‘তুমি এলে, অনেক দিনের পরে যেন বৃষ্টি এল’, ‘নীড় ছোট ক্ষতি নেই, আকাশ তো বড়’, ‘এই রাত তোমার আমার’, ‘এই পথ যদি না শেষ হয়’ কিংবা ‘মুছে যাওয়া দিনগুলি আমায় যে পিছু ডাকে’—বাংলা গানের শ্রোতা অথচ এই গানগুলোর সঙ্গে কখনো পরিচয় হয়নি, এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া কঠিন। যুগের পর যুগ পেরিয়ে গেলেও গানগুলো হারিয়ে যায়নি; বরং এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়েছে নতুন করে। রেডিও, গ্রামোফোন, ক্যাসেট, সিডি পেরিয়ে এখন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মেও জায়গা করে নিয়েছে সেসব গান। আর এই দীর্ঘ যাত্রার সারথি একজন মানুষ—হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। প্রেমে পড়া তরুণের না-বলা অনুভূতি, বিচ্ছেদের দীর্ঘশ্বাস, মধ্যবিত্ত জীবনের নস্টালজিয়া কিংবা একাকী মানুষের নির্ভরতার জায়গা—সবখানেই বারবার ফিরে এসেছে তাঁর গান।
বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ও সামাজিক জীবনের নানা পরতে আজও টের পাওয়া যায় তাঁর উপস্থিতি। বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি চত্বর, ক্যানটিন থেকে শহর–বন্দরের অলিগলি, চট্টগ্রামের ডিসি হিল থেকে রাজশাহীর পদ্মাপাড়—সাংস্কৃতিক ও সামাজিক জীবনের নানা পরতে ছড়িয়ে আছে তাঁর কণ্ঠের উপস্থিতি। কোনো নাট্যদলের মহড়াকক্ষ, পাড়ার সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান কিংবা বর্ষার বিকেলে জানালার পাশে একা বসে থাকা একজন মানুষ—সমানভাবে আপন হয়ে ওঠে তাঁর গান। সেই শৈশব, কৈশোরে শরৎকালের দুর্গাপূজার প্যান্ডেলে, স্কুলের বার্ষিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে, এমনকি ছোট্ট সেলুনের দোকানেও বহুবার শুনেছি তাঁর গান। কখনো কখনো মনে হয়েছে, হেমন্ত মুখোপাধ্যায় শুধু একজন শিল্পী নন, তিনি বাঙালির জীবনযাপনেরই অংশ বটে।
গ্রামোফোন ও ফিতার যুগ অনেক আগেই ইতিহাস হয়ে গেছে। সময়ের সঙ্গে প্রযুক্তি বদলেছে, বদলেছে গান শোনার মাধ্যমও। কিন্তু হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের আবেদন যেন বদলায়নি। কারণ, তিনি কেবল গান গাইতেন না; তিনি মানুষের অনুভূতিকে সুর আর কণ্ঠে এমনভাবে রূপ দিতেন, যেন প্রতিটি গান হয়ে উঠত শ্রোতার নিজের জীবনেরই একটি অংশ। তাঁর গায়কির বড় শক্তি ছিল এই সহজাত আন্তরিকতা। কোনো জটিল কারুকাজ নয়, কোনো প্রদর্শন নয়—শুধু গভীর মমতায় বলা কিছু কথা, যা শ্রোতার হৃদয়ে গিয়ে পৌঁছে।
গ্রামোফোন ও ফিতার যুগ অনেক আগেই ইতিহাস হয়ে গেছে। সময়ের সঙ্গে প্রযুক্তি বদলেছে, বদলেছে গান শোনার মাধ্যমও। কিন্তু হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের আবেদন যেন বদলায়নি।
গতকাল মঙ্গলবার ১৬ জুন ছিল তাঁর জন্মদিন। বাংলা গানের ইতিহাসে এই দিনটি শুধু একজন শিল্পীর জন্মদিন নয়, একটি সাংস্কৃতিক যুগের জন্মদিন বললে কি বাড়াবাড়ি হবে? যে যুগের নাম—হেমন্ত মুখোপাধ্যায়।
জন্মের এক শতাব্দীর বেশি সময় পরও তিনি কেবল স্মৃতির অংশ হয়ে থাকেননি; বরং নতুন করে ফিরে এসেছেন প্রতিটি প্রজন্মের কাছে। যেমন গতকাল জন্মদিন উপলক্ষে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমজুড়ে ভেসে বেড়িয়েছে তাঁর ছবি, গান ও স্মৃতিচারণা। কেউ ভাগ করে নিয়েছেন প্রিয় গান, কেউ লিখেছেন তাঁর কণ্ঠের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা ব্যক্তিগত স্মৃতি। ইউটিউব, স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম কিংবা ফেসবুকের ভিডিওতে নতুন করে শুনেছেন তাঁর গান হাজারো মানুষ। এ যেন আরেকবার ফিরে আসা—কোনো আনুষ্ঠানিক আয়োজনের নয়, মানুষের হৃদয়ে বেঁচে থাকার শক্তিতে।
কিন্তু কীভাবে বেনারসের এক সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে হয়ে উঠলেন বাংলা গানের ইতিহাসের সবচেয়ে প্রভাবশালী কণ্ঠগুলোর একজন? কীভাবে গল্পলেখক হওয়ার স্বপ্ন দেখা সেই তরুণ ধীরে ধীরে হয়ে উঠলেন বাংলা ও ভারতীয় সংগীতের এক অনিবার্য অধ্যায়?
