটি রেকর্ড নয়। এটি ডিসির জন্য একটি বার্তাও—সুপারহিরো গল্পের প্রতি দর্শকের আগ্রহ শেষ হয়ে যায়নি; তারা শুধু একই গল্প নতুন করে দেখতে চায় না।
তাদের দরকার নতুন আবহ, নতুন চরিত্রের ব্যাখ্যা, ভালো রহস্য এবং এমন নায়ক, যার হাতে অসীম ক্ষমতা থাকলেও ভেতরে ভেতরে সে আমাদেরই মতো একজন মানুষ।
‘ল্যান্টার্নস’ আপাতত সেই চাহিদাটাই ধরতে পেরেছে। আর প্রথম তিন দিনে ৯৩ লাখ দর্শকের উপস্থিতি তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ।
ভ্যারাইটি ও আইএমডিবি অবলম্বনে