১৯৭৮ সালে সিলেটের এক কনসার্টে বাঁ থেকে সেলিম হায়দার, আজম খান, ফোয়াদ নাসের বাবু, জাকিউর রহমান এবং মুরাদ রহমান ছবি: ফেসবুক থেকে সংগৃহীত
১৯৭৮ সালে সিলেটের এক কনসার্টে বাঁ থেকে সেলিম হায়দার, আজম খান, ফোয়াদ নাসের বাবু, জাকিউর রহমান এবং মুরাদ রহমান ছবি: ফেসবুক থেকে সংগৃহীত

ফিফটি নট আউট

আনুষ্ঠানিক যাত্রার ৪৯ বছর পেরিয়ে ৫০ বছরের পথচলা শুরু করছে ফিডব্যাক। ‘ফিডব্যাক: ফিফটি নট আউট’ শিরোনামে শুরু হচ্ছে তাদের সুবর্ণজয়ন্তীর আয়োজন। এক বছর ধরে গানে গানে এই উদ্যাপন চলবে, যার শেষ হবে ২০২৭ সালের অক্টোবরে। খোঁজখবর জানাচ্ছেন মনজুর কাদের।

বাংলাদেশের ব্যান্ড সংগীতের ইতিহাসে ‘ফিডব্যাক’ বেশ পরিচিত একটি নাম। পাঁচ দশকের পথচলায় ব্যান্ডটি উপহার দিয়েছে ‘মৌসুমী’, ‘মেলা’, ‘চিঠি’, ‘ময়ূরী আকাশ’ ও ‘ফিরে এসো’র মতো জনপ্রিয় সব গান। সময়ের সঙ্গে সদস্য ও সংগীতের ধরনে পরিবর্তন এলেও শ্রোতাদের সঙ্গে সম্পর্কটা মোটেও কমেনি। বাংলা রক সংগীতের বিকাশের নানা পর্যায়ের সাক্ষী এই ব্যান্ড সুবর্ণজয়ন্তী উদ্যাপন করতে যাচ্ছে নতুন অ্যালবাম, নতুন সংগীতায়োজনে পুরোনো গানের উপস্থাপন ও তথ্যচিত্র নির্মাণের মধ্য দিয়ে।

নতুন অ্যালবাম, তথ্যচিত্র ও উদ্যাপন

পাঁচ দশকের পথচলা স্মরণীয় করে রাখতে ‘ফিডব্যাক’ নতুন অ্যালবাম প্রকাশ করতে চায়। এর মধ্য দিয়ে ১১ বছরের বিরতির পর ব্যান্ডটির কাছ থেকে নতুন গান পাবেন গানপ্রেমীরা। জানা গেছে, এরই মধ্যে ব্যান্ডটি বানিয়ে রেখেছে নতুন ছয়টি গান। তবে গানগুলোর বিষয়ে এখনই বিস্তারিত জানাতে চাইছেন না সদস্যরা। একের পর এক গান প্রকাশ করে শ্রোতাদের চমক দিতে চান তাঁরা।

শুধু নতুন গান নয়, ফিডব্যাকের পুরোনো জনপ্রিয় গানগুলোও নতুন সংগীতায়োজনে প্রকাশের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানালেন ফোয়াদ নাসের বাবু। এসব গানে কণ্ঠ দিতে পারেন অন্য ব্যান্ডের সদস্য কিংবা একক সংগীতশিল্পীরা। এর মধ্য দিয়ে নতুন প্রজন্মের কাছে ফিডব্যাকের গানগুলো নতুনভাবে তুলে ধরতে চায় ব্যান্ডটি।

পাশাপাশি ব্যান্ডের পাঁচ দশকের ইতিহাস নিয়ে প্রায় ২৫ মিনিটের একটি তথ্যচিত্র নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। এতে ফিডব্যাকের সাবেক ও বর্তমান সদস্যদের বক্তব্য থাকবে। ব্যান্ডটির দীর্ঘ পথচলা, সদস্যদের অভিজ্ঞতা ও সংগীতজীবনের নানা অধ্যায় তুলে ধরা হবে সেখানে।

ফিডব্যাক ব্যান্ডের বর্তমান লাইনআপ

ফোয়াদ নাসের বাবু বলেন, ‘আমাদের কিন্তু আকাশচুম্বী বা উচ্চাভিলাষী কোনো পরিকল্পনার কথা বলতে পারছি না। সামগ্রিক অবস্থার কথা বিবেচনা করে আমরা এগোব। তবে শ্রোতারা আমাদের গানের জন্যই ভালোবাসেন। আমরা গানে গানে ৫০ বছর উদ্যাপন করতে চাই।’

৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে আজ শনিবার বিকেল চারটায় ঢাকার ফার্মগেটে ডেইলি স্টার সেন্টারের এ এস মাহমুদ মিলনায়তনে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়েছে। সেখানে ব্যান্ডের বর্তমান সদস্যরা সুবর্ণজয়ন্তীর পরিকল্পনা তুলে ধরবেন।