জন্মদিনে ফিরে দেখা যাক সেই দীর্ঘ পথচলা, সংগ্রাম, সাফল্য আর কিংবদন্তি হয়ে ওঠার গল্প।
বেনারসের সেই শিশুটি
১৯২০ সালের ১৬ জুন বেনারসে জন্ম হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের। পরে পরিবারের সঙ্গে চলে আসেন কলকাতায়। ভবানীপুরের মিত্র ইনস্টিটিউশনে পড়াশোনার সময়ই তাঁর বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে পরবর্তী সময়ে বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির দুই উজ্জ্বল নাম—কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় ও সাহিত্যিক সন্তোষকুমার ঘোষের সঙ্গে। মজার বিষয় হলো, তখন কেউই হেমন্তকে ভবিষ্যতের গায়ক হিসেবে দেখতেন না। বন্ধুদের মধ্যে সুভাষ ছিলেন কবিতাপ্রবণ, সন্তোষের ঝোঁক ছিল সাহিত্যচর্চায়, আর হেমন্ত নিজেও স্বপ্ন দেখতেন লেখক হওয়ার। ছোটগল্প লিখতেন, এমনকি জনপ্রিয় সাহিত্য পত্রিকা ‘দেশ’-এ তাঁর গল্পও প্রকাশিত হয়েছিল। কিন্তু নিয়তি তাঁর জন্য অন্য এক ইতিহাস লিখে রেখেছিল।
সংগীতের প্রতি টান অবশ্য ছিল ছোটবেলা থেকেই। কোনো প্রাতিষ্ঠানিক তালিম ছাড়াই গ্রামোফোনে গান শুনে শুনে সুর আত্মস্থ করতেন। বন্ধু শ্যামসুন্দরের বাড়ির হারমোনিয়াম, গ্রামোফোন আর রেকর্ডই ছিল তাঁর প্রথম সংগীত বিদ্যালয়। নতুন কোনো গান শুনলেই সেটি গলায় তোলার চেষ্টা করতেন। তখনো তিনি জানতেন না, একদিন তাঁর নিজের কণ্ঠই কোটি মানুষের জীবনের অংশ হয়ে উঠবে।
স্কুলজীবনেই ঘটে এক নাটকীয় ঘটনা, যা পরবর্তীকালে তাঁর ব্যক্তিত্বের পরিচায়ক হয়ে ওঠে। একদিন ক্লাসে বন্ধুদের সঙ্গে গান গাওয়ার অপরাধে তাঁকে স্কুল থেকে বহিষ্কার করা হয়। খবর শুনে সহপাঠীরা প্রতিবাদে ফেটে পড়ে। আর্থিকভাবে সচ্ছল না হওয়া সত্ত্বেও তাঁর বাবা শিক্ষকদের কাছে গিয়ে ছেলের জন্য অনুরোধ করেন। শেষ পর্যন্ত বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করা হয়।
ঘটনাটি হেমন্তের জীবনে শুধু একটি বিব্রতকর স্মৃতি নয়; বরং তাঁর চরিত্র গঠনেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। অপমান, প্রত্যাখ্যান কিংবা অবহেলার মুখে তিনি কখনো তিক্ত হননি। বরং বাবার বিনয়, ধৈর্য ও সহনশীলতা তাঁকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। পরবর্তী জীবনে বহু বাধা, ব্যর্থতা ও অবমূল্যায়নের মুখোমুখি হলেও তিনি কখনো উচ্চকণ্ঠ হননি। নীরবে নিজের কাজ করে গেছেন। সেই নীরব অধ্যবসায়ই একসময় তাঁকে বাংলা গানের ইতিহাসের সবচেয়ে উজ্জ্বল নক্ষত্রদের একজন করে তোলে।
