মোহাম্মদ রফি
মোহাম্মদ রফি

মৃত্যুর ৪৬ বছর পরও কেন ফুরায় না রফির আবেদন

বছর কয়েক আগের কথা। শীতের এক সকাল। কলকাতার সদর স্ট্রিট থেকে হেঁটে নিউমার্কেট হয়ে বড়বাজারের দিকে যাচ্ছি। চারপাশে মানুষের ভিড়, গাড়ির হর্ন, ফেরিওয়ালার হাঁক—সবকিছুর মাঝেও হঠাৎ কানে এসে ঠেকল এক চেনা সুর—‘পাখিটার বুকে যেন তির মেরো না।’ দাঁড়ালাম। রাস্তার ধারের ছোট্ট একটি পানের দোকান থেকে ভেসে আসছে গানটি।

দোকানটির নাম ‘তাজমহল পান শপ’। সামনে বড় করে লেখা, ‘সুন্দর পান, সুন্দর গান’। ভেতরে চোখে পড়ল, মোহাম্মদ রফির সারি সারি ছবি যত্ন করে সাজিয়ে রাখা। প্রতিদিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত এই দোকানে বাজে শুধু রফির গান। যেন একটি ছোট্ট পানের দোকান নয়, কিংবদন্তি এই শিল্পীর প্রতি এক নীরব শ্রদ্ধার জায়গা।

গত ৩১ জুলাই, মনে পড়ে গেল সেই দোকানটির কথা। ভাবছিলাম, একজন শিল্পীর সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি বোধ হয় এটাই—মৃত্যুর চার দশকের বেশি সময় পরও যাঁর গান কোনো বিশেষ আয়োজনের অপেক্ষায় থাকে না; মানুষের প্রতিদিনের জীবনযাপনেরই অংশ হয়ে থাকে।

সেদিন থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যতবারই নিউজফিডে ঢুকেছি, প্রায় প্রতিবারই সামনে এসেছে মোহাম্মদ রফির ছবি, তাঁর গানের লিংক কিংবা তাঁকে ঘিরে মানুষের নানা স্মৃতিচারণা। অবশ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদমের একটা স্বভাব আছে—যে বিষয়ে আগ্রহ দেখানো হয়, সেই বিষয়ই ঘুরেফিরে সামনে এনে দেয়। আমার ক্ষেত্রেও হয়তো সেটাই হয়েছে। কিন্তু রফির বেলায় বিষয়টি শুধু অ্যালগরিদমে আটকে থাকেনি। একটি গান থেকে আরেকটি গান, একটি স্মৃতি থেকে আরেকটি গল্প—ঘুরেফিরে রফির কাছেই ফিরেছি। জন্মদিন পেরিয়ে গেছে বেশ কিছুদিন, কিন্তু তাঁকে নিয়ে সেই মুগ্ধতা কাটেনি। বরং মনে হয়েছে, রফির মতো শিল্পীকে স্মরণ করার জন্য বিশেষ কোনো দিনই আসলে জরুরি নয়। সেই টান থেকেই একটু দেরিতে হলেও ফিরে দেখা তাঁর জীবন, গান আর সেই অনন্য কণ্ঠের গল্প।

৪৬ বছর আগে, ১৯৮০ সালের ৩১ জুলাই থেমে যায় সেই কণ্ঠ। সকাল থেকেই শরীরটা ভালো ছিল না। তবু কাজ থামাননি। একটি গানের রেকর্ডিংয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, নিজের মতো করে অনুশীলনও করছিলেন।

হঠাৎ হৃদ্রোগে আক্রান্ত হন। দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হলেও আর তাঁকে ফিরিয়ে আনা যায়নি। মাত্র ৫৫ বছর বয়সে থেমে যায় উপমহাদেশের অন্যতম মধুর সেই সুরেলা কণ্ঠ।

মোহাম্মদ রফি (১৯২৪–১৯৮০)