চট্টগ্রামে শুরু ঢাকায় শেষ
ফিডব্যাকের সুবর্ণজয়ন্তীর আয়োজনের শুরুটা হবে চট্টগ্রামে কনসার্ট দিয়ে আর শেষটা হবে ঢাকায়। ২০২৭ সালের অক্টোবরে, ব্যান্ডটির ৫০ বছর পূর্তির মাসে, শেষ অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা রয়েছে। এর আগে দেশজুড়ে বিভিন্ন আয়োজনের মধ্য দিয়ে শ্রোতাদের সঙ্গে উদ্যাপনে যুক্ত হতে চায় দলটি।

চট্টগ্রামের সঙ্গে ফিডব্যাকের সম্পর্ক দীর্ঘদিনের এবং তা অন্য রকম ভালোবাসার। ১৯৭৯ সালে চট্টগ্রাম ক্লাবের শতবর্ষ পূর্তি অনুষ্ঠানে প্রথম সেখানে গান গায় ব্যান্ডটি। আর পাবলিক শো করে মুসলিম ইনস্টিটিউটে। এরপর বছরের পর বছর সেখানে কনসার্ট করেছে তারা। ফোয়াদ নাসের বাবুর দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, কোনো কোনো বছর চট্টগ্রামে ১২ থেকে ১৪টি অনুষ্ঠান করেছে ফিডব্যাক। সব মিলিয়ে ৫০ বছরে সেখানে পাঁচ শতাধিক কনসার্টে গান গাওয়ার অভিজ্ঞতা হয়েছে তাদের।

চট্টগ্রামের শ্রোতাদের ভালোবাসার কথা বলতে গিয়ে ফোয়াদ নাসের বাবু বলেন, ‘সারা দেশে কনসার্ট করে দেখেছি, আর চট্টগ্রামেও দেখেছি। আমাদের জনপ্রিয়তা সবচেয়ে বেশি চট্টগ্রামে। সেখানে আমরা রাস্তায়ও বের হতে পারি না। আগে যেমন মানুষ অটোগ্রাফ নিতে, ছবি তুলতে আসত, এখনো সেই উন্মাদনা দেখি। আমরাও চট্টগ্রামের মানুষের এই ভালোবাসা বেশ উপভোগ করি। আমরা সব সময় বলি, চট্টগ্রাম ফিডব্যাকের জন্য লাকি।’

আলট্রাসোনিকস থেকে ফিডব্যাক

১৯৭৭ সাল। ব্যান্ড আলট্রাসোনিকসের কয়েকজন সদস্যের সঙ্গে নতুন কয়েকজন সংগীতমনা মানুষ মিলে গড়ে তোলেন ফিডব্যাক। শুরুতে নাম ছিল ফিডব্যাক টোয়েন্টিয়েথ সেঞ্চুরি। প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্যদের মধ্যে ছিলেন এরশাদ মঈনুদ্দিন পপসি (ড্রামস), মুরাদ রহমান (বেজ গিটার), সেলিম হায়দার (লিড গিটার), জাকিউর রহমান (গিটার ও ভোকাল) এবং ফোয়াদ নাসের বাবু (কি–বোর্ড)। কিংসলে রিক্টার (রিদম ও ভোকাল), সানু রিক্টার (ভোকাল) ও স্যান্ড্রা হফ (ভোকাল) অতিথি শিল্পী হিসেবে অংশ নিতেন। ব্যান্ডটির তখনকার ব্যবস্থাপক ছিলেন হাফিজুর রহমান।

শুরুর দিনগুলোতে জনপ্রিয় বিদেশি গান কাভার করত ব্যান্ডটি। আস্তে আস্তে বাড়তে থাকে পরিচিতি। তৎকালীন ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেল থেকে আসে নিয়মিত গাওয়ার আমন্ত্রণ। সপ্তাহে তিন দিন সেখানে গান গাইত ফিডব্যাক। ১৯৮৭ সাল পর্যন্ত চলে এই ধারাবাহিকতা। এর মধ্যে কয়েকজন সদস্য বিদেশে চলে গেলে দলে যুক্ত হন পিয়ারু খান ও মাকসুদুল হক। ১৯৭৯–৮০ সালের দিকে নাম থেকে টোয়েন্টিয়েথ সেঞ্চুরি বাদ পড়ে। এরপর শুধু ফিডব্যাক নামেই পরিচিতি পায় ব্যান্ডটি।

শুরুর দিনগুলোর কথা মনে করে ফোয়াদ নাসের বাবু বলেন, ‘শুরুর দিনগুলোতে বেশ এক্সাইটেড ছিলাম। তখনকার বিভিন্ন জনপ্রিয় গান গাইতাম। ধীরে ধীরে পরিচিতি বাড়তে শুরু করে। প্রথম স্টেজ শোর ডাক আসে তৎকালীন ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেল থেকে।’

প্রথম কনসার্ট, প্রথম গান ও অ্যালবামের গল্প

হোটেলে নিয়মিত সংগীত পরিবেশনার অভিজ্ঞতা থেকে একসময় সাধারণ শ্রোতাদের সামনে গান গাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় ফিডব্যাক। ১৯৭৯ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর লিও ক্লাবের উদ্যোগে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতে অনুষ্ঠিত হয় ব্যান্ডটির প্রথম উন্মুক্ত কনসার্ট। শ্রোতাদের সাড়া তাদের সামনে খুলে দেয় নতুন সম্ভাবনা।

