কলকাতার স্টুডিওতে শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে আনহার মিয়া
কলকাতার স্টুডিওতে শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে আনহার মিয়া

‘বিলাই মেও মেও রে’ যেভাবে সিলেট থেকে কলকাতায় ভাইরাল হলো

সিলেটের ওসমানীনগরের লতিবপুর গ্রামের বাসিন্দা মো. আনহার মিয়া। বয়স ৫৭ বছর। জীবনের প্রায় চার দশক কেটেছে গান, বাউলচর্চা আর কবিরাজির সঙ্গে। পেশাগত ব্যস্ততার ফাঁকে নিজের মতো করে গান বাঁধেন এবং সুর করেন। সেই গানের একটি এবার জায়গা করে নিয়েছে কলকাতার সিনেমায়। দুর্গাপূজা উপলক্ষে ১৫ অক্টোবর পশ্চিমবঙ্গের প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পেয়েছে নন্দিতা রায় ও শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের সিনেমা ‘বহুরূপী: দ্য গোল্ডেন ডাকু’। সিনেমাটির প্রচারে ব্যবহৃত হচ্ছে আনহার মিয়ার লেখা ও সুর করা ‘বিলাই মেও মেও রে’ গানটি।

৯ অক্টোবর প্রযোজনা সংস্থা উইন্ডোজের ইউটিউব চ্যানেলে মুক্তির পরেই সাড়া ফেলে গানটি। গতকাল শুক্রবার বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত গানটির ভিউ ১ লাখ ২৫ হাজার। অনেকেই মন্তব্যের ঘরে গানের কথা ও সুরের প্রশংসা করেছেন। এক দর্শক লিখেছেন, ‘এবারের পূজায় ভাইরাল হবে গানটি।’ অনেকে গানটি রিলস ও শর্টসে ব্যবহার করেছেন।

এই সাফল্যে খুব খুশি আনহার মিয়া। গতকাল দুপুরে প্রথম আলোর সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, ‘আমার জীবনে এর চেয়ে বেশি আর পাওয়ার কী হতে পারে! এই তো অনন্য পাওয়া। শিবু দাদা আমাকে অনেক সম্মান করেছেন, ভালোবাসা দিয়েছেন, ভালো সম্মানী দিয়েছেন। তাতেই আমি খুশি।’

কলকাতার স্টুডিওতে শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় (মাঝে) অনন্যা রুমার সঙ্গে আনহার মিয়া ( ডান থেকে দ্বিতীয়)

গানটি তৈরির গল্পও বেশ মজার। প্রায় তিন বছর আগে সিলেটের বিয়ানীবাজারের চরখাই ইউনিয়নে এক রোগী দেখতে গিয়ে তাঁর মাথায় আসে ‘বিলাই মেও মেও রে’ গানের কথা ও সুর। গানটির পেছনে অবশ্য রয়েছে জীবনের কিছু অভিমান। আনহার মিয়া জানান, একসময় তাঁর কয়েকজন শিষ্য ছিলেন। তাঁদের স্নেহ–যত্নে বড় করেছেন। কিন্তু পরে তাঁরা দূরে সরে গেছেন। সেই অভিমান থেকেই গানে বিড়ালের রূপকে নিজের মনের কথা তুলে ধরেন তিনি।

আনহার মিয়া বলেন, ‘এটা প্রতীকী গান। আমারও কয়েকজন শিষ্য আছিল। তাদের আদর করে পাললাম, যত্ন করলাম। এখন আমারে চেনে না, অন্য জায়গায় থাকে। আমার কথা শোনে না, আমার সামনে আসে না। এই কারণে বললাম, আমার ঘরে থাকে বিলাই, আমার ঘরে খায়। আমারে না জিগাইয়া কার বাড়িতে যাও, বিলাই মেও মেও।’