পরদিন মুম্বাই যেন অন্য এক শহর। অঝোর বৃষ্টিকে উপেক্ষা করে হাজার হাজার মানুষ নেমে এসেছিল রাস্তায়। সংগীতশিল্পীর শেষযাত্রায় এমন জনসমুদ্র ভারত খুব কমই দেখেছে। রাজ কাপুর, দিলীপ কুমার, অমিতাভ বচ্চন, লতা মঙ্গেশকর, কিশোর কুমার—কে ছিলেন না সেই শোকমিছিলে! বান্দ্রার মসজিদে মানুষের ঢল সামলাতে হিমশিম খেয়েছিল পুলিশ। পাঁচিল টপকে, জামাকাপড় ছিঁড়ে, এমনকি রক্তাক্ত হয়েও মানুষ শুধু একবার প্রিয় শিল্পীকে শেষবারের মতো দেখতে চেয়েছিল। সেই দৃশ্য আজও ভারতীয় সংগীত ইতিহাসের অন্যতম আবেগঘন অধ্যায়। বিভিন্ন সময়ে এমনটাই লিখেছেন সংগীত আলোচকেরা।

চার দশকের বেশি সময় পেরিয়ে গেছে। কিন্তু মোহাম্মদ রফির গান এখনো নতুন প্রজন্মের প্লেলিস্টে জায়গা করে নেয়, সংগীতশিল্পীদের কাছে হয়ে ওঠে শিক্ষার উপকরণ, আর শ্রোতাদের কাছে থেকে যায় আবেগের অন্য নাম। প্রজন্ম বদলায়, প্রযুক্তি বদলায়, গান শোনার মাধ্যম বদলায়; কিন্তু তাঁর কণ্ঠে গাওয়া সেই সুরগুলো বারবার ফিরে আসে। নতুন শ্রোতা আবিষ্কার করে, পুরোনো শ্রোতা ফিরে যায় নস্টালজিয়ায়। আমার দেখা কলকাতার সেই ছোট্ট পানের দোকানটি যেন তারই একটি প্রতীক। যেখানে প্রতিদিন বাজতে থাকা কয়েকটি গান মনে করিয়ে দেয়, রফিরা আসলে কখনো বিদায় নেন না; তাঁরা বেঁচে থাকেন মানুষের স্মৃতিতে, অভ্যাসে আর ভালোবাসায়। তাঁর মৃত্যুব ৪৬ বছর ফিরে দেখা যাক, কীভাবে পাঞ্জাবের এক কিশোর হয়ে উঠেছিলেন উপমহাদেশের সবচেয়ে প্রিয় কণ্ঠগুলোর একজন।

কলকাতার সেই পানের দোকান

এক ফকিরের গান বদলে দিয়েছিল জীবন
১৯২৪ সালের ২৪ ডিসেম্বর অবিভক্ত ভারতের পাঞ্জাবের কোটলা সুলতান সিং গ্রামের এক মুসলিম পরিবারে জন্ম মহম্মদ রফির। পরিবারের সবাই তাঁকে ডাকতেন ‘ফিকু’ নামে। ছোট্ট গ্রামের সাধারণ জীবন, গবাদিপশুর পাল আর মাটির পথ—এই ছিল তাঁর বেড়ে ওঠার পরিবেশ। কিন্তু সেই গ্রামেই প্রায়ই আসতেন এক ভ্রাম্যমাণ ফকির। হাতে একতারাসদৃশ বাদ্যযন্ত্র, কণ্ঠে ভজন ও লোকগান। সেই ফকিরের গান যেন সম্মোহিত করে ফেলেছিল ছোট্ট রফিকে।
ফকিরের গান শুনতে শুনতেই সংগীতের প্রেমে পড়েন তিনি। বয়স তখন মাত্র আট-নয় বছর। সুযোগ পেলেই নীরবে ফকিরের পিছু নিতেন। একদিন বিষয়টি চোখে পড়ে সেই ফকিরের। তিনি জানতে চান, কেন প্রতিদিন তাঁর পেছনে ঘুরে বেড়ায় ছেলেটি। লাজুক কিশোর রফি জবাব দেন, তাঁর কণ্ঠের প্রেমে পড়ে গেছেন তিনি। ফকির যে গানটি গাইছিলেন, সেটিও তিনি মুখস্থ করে ফেলেছেন। বিস্মিত ফকির তখন তাঁকে গান গাইতে বলেন। শিশুর কণ্ঠে নিজের গান শুনে মুগ্ধ হন তিনি। দুহাত তুলে আশীর্বাদ করেন রফিকে। পরে রফির ছেলে শাহিদ রফি এক সাক্ষাৎকারে এ ঘটনাকেই বাবার সংগীতজীবনের প্রথম বড় প্রেরণা বলে উল্লেখ করেছিলেন।

