শাহ আবদুল করিম (১৫ ফেব্রুয়ারি ১৯১৬—১২ সেপ্টেম্বর ২০০৯)
শাহ আবদুল করিম (১৫ ফেব্রুয়ারি ১৯১৬—১২ সেপ্টেম্বর ২০০৯)

শাহ আবদুল করিমের জীবনের শেষ ১০ দিন

শাহ আবদুল করিম চলে গেছেন ১৭ বছর আগে। তবু তাঁর গান আজও মানুষের আনন্দ-বেদনা, প্রেম-বিরহ আর প্রতিবাদের ভাষা। আজ শনিবার বাউলসাধকের মৃত্যুবার্ষিকীতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি ও গানের পঙ্‌ক্তি পোস্ট করে তাঁকে স্মরণ করছেন অনুরাগীরা। দেশের বিভিন্ন স্থানে রয়েছে স্মরণানুষ্ঠান ও গানের আয়োজন।
মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে আজ বিশেষভাবে প্রদর্শিত হবে শাহ আবদুল করিমের জীবন ও কর্ম নিয়ে শাকুর মজিদের প্রামাণ্যচিত্র ‘ভাটির পুরুষ’। রাজধানীর এলিফ্যান্ট রোডে দৃশ্য কারখানার কার্যালয়ে সন্ধ্যা ছয়টা থেকে রাত নয়টা পর্যন্ত চলবে প্রদর্শনী। শেষে নির্মাতার সঙ্গে থাকবে প্রশ্নোত্তর পর্ব।

প্রামাণ্যচিত্রের পর্দায় আজ আবার ফিরে আসবে কিংবদন্তি এই বাউলসাধকের জীবন ও সংগীতযাত্রা। তাঁর বর্ণাঢ্য জীবনের শেষ অধ্যায়টি ছিল বিষাদময়। জীবনের শেষ কয়েকটি দিন শাহ আবদুল করিমের কেটেছিল হাসপাতালের বিছানায়। ২০০৯ সালের আগস্ট থেকে বার্ধক্যজনিত নানা রোগে ভুগছিলেন তিনি। ৩ সেপ্টেম্বর সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার উজানধল গ্রামের বাড়িতে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন। দিরাই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রাথমিক চিকিৎসা ও অক্সিজেন দেওয়ার পর তাঁকে সিলেটের নূরজাহান জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। টানা চার দিন চিকিৎসার পর কিছুটা সুস্থও হয়ে উঠেছিলেন।

তত দিনে তাঁর স্মৃতিশক্তি অনেকটাই দুর্বল হয়ে পড়েছে। একমাত্র ছেলে শাহ নূরজালালসহ হাতে গোনা কয়েকজন ছাড়া অন্যদের ভালোভাবে চিনতে পারতেন না। কথাও বলতে পারতেন না স্পষ্টভাবে। যাঁর ভরাট কণ্ঠের গান শুনতে লাখো মানুষের আসরে নেমে আসত পিনপতন নীরবতা, শেষ দিনগুলোয় সেই মানুষটিকেই কথা বলতে হয়েছে ইশারা-ইঙ্গিতে।

৯ সেপ্টেম্বর কিছুটা খাওয়াদাওয়া করেছিলেন শাহ আবদুল করিম। ধীরে ধীরে কথাও বলছিলেন। একপর্যায়ে গান শুনতে চান। তাঁর শিষ্য বশিরউদ্দিন সরকার তখন নিজের লেখা একটি গান শোনান: ‘কী খেলা খেলতেছেন বাবা করিম শায়/ গাড়ি চলে না চলে না বলে চালাচ্ছেন মৌলায়।’ গানটি শুনে হেসেছিলেন করিম।

এরপর বশিরউদ্দিন গেয়ে শোনান তাঁর ওস্তাদেরই লেখা ‘কোন মেস্তরি নাও বানাইল’। এবার শাহ আবদুল করিমের চোখ বেয়ে পানি ঝরতে থাকে। উপস্থিত ব্যক্তিরা এমন গান শোনানোর জন্য বশিরউদ্দিনকে দোষারোপ করলে করিম ইশারায় তাঁদের থামিয়ে দেন।

১৯৮৫ সালে শাহ আবদুল করিমের শিষ্যত্ব নেওয়া বশিরউদ্দিন সেই দিনের স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে বলেছিলেন, হাসি-কান্নার পর তাঁর ওস্তাদ একেবারে নির্লিপ্ত হয়ে পড়েন। আর কোনো কথা বলেননি, কেবল ইশারায় কিছু বোঝানোর চেষ্টা করতেন। গান শোনানোর ফাঁকে একবার হাত মুঠো করে প্রতীকী কিছু তাঁর হাতে দিয়ে বলেছিলেন, ‘তোমার ঠেখন নাই’, অর্থাৎ তুমি কোথাও আটকাবে না। শিষ্যও হাত পেতে সেই অদৃশ্য আশীর্বাদ গ্রহণ করে পকেটে রাখার ভঙ্গি করেছিলেন।