গ্রামের মানুষের মুখে মুখে ঘুরে বেড়ানো আনহার মিয়ার এই গানই একসময় পৌঁছে যায় কলকাতার চলচ্চিত্র নির্মাতাদের কাছে। আনহার মিয়া সেই গল্প জানালেন এভাবে, কলকাতায় যাওয়ার পর শুনি, একদিন সকালে ইউটিউব চ্যানেলে গানটি শুনে পছন্দ হয় শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের। পরে চ্যানেল আইয়ের অনুষ্ঠান প্রযোজক অনন্যা রুমার মাধ্যমে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। আনহার মিয়াকে খুঁজে না পেয়ে প্রথমে অন্য শিল্পীর কণ্ঠে গানটি রেকর্ড করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। পরে আনহার মিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ হলে তাঁকে কলকাতায় আমন্ত্রণ জানানো হয়।

আনহার মিয়া বলেন, ‘আমাকে না পেয়ে প্রথমে বনী চক্রবর্তী গানটি গেয়েছেন। পরে তাঁদের ডাকে অনন্যা রুমা আপাসহ ২৪ সেপ্টেম্বর কলকাতায় যাই। ২৫ সেপ্টেম্বর আমি গানটিতে কণ্ঠ দিই। এখন বনী চক্রবর্তীর গাওয়া গানটি প্রকাশ করা হয়েছে। আমাকে বলেছে, ১৫ অক্টোবর আমারটা ছাড়া হবে। আজ তো ১৬ তারিখ, এখনো ছাড়েনি। আমারটা যদি না–ও ছাড়ে, কোনো দুঃখ নেই। কারণ, আমাকে যে সম্মান ও সম্মানী দিয়েছে, তা চিন্তার বাইরে।’

বনী চক্রবর্তীর প্রশংসাও করলেন আনহার মিয়া। তাঁর মতে, ‘রেকর্ডিংয়ের সময় বনী চক্রবর্তীর সঙ্গে কথা হয়েছে। উনি বললেন, ভাই, আপনার দারুণ কণ্ঠ। আমি আপনাকে ফলো করে গেয়েছি। এরপর আমাকে ওনার রেকর্ডটি শোনান। কোনো ভুল আছে কি না, দেখতে বলেন।’

ছোটবেলা থেকেই গানের প্রতি টান আনহার মিয়ার। মাত্র আট বছর বয়সে মো. জমির মিয়া নামের এক গুরুর কাছে দীক্ষা নিতে বাড়ি ছেড়েছিলেন। এ নিয়ে মা ও বড় ভাইয়ের মারও খেয়েছেন। বারবার প্রতিজ্ঞা করেছেন, আর বাড়ি ছাড়বেন না। কিন্তু গানের টান তাঁকে ফিরিয়ে নিয়ে গেছে সেই পথেই। পড়াশোনা করেছিলেন ক্লাস টু পর্যন্ত। গুরুর কাছ থেকেই শিখেছেন গান ও সুরের নানা ধরন। এখনো সুযোগ পেলেই গান করেন। পাশাপাশি বাংলা ঢোল স্টুডিওতে ঢোল বাজান। সিলেট বেতারেও পাঁচ বছর ধরে ঢোল বাজাচ্ছেন। নিজের লেখা গানের সংখ্যা অবশ্য খুব বেশি নয়। আনহার মিয়া বলেন, ‘আমি অল্প শিক্ষিত মানুষ। আমার লেখা গানের সংখ্যা খুব কম। তিন–চারটা গান হবে আমার লেখা।’

এক ছেলে ও পাঁচ মেয়ের বাবা আনহার মিয়া। তাঁর বড় ছেলে একটি ল্যাবে প্যাথলজিস্ট হিসেবে কাজ করেন। মেয়েদের কেউ বিএ পড়ছেন, কেউ উচ্চমাধ্যমিকে, অন্যরা স্কুলে। স্ত্রী–সন্তানেরা তাঁর গান কলকাতার সিনেমায় জায়গা করে নেওয়ায় খুশি। বাবা–মাও আনন্দিত। কলকাতায় যাওয়ার আগে তাঁদের জানিয়ে গিয়েছিলেন আনহার মিয়া।
ভবিষ্যতেও গান করে যেতে চান আনহার মিয়া। তাঁর মতে, ‘যত দিন বেঁচে আছি, ক্ষমতা আছে, তত দিন চালিয়ে যাব। যে সময় আর পারব না, তখন কবিরাজ হিসেবে বা বাউল হিসেবে—যে যেভাবে চায়, সেভাবেই মনে রাখুক। এ নিয়ে আমার কোনো আপত্তি নেই।’