শোনা যায় রয়্যালটি পাওয়ার বিষয়ে রফি ও লতার মধ্যে বিবাদ হয়েছিল

তবে পরিবারের সবাই যে তাঁর গান গাওয়ার পক্ষে ছিলেন, তা নয়। রফির বাবা চাইতেন ছেলে অন্য পেশায় মন দিক। কিন্তু তাঁর সবচেয়ে বড় শক্তি হয়ে দাঁড়ান মা। ছেলের চোখে গানের প্রতি ভালোবাসা দেখে তিনি আশ্বস্ত করেছিলেন, ‘চিন্তা করিস না, আমি সবটা সামলে নেব।’ মায়ের সেই নীরব সমর্থনই রফিকে স্বপ্ন দেখার সাহস জুগিয়েছিল।
এরই মধ্যে পরিবার অমৃতসর ছেড়ে লাহোরে চলে আসে। নতুন শহরে বড় ভাইয়ের বন্ধু আবদুল হামিদের উৎসাহে নিয়মিত শাস্ত্রীয় সংগীতের তালিম নিতে শুরু করেন রফি। ওস্তাদ আবদুল ওয়াহিদ খান, পণ্ডিত জীবন লাল মাট্টু, ফিরোজ নিজামীর মতো গুণী শিক্ষকের কাছে সংগীতের ব্যাকরণ শেখেন তিনি। কিন্তু আনুষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি ছোটবেলার সেই ফকিরের কাছ থেকেই পাওয়া আবেগ ও দরদ তাঁর গায়কির ভেতরে সারা জীবন রয়ে যায়।

কৈশোরের একটি ঘটনাই তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। লাহোরে গায়ক কে এল সায়গলের একটি অনুষ্ঠানে বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় সায়গল সাউন্ড সিস্টেম ছাড়া গান গাইতে রাজি হননি। তখন আবদুল হামিদ আয়োজকদের অনুরোধ করে তরুণ রফিকে মঞ্চে তোলেন। খালি গলায় তাঁর গান মুহূর্তেই মুগ্ধ করে উপস্থিত দর্শকদের। সেই আসরে উপস্থিত ছিলেন সংগীত পরিচালক শ্যাম সুন্দর। তিনি তরুণ রফির অসাধারণ কণ্ঠে সম্ভাবনার আভাস পান এবং পরবর্তীকালে চলচ্চিত্রে গান গাওয়ার সুযোগ করে দেন। সেই ঘটনাই খুলে দেয় ভারতীয় সংগীতের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের দরজা।

হারমোনিয়াম বাজিয়ে গান তুলছেন রাহুল দেব বর্মন। তাঁর সামনে গানের খাতা হাতে বসে আছেন রফি। আর মেঝেতে শোয়া কালো চশমা পরা লোকটিকে কি চেনা যায়? তিনি অভিনেতা দেব আনন্দ

লাহোর থেকে বোম্বে
পাঞ্জাবি চলচ্চিত্র ‘গুল বালুচ’-এ প্রথম গান গাওয়ার পর ১৯৪৪ সালে রফি বোম্বেতে চলে আসেন। সেখানেই শুরু হয় তাঁর প্রকৃত সংগ্রাম। কিছুদিনের মধ্যেই নওশাদের মতো কিংবদন্তি সংগীত পরিচালকের নজরে পড়েন। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। নওশাদের পাশাপাশি ও পি নাইয়ার, শংকর-জয়কিষান, শচীন দেববর্মন, মদন মোহন, রওশনসহ প্রায় সব বড় সংগীত পরিচালকের আস্থার শিল্পী হয়ে ওঠেন তিনি।
হিন্দি সিনেমার সোনালি যুগ বলতে যে সময়টিকে বোঝানো হয়, সেই সময়ের প্রায় প্রতিটি বড় নায়কের কণ্ঠ হয়ে উঠেছিলেন রফি। দিলীপ কুমার, দেব আনন্দ, শাম্মি কাপুর, রাজেন্দ্র কুমার, ধর্মেন্দ্র, জিতেন্দ্র, রাজেশ খান্না, এমনকি অমিতাভ বচ্চনের পর্দার আবেগও অনেক সময় জীবন্ত হয়েছে তাঁর কণ্ঠে।