শাহ আবদুল করিম। ছবি : সংগৃহীত

শাহ আবদুল করিমের প্রধান শিষ্যদের একজন বাউলশিল্পী আবদুর রহমান। ১৯৭৭ সালে করিমের শিষ্যত্ব নেওয়া রহমানকে আদর করে তিনি ডাকতেন ‘রহমান সাধু’। হাসপাতালে ওস্তাদের শেষ দিনগুলোর কথা বলতে গিয়ে আবদুর রহমান জানিয়েছিলেন, করিম কথা বলতে চাইতেন, কিন্তু তাঁর কণ্ঠ এতটাই অস্পষ্ট ছিল যে কিছু বোঝা যেত না। পরিচিতজনদের কাছে ডেকে ইশারায় বলতেন, ‘কই বেটাইন, তোমরা কই? মানুষ আনো, গফ করি। আর দরজাটা লাগাও।’

এমনিতেই স্বল্পাহারী ছিলেন শাহ আবদুল করিম। হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর খাওয়াদাওয়া প্রায় ছেড়েই দিয়েছিলেন। অল্প পরিমাণে মান্ডাড়ি-চাল পিষে তরল করে তৈরি খাবার ও ফলের রস খেতেন। শোল মাছ ও রসগোল্লা ছিল তাঁর প্রিয়। কিন্তু শেষ দিনগুলোয় সেসবের কথাও ইশারায় ফিরিয়ে দিয়েছিলেন।

১১ সেপ্টেম্বর সকালে তাঁর অবস্থার দ্রুত অবনতি হয়। ঘন ঘন শ্বাস নিতে শুরু করেন। ছেলে শাহ নূরজালাল চিকিৎসক ডাকতে কক্ষ থেকে বেরিয়ে গেলে শাহ আবদুল করিম ইশারায় আবদুর রহমানকে কাছে ডাকেন। শিষ্য তাঁকে জড়িয়ে ধরলে অস্পষ্ট স্বরে কিছু একটা বলেন এবং ধীরে ধীরে হাত তুলে তাঁর মুখে বুলিয়ে দেন। আবদুর রহমানের ধারণা, ওস্তাদ তাঁকে বলেছিলেন, ‘যাও, মানুষে তোমারে মায়া করবনে।’

চিকিৎসকেরা এসে শাহ আবদুল করিমকে দ্রুত নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে নেন। বলা হয়েছিল, পরবর্তী ৭২ ঘণ্টার আগে তাঁর অবস্থার উন্নতি বা অবনতি সম্পর্কে নিশ্চিত করে কিছু বলা যাবে না। কিন্তু সেই সময় আর পাওয়া যায়নি। হাসপাতালে ১০ দিন কাটানোর পর ২০০৯ সালের ১২ সেপ্টেম্বর সকাল ৭টা ৫৮ মিনিটে ৯৩ বছর বয়সে শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন গণমানুষের এই শিল্পী।

মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়তেই হাসপাতালের সামনে জড়ো হন অসংখ্য ভক্ত-অনুরাগী। কেউ কাঁদছিলেন, কেউ তাঁরই গান গেয়ে জানাচ্ছিলেন বিদায়। মরদেহ নেওয়া হয় সিলেট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে। সেখানে বাউলশিল্পীরা তাঁর গান গেয়ে ‘শোকগাথা’ নিবেদন করেন। পরে সিলেট ও দিরাইয়ে জানাজা শেষে কালনী নদী পেরিয়ে মরদেহ নেওয়া হয় উজানধল গ্রামে। ১৩ সেপ্টেম্বর বিকেলে স্ত্রী সরলার কবরের পাশে তাঁকে সমাহিত করা হয়।

১৯১৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি সুনামগঞ্জের দিরাইয়ে জন্ম শাহ আবদুল করিমের। অভাবের কারণে প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনা হয়নি। শৈশবে গরু চরিয়েছেন, মুদিদোকানেও কাজ করেছেন। তবে ২০ বছর বয়স হওয়ার আগেই হাওরাঞ্চলে শিল্পী হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠেন। পরবর্তী সাত দশক কেচ্ছা, মালজোড়া, বাউল ও গণসংগীতকে প্রাণবান রেখেছেন তিনি।

শাহ আবদুল করিমের লেখা গানের সংখ্যা প্রায় ৫০০। ‘আগে কী সুন্দর দিন কাটাইতাম’, ‘বসন্ত বাতাসে’, ‘গাড়ি চলে না’, ‘কোন মেস্তরি নাও বানাইল’, ‘বন্ধে মায়া লাগাইছে’সহ অসংখ্য গান এখন মানুষের মুখে মুখে। দেশভাগ, ভাষা আন্দোলন, উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান, মুক্তিযুদ্ধ ও স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে গান দিয়ে হাওরের মানুষকে জাগিয়েছেন তিনি। সাধনপথের পথিক হয়েও তাঁর গানজুড়ে ছিল অসাম্প্রদায়িকতা, মুক্তচিন্তা ও ভাগ্যবিড়ম্বিত মানুষের কথা।