শিল্পীদের নিয়ে রাষ্ট্রের কোনো সুস্পষ্ট পরিকল্পনা বা কার্যকর উদ্যোগ নেই, অথচ রাষ্ট্রের যখন প্রয়োজন হয়, তখন আবার পেটেভাতে তারা আমাদেরকে খুব ডাকাডাকির চেষ্টা করে—এমন মন্তব্য করেছেন সংগীতশিল্পী আসিফ আকবর। তাঁর মতে, কনসার্টের সুযোগের অভাব, আর্থিক অনিশ্চয়তা ও রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতার সংকটে দেশের সংগীতাঙ্গন এখন বিপর্যস্ত। এমন পরিস্থিতিতে প্রয়াত সংগীতশিল্পী আইয়ুব বাচ্চুর মতো সবাইকে এক করে আগলে রাখার মানুষও ইন্ডাস্ট্রিতে নেই। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে সরকারের সঙ্গে আলোচনা করতে শিল্পীদের একটি ঐক্যবদ্ধ প্ল্যাটফর্ম গঠনের আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
ব্যান্ডসংগীতে জনপ্রিয় শিল্পী আইয়ুব বাচ্চুর অষ্টম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে গতকাল রোববার সন্ধ্যায় ঢাকার মগবাজারের সেলিব্রেশন কমিউনিটি পয়েন্টে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে এ কথা বলেন জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী আসিফ আকবর। চট্টগ্রাম মিউজিশিয়ানস ক্লাব ঢাকা, আইয়ুব বাচ্চু ফাউন্ডেশন ও তাঁর বন্ধুমহল এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।
অনুষ্ঠানে আসিফ আকবর বলেন, ‘একজন মহিরুহ ছিলেন আইয়ুব বাচ্চু এবং তাঁকে আমরা সর্বান্তঃকরণে মিস করি। ইন্ডাস্ট্রির এই সংকট সময়ে বাচ্চু ভাইয়ের অনুপস্থিতিতে সবাইকে আগলে রাখা, এক করে রাখা এবং সবাইকে নিয়ে কাজ করা, সবার জন্য ভাবনা নেওয়ার মতো মানুষ নেই ইন্ডাস্ট্রিতে। এখন তো ইন্ডাস্ট্রি বলতে শব্দটা আছে, কিন্তু ইন্ডাস্ট্রি আছে কোমায়।’
সংগীতাঙ্গনের বর্তমান পরিস্থিতি তুলে ধরে আসিফ আকবর বলেন, দেশের অনেক শিল্পী ও সংগীতজ্ঞ বিদেশে চলে গেছেন। যাঁরা এখনো বাংলাদেশে আছেন, তাঁদের অনেকেও হয়তো দ্রুত দেশ ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেবেন কিংবা জীবনধারণের বিকল্প পথ খুঁজবেন। তাঁর মতে, শিল্পীদের এই অনিশ্চয়তা কাটাতে কার্যকর উদ্যোগের অভাব রয়েছে।
কনসার্টের সংকটকে সংগীতশিল্পীদের জীবিকা নির্বাহের অন্যতম বাধা হিসেবে উল্লেখ করেন আসিফ আকবর। তিনি বলেন, ‘মঞ্চই শিল্পীদের আয়ের অন্যতম প্রধান অবলম্বন। কিন্তু সেখানে কনসার্ট করার সুযোগ না থাকলে ব্যান্ড, একক শিল্পী, নতুন শিল্পী কিংবা বিভিন্ন প্রতিযোগিতা ও প্রতিভা অন্বেষণ কার্যক্রম থেকে উঠে আসা সংগীতশিল্পীরা তাঁদের গান শোনাবেন কোথায়? তাঁদের জন্য প্রয়োজনীয় মঞ্চই তৈরি হচ্ছে না।’