নিজেকে বারবার বদলে ২৬ হাজার গান!
মোহাম্মদ রফিকে শুধু অসাধারণ কণ্ঠের শিল্পী বললে তাঁর মূল্যায়ন সম্পূর্ণ হয় না। তাঁর প্রকৃত শক্তি ছিল নিজেকে বদলে নেওয়ার বিরল ক্ষমতা। তিনি কখনো একই ধরনের গায়ক হয়ে থাকেননি। সময় বদলেছে, সিনেমার ভাষা বদলেছে, নায়কদের অভিনয়ের ধরন বদলেছে, সংগীত পরিচালকদের ভাবনাও পাল্টেছে—আর প্রতিটি পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেকেও নতুন করে গড়ে তুলেছেন তিনি।

ভারতের প্রখ্যাত দুই সংগীতশিল্পী মহাম্মদ রফি ও কিশোর কুমার। তাঁরা দুজনই প্রয়াত

রফির গানের তালিকা একবার চোখ বোলালেই বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে যায়। একই কণ্ঠে তিনি যেমন ভক্তিমূলক ভজন গেয়েছেন, তেমনি কাওয়ালি, গজল, রাগাশ্রয়ী গান, প্রেমের গান, দেশাত্মবোধক গান, ঈদ উপলক্ষে ইসলামি আবহের গান, এমনকি রাজনৈতিক প্রচারের গানও গেয়েছেন। আবার জনি ওয়াকারের মতো কমেডিয়ানের ঠোঁটে তাঁর কণ্ঠ যেমন দুষ্টুমি আর হাস্যরসে ভরে উঠেছে, তেমনি দিলীপ কুমারের বেদনাময় চরিত্রে সেই একই কণ্ঠ হয়ে উঠেছে গভীর ও সংযত। একজন শিল্পীর কণ্ঠে এমন বৈচিত্র্য ভারতীয় চলচ্চিত্র সংগীতে খুব কমই দেখা গেছে।
শুধু কণ্ঠের সৌন্দর্যই মোহাম্মদ রফিকে কিংবদন্তি বানায়নি। তাঁর গায়কির ভেতরে ছিল অভিনয়ের এক অনন্য ক্ষমতা। তিনি গান গাওয়ার আগে বুঝে নিতেন, পর্দায় কোন অভিনেতা গানটি গাইবেন, চরিত্রটির মানসিক অবস্থা কী, দৃশ্যের আবহ কেমন। তারপর সেই অনুযায়ী বদলে যেত তাঁর কণ্ঠস্বর। শাম্মি কাপুরের দুরন্ত রোমান্টিক পর্দা-ব্যক্তিত্বে রফির কণ্ঠ হয়ে উঠত প্রাণচঞ্চল, দেব আনন্দের ক্ষেত্রে থাকত স্বতঃস্ফূর্ত আভিজাত্য, আবার দিলীপ কুমারের জন্য কণ্ঠে মিশে যেত বিষণ্নতা ও সংযম। তাই অনেকেই তাঁকে শুধু গায়ক নয়, ‘কণ্ঠের অভিনেতা’ বলেই মনে করেন।
তবে এই দক্ষতা রাতারাতি তৈরি হয়নি। ক্যারিয়ারের শুরুতে তাঁর গায়কিতে শাস্ত্রীয় সংগীতের প্রভাব ছিল বেশি। সময়ের সঙ্গে তিনি বুঝেছিলেন, চলচ্চিত্র সংগীতের চাহিদাও বদলাচ্ছে। নওশাদের গম্ভীর সুরের জগৎ থেকে ও পি নাইয়ারের ছন্দময় সংগীত, সেখান থেকে লক্ষ্মীকান্ত-পেয়ারেলালের আধুনিক সুর—প্রতিটি পর্যায়ে তিনি নিজেকে নতুনভাবে গড়ে তুলেছেন। এ কারণেই ষাট ও সত্তরের দশকের দ্রুত বদলে যাওয়া হিন্দি চলচ্চিত্র সংগীতেও তিনি সমান প্রাসঙ্গিক থেকেছেন।

