বিদায়ী বছরটা যেন গায়ক সুমনের জীবনের এক দুঃস্বপ্ন। অর্থহীন ব্যান্ডের এই গায়ক বেজবাবা সুমন নামেই পরিচিত। সেই সময়ে অসুস্থতা নিয়ে তাঁকে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে শুয়ে ভাবতে হয়েছে, আর কি জন্মভূমি দেখা হবে। ফিরতে পারবেন গানের ভুবনে? এটাই যেন তাঁর জীবনের সবচেয়ে খারাপ মুহূর্তের একটি। গত বছরের বেঁচে থাকার সংগ্রামের সেসব কথা ভক্তদের সঙ্গে ভাগাভাগি করেছেন অর্থহীন ব্যান্ডের এই গায়ক। সেই লেখা সম্পর্কে নিজেই লিখেছেন, ‘দেখেন, আমি কত বড় সুপার হিরোমার্কা ভাব নেবার জন্য এত বড় স্ট্যাটাস লিখিনি?’ কী লিখেছেন এই গায়ক?
ফেসবুক স্ট্যাটাসের শুরুতেই সুমন লিখেছেন, ‘২০২১ সালের শুরুটা ভয়ানক খারাপ ছিল আমার। দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা বিছানাতেই পড়ে থাকতাম। স্পাইনের জটিলতার কারণে কিছুক্ষণের জন্য দাঁড়াতে অথবা হাঁটতে পারলেও দু-তিন মিনিটের বেশি বসে থাকাটা ছিল পুরোপুরি অসম্ভব। অসহ্য যন্ত্রণায় মাঝেমধ্যে তাকিয়ে থাকতে পারতাম না, জ্ঞান হারিয়ে ফেলতাম। পেইনকিলার ইনজেকশন দিলে কিছুক্ষণের জন্য ঠিক থাকতাম। কিন্তু সেটার এফেক্ট চলে গেলেই ব্যথায় চিৎকার করে উঠতাম। আমার মতো একজন মানুষ শুধু বসে থাকতে না পারলে কী হয় জানেন? সে মানুষটা কাজে যেতে পারে না। বেজ বাজাতে পারে না। স্টুডিওতে ঢুকে কিছু রেকর্ডিং করতে পারে না। গিটার হাতে নিয়ে কোনো গান লিখতে পারে না। কোনো কনসার্ট করতে পারে না। গাড়িতে চড়তে পারে না। প্রিয়জনদের সঙ্গে আড্ডা দেওয়া তো দূরের কথা, ১০ মিনিটের জন্য তাঁদের সঙ্গে খাবার টেবিলেও বসতে পারে না। এত খারাপ একটা সময় দিয়ে যাওয়ার সময়েও আমি চাইনি মানুষ জানুক আমি কিসের ভেতর দিয়ে যাচ্ছি। সবার মন খারাপ করানোর কোনো দরকার ছিল না তখন। সব সময় মনে হয়েছে, সামনে তো ঠিক হয়েই যাব, তখন না হয় সবাই জানুক। কিন্তু শরীর ঠিক হওয়ার কোনো আশা দেখছিলাম না।’
তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে থাকে। তাঁর চিকিৎসার জন্য জার্মানিতে যাওয়ার কথা থাকলেও, করোনার কারণে যাওয়া সম্ভব হয়নি। পরে তাঁকে দ্রুত নেওয়া হয় ব্যাংককে। সুমন লিখেছেন, ‘মার্চের ১০ তারিখ আমাকে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে করে দেশের বাইরে নিয়ে যাওয়া হয় চিকিৎসার জন্য। ঢাকার এয়ারপোর্টে ইমিগ্রেশন অফিসার আমাকে দেখে নরমাল থাকতে পারেননি। “সুমন ভাই, আপনার এত খারাপ অবস্থা হলো কী করে? আমরা তো কিছু জানি না!” ঠিক ওই মুহূর্তে আমি নিজেও স্বাভাবিক থাকতে পারিনি। ওই মুহূর্তে মনে তীব্র একটা সন্দেহ জেগেছিল, “আবার দেশে ফিরে আসতে পারব তো?” এই অনুভূতি কিছুক্ষণের জন্য আমার ভেতরে ছিল। ওই “কিছুক্ষণ” আমার জীবনের সবচেয়ে খারাপ সময়গুলোর মধ্যে একটা। ওই “কিছুক্ষণ” আমি ছিলাম অনেক “দুর্বল” কেউ একজন। ওই “কিছুক্ষণ”-এর সুমন আমি নই, সেটা অন্য কোনো এক সুমন।’