শিল্পীদের দৈনন্দিন জীবনের সংকটের কথাও তুলে ধরেন আসিফ আকবর। তিনি বলেন, ‘সংগীতশিল্পীরা বাড়িভাড়া পেতে, ব্যাংকঋণ নিতে কিংবা ঋণের জন্য জামিনদার পেতেও সমস্যায় পড়েন। এসব কারণে তাঁদের ব্যক্তিগত জীবনেও নানা জটিলতা তৈরি হয়।’ তাঁর অভিযোগ, ‘শিল্পীদের নিয়ে রাষ্ট্রের সুস্পষ্ট পরিকল্পনা বা কার্যকর উদ্যোগ চোখে পড়ে না। অথচ রাষ্ট্রের যখন প্রয়োজন হয়, তখন আবার পেটেভাতে তারা আমাদের খুব ডাকাডাকির চেষ্টা করে।’
আইয়ুব বাচ্চুর মৃত্যুবার্ষিকীতে তাঁকে ঘিরে আরও বড় পরিসরে আয়োজন হওয়া উচিত ছিল বলেও মনে করেন আসিফ আকবর। তাঁর মতে, ‘আমাদের উচিত ছিল একজন আইয়ুব বাচ্চুকে নিয়ে সারা বাংলাদেশে একটা বন্দনা করা। আইয়ুব বাচ্চু কী ছিলেন, তাঁর অবদান কী ছিল, তাঁর অবর্তমানে কী হচ্ছে এবং আমরা কী করতে পারছি বা কী করতে পারব—এ ধরনের কোনো দিকনির্দেশনা আমাদের কাছে নেই। আমরা আসলে বিভ্রান্ত।’
সংগীতাঙ্গনের সংকট মোকাবিলায় জ্যেষ্ঠ শিল্পীদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়ে আসিফ আকবর বলেন, ‘এমন একটি ঐক্যবদ্ধ প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলা দরকার, যেখানে কোনো দল, গোষ্ঠী, অঞ্চল কিংবা সংগীতের ধরনভিত্তিক বিভাজন থাকবে না। এই প্ল্যাটফর্ম সরকারের সঙ্গে আলোচনা করে শিল্পীদের পেশাগত নিরাপত্তা ও সংগীতাঙ্গনের ভবিষ্যৎ নিয়ে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানাবে।’
কথা প্রসঙ্গে আসিফ আকবর বলেন, ‘অনেক কমিটি হয়েছে, অনেক সমিতি দেখেছি, কোনো কিছুই হয়নি আজ পর্যন্ত। আমি ২০০৩ সাল থেকে দেখে আসছি। আজ একটা শপথ নেওয়া উচিত, বাচ্চু ভাইয়ের অষ্টম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে আমরা একটি ইউনাইটেড প্ল্যাটফর্ম করব। করে আমরা সরকারের সঙ্গে দর–কষাকষি করব যে আমরা কীভাবে সারভাইভ করব।’ আসিফ আকবরের মতে, সংগীতাঙ্গনের বর্তমান অচলাবস্থা কাটাতে শিল্পীদের মধ্যে ঐকমত্য তৈরি করা জরুরি। বিচ্ছিন্নভাবে নিজেদের দাবি আদায়ের চেষ্টা না করে সম্মিলিত উদ্যোগের মাধ্যমে সরকারের সঙ্গে আলোচনায় বসতে হবে। তবেই সংগীতশিল্পীদের পেশাগত অনিশ্চয়তা কাটানোর পথ তৈরি হতে পারে।
অনুষ্ঠানে ছিলেন শহীদ মাহমুদ জঙ্গী, পার্থ বড়ুয়া, পিলু খান, রফিকুল আলম, ফোয়াদ নাসের বাবু, লাবু রহমান, রিপন খান, গোলাম মোর্শেদ, আসিফ ইকবাল, কোনাল, জয় শাহরিয়ার, সাব্বির, কিশোর, শফিক তুহিন, জুয়েল মোর্শেদ, তরুণ মুন্সি, রাশেদ ও আইয়ুব বাচ্চুর স্ত্রী ফেরদৌস আক্তার চন্দনা প্রমুখ।