রফির গায়কির আরেকটি বড় বৈশিষ্ট্য ছিল তাঁর উচ্চারণ। শুধু শব্দ স্পষ্ট করে গাওয়াই নয়, একটি শব্দ কোন আবেগে, কোন পরিস্থিতিতে উচ্চারিত হচ্ছে, সেটিও তিনি কণ্ঠে ফুটিয়ে তুলতেন। একই শব্দ ভিন্ন ভিন্ন গানে ভিন্ন আবেগে উচ্চারণ করার এই ক্ষমতা তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে। প্রেম, বেদনা, আনন্দ, অপেক্ষা কিংবা বিষাদ—প্রতিটি অনুভূতির জন্য তাঁর কণ্ঠ যেন আলাদা রং ধারণ করত। সংগীতশিক্ষকদের অনেকেই বলেন, রফির গান শুধু সুর শেখার নয়, শব্দ উচ্চারণেরও এক অনন্য পাঠশালা।

মোহাম্মদ রফি ও তাঁর পরের প্রজন্ম

এ কারণেই রফির গাওয়া দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের গান পাশাপাশি শুনলে অনেক সময় বিশ্বাসই হয় না, দুটিই একই শিল্পীর কণ্ঠ। একদিকে ‘বহুত শুকরিয়া, বড়ি মেহেরবানি’র কোমলতা, অন্যদিকে ‘হাম কালে হ্যায় তো ক্যায়া হুয়া, দিলওয়ালে হ্যায়’-এর দুষ্টুমি কিংবা ‘পুকারতা চলা হুঁ ম্যায়’-এর মুক্ত উচ্ছ্বাস—প্রতিটি গানেই তিনি যেন নতুন একজন শিল্পী। অথচ কণ্ঠটি একই।
সমালোচকদের মতে, তিন দশকের বেশি দীর্ঘ ক্যারিয়ারে হাজারো গান গেয়েছেন মোহাম্মদ রফি। কিন্তু বিস্ময়কর হলো, এত কাজের মধ্যেও তাঁর গায়কি কখনো একঘেয়ে হয়ে ওঠেনি। প্রতিটি গানকে তিনি আলাদা চরিত্র হিসেবে দেখেছেন, আর সেই চরিত্রের প্রয়োজন অনুযায়ী বদলে নিয়েছেন নিজের কণ্ঠ, উচ্চারণ, আবেগ ও পরিবেশনার ধরন। এই নিরন্তর আত্মপরিবর্তনের ক্ষমতাই তাঁকে শুধু জনপ্রিয় গায়ক নয়, ভারতীয় চলচ্চিত্র সংগীতের ইতিহাসে এক অনন্য শিল্পীতে পরিণত করেছে।
রফির গাওয়া গানের সংখ্যা নিয়ে নানা মত রয়েছে। বিভিন্ন সূত্রে বলা হয়, প্রায় চার দশকের সংগীতজীবনে তিনি ২৬ হাজারের বেশি গান গেয়েছেন। সংখ্যাটি নিয়ে বিতর্ক থাকলেও একটি বিষয়ে কারও দ্বিমত নেই—ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাসে এত বৈচিত্র্যময় ও এত বিপুল ভান্ডার খুব কম শিল্পীই রেখে গেছেন।