সবার জীবনেই অনেক বড় বড় সমস্যা ঘাড়ে নিয়ে চলতে হয়। সবার জন্যই সেসব সমস্যা জীবনের সবচেয়ে বড় সমস্যা। মানসিক শক্তি দিয়ে বিপদকে উপেক্ষা করে ঠান্ডা মাথায় সামনে এগিয়ে যেতে হবে। অ্যাম্বুলেন্সের যাওয়ার সেই মুহূর্তের অভিজ্ঞতা শেয়ার করে সুমন লিখেছেন, ‘যে মানুষটা এতগুলো “সুখ একটি পছন্দ এবং জীবন সুন্দর” বলতে বলতে মুখে ফেনা তুলে ফেললাম, তার তো কোনো অবস্থাতেই অ্যাম্বুলেন্সে বসে তখন হাল ছেড়ে দেওয়া উচিত নয়। সুতরাং আমিও হাল ছাড়িনি। এয়ারক্র্যাফট রানওয়ে থেকে ওঠার আগেই মনের ভেতরের সন্দেহকে ধ্বংস করে দিয়েছি। নিজেকেই বলেছি, কীভাবে করব জানি না, কিন্তু আমার আবার যেভাবেই হোক সুস্থ হয়ে ফিরে আসতে হবে।’
ব্যাংককে যাওয়ার পরে সুমন টানা এক মাস ১৭ দিন চিকিৎসাধীন ছিলেন। পরে একটু একটু করে সুস্থ হতে থাকেন। মে মাসের শেষের দিকে ৬ কিলোমিটার টানা হাঁটতে হয়েছে। ২ ঘণ্টা টানা চেয়ারে বসে থেকেছেন। ফিজিওথেরাপি শেষ করে আরও ৪ মাস পর ঢাকায় ফিরেছেন। নিয়মিত হয়েছেন গানে। তিন বছর পর স্টুডিওতে ঢুকেছিলেন। দীর্ঘদিন পর শ্রোতাদের উপহার দিয়েছেন ‘বয়স হলো আমার’ শিরোনামে নতুন গান। নতুন উদ্যমে আবার ফিরেছেন কনসার্টে। সুমন লিখেছেন, ‘আমার ২০২১ সালের শুরুটা ভয়ানক খারাপ হলেও, শেষটা কিন্তু ভয়ানক সুন্দর।’
নতুন বছরে নতুন উদ্যমে আবার আশা জাগালেন ভক্তদের। এখন থেকে নিয়মিত দর্শকদের সঙ্গেই থাকবেন সুমন। তিনি লিখেছেন, ‘আজ ২০২২ সালের প্রথম দিনে দেখেন, আমি কত বড় সুপার হিরোমার্কা ভাব নেবার জন্য এত বড় স্ট্যাটাস লিখিনি। এই স্ট্যাটাসটায় একটা মেসেজ আছে। যত যা-ই হোক, কখনো হাল ছাড়বেন না। সব সময় মনে রাখবেন, গোটা পৃথিবীটা মাঝেমধ্যেই অনেক অন্ধকার লাগতেই পারে, মনে হতেই পারে আপনিই শুধু একা, আপনার সাথে আর কেউ নেই। কিন্তু মনে রাখবেন, এই কোটি কোটি মানুষের মধ্যে কোনো না কোনো একজন মানুষ আছে, যে কিনা আপনাকে ভয়ংকর ভালোবাসে, সেই ভালোবাসার কোনো সীমা-পরিসীমা নেই! আপনি একটু ধৈর্য ধরে তাকিয়ে থাকলেই সেই মানুষটিকে দেখতে পাবেন। আনকন্ডিশনাল লাভের চেয়ে ভয়ংকর সুন্দর আর কী হতে পারে! অন্ধকার মানেই সামনে আলো আসছে। আলো ছাড়া অন্ধকারের কোনো অস্তিত্ব নেই! পরম করুণাময় আমার জীবনে অনেক ধরনের পরীক্ষা নিয়েছেন, নিচ্ছেন এবং ভবিষ্যতেও হয়তোবা নেবেন। আশা করি ২০২২ সালটা আমার এবং আপনাদের সবার অনেক সুন্দর কাটবে ইনশা আল্লাহ। সবাই ভালো থাকবেন।’