ফিডব্যাক ব্যান্ডের সদস্যরা

১৯৮১ সালে বিটিভির একটি ম্যাগাজিন অনুষ্ঠানের জন্য প্রথম গান রেকর্ড করে ফিডব্যাক, গানটির নাম ‘এই দিন চিরদিন’। এরপর অ্যালবামের মাধ্যমে শ্রোতাদের কাছে পরিচিতি বাড়তে থাকে ব্যান্ডের। ১৯৮৫ সালে সারগাম থেকে প্রকাশিত হয় প্রথম অ্যালবাম ‘ফিডব্যাক’। ১৯৮৭ সালে আসে ‘উল্লাস’, ১৯৯০ সালে ‘মেলা’। তৃতীয় অ্যালবামটি শ্রোতাদের মধ্যে বিশেষ জনপ্রিয়তা পায়। একজন শ্রোতার কথা এখনো মনে আছে বাবুর। তিনি জানালেন, ‘মেলা’ এতবার শুনেছেন যে শুনতে শুনতে ক্যাসেটের ফিতা ছিঁড়ে গিয়েছিল।

১৯৯২ সালে কলকাতার এইচএমভি থেকে প্রকাশিত হয় ‘জোয়ার’। কোনো বাংলাদেশি ব্যান্ডের এইচএমভি থেকে অ্যালবাম প্রকাশের প্রথম ঘটনা ছিল এটি। এরপর একে একে আসে ‘বঙ্গাব্দ ১৪০০’ (১৯৯৪), ‘দেহঘড়ি’ (১৯৯৫), ‘বাউলিয়ানা’ (১৯৯৬), ‘আনন্দ’ (১৯৯৯), ‘এই শতাব্দীর ফিডব্যাক’ (২০০০), ‘শূন্য ২’ (২০০২) ও ‘এখন’ (২০১৫)। দীর্ঘ বিরতির পর সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে নতুন অ্যালবাম প্রকাশের উদ্যোগ নিয়েছে ব্যান্ডটি। তবে অ্যালবামের নাম এখনো চূড়ান্ত হয়নি।

ভালোবাসা অর্জন

দীর্ঘ পথচলায় ফিডব্যাকের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন অনেক সংগীতশিল্পী। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন মুরাদ হোসেন, মাকসুদুল হক, ওমর খালেদ রুমি, মুসা রহমান, রেশাদ মাহমুদ ও হাফিজুর রহমান। সময়ের সঙ্গে সদস্য বদলালেও ব্যান্ডটির সংগীতযাত্রা থেমে থাকেনি। বর্তমানে ফিডব্যাকের সদস্য লাবু রহমান (গিটার ও ভোকাল), এনাম এলাহি টন্টি (ড্রামস ও পারকাশন), রায়হান হাসান (ভোকাল ও অ্যাকুস্টিক গিটার), ফোয়াদ নাসের বাবু (কি–বোর্ড), মোহাম্মদ দানেশ (বেজ গিটার) ও রবিউল আলম রিয়েল (ভোকাল)।

‘মৌসুমী’, ‘চিঠি’, ‘আমার নতুন আকাশে’, ‘মেলা’, ‘ফিরে এসো’, ‘ময়ূরী আকাশ’, ‘মাঝি’, ‘করি মানা’, ‘জনম দুঃখী’, ‘আদম হাওয়া’, ‘মন আজ আমার’, ‘কেমন আছি’, ‘ফসলের গান’, ‘প্রতারণা’, ‘এক আকাশ’, ‘হৃদয়ে হৃদয়ে’ ও ‘উড়ু উড়ু মনটা’—এমন অনেক গান শ্রোতাদের মনে জায়গা করে নিয়েছে। ব্যান্ডের ঝুলিতে রয়েছে ১৯৯৫ সালের ‘যায়যায়দিন বেস্ট ব্যান্ড অ্যাওয়ার্ড’ এবং ২০১৭ সালের ‘আরটিভি বেস্ট ব্যান্ড অ্যাওয়ার্ড’।

তবে ফোয়াদ নাসের বাবুর কাছে সবচেয়ে বড় অর্জন শ্রোতাদের ভালোবাসা। তাঁর মতে, একটি প্রতিষ্ঠানকে যেমন যত্নে গড়ে তুলতে হয়, তেমনি ব্যান্ডকেও লালন ও সংরক্ষণ করতে হয়। পাঁচ দশক ধরে ফিডব্যাককে এগিয়ে নেওয়ার পেছনেও রয়েছে সেই দায়বদ্ধতা। নতুন গান আর পুরোনো স্মৃতির মেলবন্ধনে সুবর্ণজয়ন্তী উদ্যাপনের মধ্য দিয়ে শ্রোতাদের সঙ্গে সেই সম্পর্ক আরও দীর্ঘ করতে চান তাঁরা।