হিন্দি, উর্দু, পাঞ্জাবি, বাংলা, মারাঠি, গুজরাটি, কন্নড়, তেলেগু, অসমিয়া, ভোজপুরি, উড়িয়া, সিন্ধি, মৈথিলীসহ অসংখ্য ভাষায় গান গেয়েছেন তিনি। এমনকি ইংরেজি, ফারসি, স্প্যানিশ ও ডাচ ভাষাতেও তাঁর কণ্ঠ ধরা পড়েছে।
রফির গানের ভুবনে ঢুকলে মনে হয়, জীবনের প্রতিটি অনুভূতির জন্য তিনি যেন একটি করে গান রেখে গেছেন। প্রেমে আছে ‘বাহারো ফুল বরসাও’, ‘লিখে জো খত তুঝে’, ‘তসিবির তেরি দিল মে’ কিংবা ‘জো ওয়াদা কিয়া ও নিভানা পরেগা’। প্রকৃতির বন্দনায় ‘খোয়া খোয়া চাঁদ, খোলা আসমান’, পথচলার আনন্দে ‘পুকারতা চলা হুঁ ম্যায়’; আবার ‘কৌন হ্যায় জো সপনো মে আয়া’ কিংবা ‘নফরত কি দুনিয়া কো ছোড়কে’র মতো গানেও তাঁর কণ্ঠ ভিন্ন আবেগে ধরা দিয়েছে। একেকটি গান যেন একেকটি সময়, একেকটি চরিত্র।
হয়তো বাংলা ভাষার প্রতিও রফির ছিল আলাদা টান ছিল। সংখ্যায় খুব বেশি না হলেও তাঁর গাওয়া বাংলা গানগুলো আজও শ্রোতাদের হৃদয়ে অমলিন। ‘ওরে মনকে এমন দাগা দিয়ে’, ‘কথা ছিল দেখা হবে’, ‘না–ই বা পরিলে আজ মালা চন্দন’ কিংবা ‘ওই দূর দিগন্ত পারে’—প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এসব গান সমান জনপ্রিয়।
তবে বাংলা গানের ভান্ডারে তাঁর সবচেয়ে অনন্য সংযোজন নিঃসন্দেহে কাজী নজরুল ইসলামের ‘আলগা করো গো খোঁপার বাঁধন’। বাংলা তাঁর মাতৃভাষা ছিল না, তবু উচ্চারণের স্বচ্ছতা, শব্দের প্রতি মমত্ব আর সুরের ভেতরে আবেগ মিশিয়ে যে নিবেদন তিনি তৈরি করেছিলেন, তা আজও বিস্ময় জাগায়। অনেক সংগীতপ্রেমী ও রফি-অনুরাগীর কাছে এটি নজরুলসংগীতের অন্যতম সেরা পুরুষ কণ্ঠের পরিবেশনা।


এ আলোচনায় আরেকটি বাংলা গানের কথা না বললেই নয়—‘পাখিটার বুকে যেন তির মেরো না।’ গানের কথা যেমন কোমল, তেমনি রফির কণ্ঠে মিশে আছে এক অদ্ভুত মমতা ও মানবিক আবেদন। রূপক অর্থে গাওয়া তাঁর গায়কিতে গানটি শুধু প্রেম কিংবা বেদনার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না, যেন সব অসহায় প্রাণের প্রতি এক আর্তি হয়ে ওঠে। এ কারণেই বাংলাদেশের শ্রোতাদের কাছে গানটি আজও সমান আবেগের, সমান প্রিয়।
আসলে বাংলা ভাষায় রফির গাওয়া গান সংখ্যায় খুব বেশি নয়, কিন্তু যে কটি গান তিনি রেখে গেছেন, প্রতিটিতেই রয়েছে আন্তরিকতার ছাপ। শুনতে শুনতে কখনো মনেই হয় না, বাংলা তাঁর মাতৃভাষা ছিল না। বরং মনে হয়, তিনি শুধু একটি গান গাইছেন না; বাংলা ভাষার সৌন্দর্য, শব্দের মাধুর্য আর আবেগকেও নিজের কণ্ঠে ধারণ করছেন।

পরিবারের সঙ্গে

ছিলেন সবার প্রিয়
মোহাম্মদ রফিকে ঘিরে আরেকটি বিষয় প্রায় সবাই উল্লেখ করেন—তাঁর অসাধারণ ব্যক্তিত্ব। তিনি বহুবার পারিশ্রমিক ছাড়াই গান গেয়েছেন। আর্থিকভাবে অসচ্ছল শিল্পীদের সাহায্য করেছেন নীরবে। নিজের দানের কথা কখনো প্রকাশ করেননি। এমনকি জীবদ্দশায় করা বহু দান নিজের সচিব জাহিরের নামে করেছেন। কেউ জানতে চাইলে বলতেন, ‘দেনেওয়ালা ম্যায় কৌন হুঁ? সব উপরওয়ালা।’
চলচ্চিত্রজগতের চাকচিক্য থেকেও নিজেকে দূরে রাখতেন। রেকর্ডিং স্টুডিও আর বাড়ি—এই ছিল তাঁর জগৎ। পার্টি কিংবা সামাজিক আড্ডায় খুব কমই দেখা যেত তাঁকে। পরিবার, গান আর সাধারণ জীবনই ছিল তাঁর পছন্দ।

সমসাময়িকদের সঙ্গে তাঁর প্রতিযোগিতা ছিল, কিন্তু ব্যক্তিগত সম্পর্কে ছিল না কোনো তিক্ততা। কিশোর কুমারের সঙ্গে তাঁকে দীর্ঘদিন প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখা হলেও বাস্তবে দুজনের মধ্যে ছিল গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা। রফির মৃত্যুর পর তাঁর মরদেহের পা ধরে কিশোর কুমারের কান্নার সেই ছবি আজও ভারতীয় সংগীত ইতিহাসের সবচেয়ে আবেগঘন আলোকচিত্রগুলোর একটি।

শচীন দেববর্মনের সঙ্গে

যে বিদায়ে কেঁদেছিল দুই দেশ
৩১ জুলাই ১৯৮০ সালে তাঁর মৃত্যুর পর শুধু ভারত নয়, পাকিস্তানেও নেমে এসেছিল শোকের ছায়া। ভারতের বহু মানুষ শোক পালন করেন। পাকিস্তানের লাহোর বেতার দিনের সব অনুষ্ঠান বাতিল করে ঘণ্টার পর ঘণ্টা শুধু রফির গান প্রচার করে। শ্রোতাদের অনুরোধে সেই সম্প্রচার আরও দীর্ঘ করতে হয়েছিল। প্রবল বর্ষণেও তাঁর শেষযাত্রায় হাজার হাজার মানুষের উপস্থিতি প্রমাণ করে দিয়েছিল, তিনি শুধু একজন প্লেব্যাক শিল্পী ছিলেন না; কোটি মানুষের আবেগের অংশ হয়ে উঠেছিলেন।
পুরস্কারের চেয়েও বড় তাঁর উত্তরাধিকার

ছয়বার ফিল্মফেয়ার পুরস্কার, ভারতের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার, পদ্মশ্রী—সম্মানের তালিকা দীর্ঘ । পরে ‘স্টারডাস্ট’-এর পাঠক জরিপে তিনি ‘শতাব্দীর সেরা গায়ক’ নির্বাচিত হন । সিএনএন-আইবিএনের এক সমীক্ষায়ও তাঁকে হিন্দি চলচ্চিত্রের সর্বকালের সেরা কণ্ঠশিল্পী হিসেবে বেছে নেওয়া হয়।
তবে রফির প্রকৃত উত্তরাধিকার কোনো পুরস্কারে সীমাবদ্ধ নয়। তাঁর গান এখনো নতুন শিল্পীরা অনুশীলন করেন। সংগীতের রিয়েলিটি শোগুলোতে সবচেয়ে বেশি গাওয়া শিল্পীদের একজন তিনি। ভারত, বাংলাদেশ, পাকিস্তান—পুরো উপমহাদেশেই তাঁর জন্মদিন ও মৃত্যুবার্ষিকী নিয়মিতভাবে স্মরণ করা হয়।
একজন শিল্পীর সাফল্য তখনই পূর্ণতা পায়, যখন তাঁর কণ্ঠ সময়কে অতিক্রম করে নতুন প্রজন্মের কাছেও সমান প্রাসঙ্গিক থাকে। মোহাম্মদ রফি সেই বিরল শিল্পীদের একজন, যাঁর গান শুনতে কোনো নস্টালজিয়ার প্রয়োজন হয় না। প্রতিটি প্রজন্মই তাঁকে নতুন করে আবিষ্কার করে।
লন্ডনের এক অন্ধ শ্রোতা একবার বলেছিলেন, ‘যত দিন আমার কান শুনতে পাবে, তত দিন আমার চোখের প্রয়োজন হবে না।’ এই একটি বাক্য যেন মোহাম্মদ রফির সংগীতজীবনের সবচেয়ে সুন্দর মূল্যায়ন।