তাঁর গায়কির বড় শক্তি ছিল এই সহজাত আন্তরিকতা। কোনো জটিল কারুকাজ নয়, কোনো প্রদর্শন নয়—শুধু গভীর মমতায় বলা কিছু কথা, যা শ্রোতার হৃদয়ে গিয়ে পৌঁছে।
সুভাষের হাত ধরে রেডিওতে
হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সংগীতজীবনের শুরুর গল্পে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রগুলোর একজন তাঁর স্কুলজীবনের বন্ধু সুভাষ মুখোপাধ্যায়। পরবর্তী সময়ে যিনি বাংলা সাহিত্যের অন্যতম কবি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন, সেই সুভাষই প্রথম বিশ্বাস করেছিলেন হেমন্তের অসাধারণ কণ্ঠের শক্তিতে। স্কুলের অনুষ্ঠানে গান গাওয়ার সুযোগ না পেয়ে যখন হেমন্ত কিছুটা হতাশ, তখন সুভাষই তাঁকে বলেছিলেন, ‘স্কুলে না গাইলে কী হয়েছে, চল রেডিওতে অডিশন দিই।’
সেই উৎসাহেই ১৯৩৫ সালে তৎকালীন ব্রডকাস্টিং করপোরেশন, পরে যার নাম হয় অল ইন্ডিয়া রেডিও, সেখানে অডিশন দেন হেমন্ত। অডিশনে তিনি গেয়েছিলেন জনপ্রিয় শিল্পী সন্তোষ সেনগুপ্তের গান ‘আজও পড়ে গো মনে’। বিচারকদের নজর কাড়তে সময় লাগেনি। নির্বাচিত হন তরুণ হেমন্ত। কিন্তু সামনে ছিল আরেক বাধা—পরিবার। বিশেষ করে বাবা চাইতেন ছেলে মনোযোগ দিক পড়াশোনায়, গানকে পেশা হিসেবে নেওয়ার ব্যাপারে তাঁর আপত্তি ছিল।
অবশেষে মা, বন্ধু ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের চেষ্টায় বাবার সম্মতি মেলে। রেডিওতে গাওয়ার জন্য নতুন গান দরকার। সেই সময় সুভাষ মুখোপাধ্যায় নিজেই লিখে দেন ‘আমার গানেতে এলে নবরূপে চিরন্তনী’। আরেকটি গান ছিল একটি ভাটিয়ালি। রেডিওতে গান প্রচারের পর সংগীতাঙ্গনে প্রথমবারের মতো পরিচিত হতে শুরু করেন হেমন্ত।
তবে সাফল্যের পথ তখনো সহজ ছিল না। রেডিওতে গান প্রচারিত হলেও রেকর্ড কোম্পানিগুলোর দরজা তাঁর জন্য সহজে খোলেনি। বন্ধু সুভাষকে সঙ্গে নিয়ে একের পর এক কোম্পানির দ্বারে ঘুরেছেন তিনি। সেনোলা, পাইওনিয়ার, মেগাফোন, এইচএমভি—কেউই তেমন আগ্রহ দেখায়নি। প্রত্যাখ্যানের সেই দিনগুলোতে তিনি সাহিত্যচর্চাও চালিয়ে যান, লিখতে থাকেন গল্প।
তিনি রবীন্দ্রসংগীতের প্রচলিত কাঠামো ভাঙেননি; বরং নিজের সহজ, সংযত ও আবেগঘন গায়কির মাধ্যমে গানগুলোকে সাধারণ মানুষের জীবনের আরও কাছাকাছি নিয়ে এসেছিলেন।
এর মধ্যেই জীবনে আসে বড় মোড়। বাবার বন্ধু শান্তি বসুর উদ্যোগে পরিচয় হয় খ্যাতিমান সুরকার শৈলেশ দত্তগুপ্তের সঙ্গে। তাঁর সামনে গান গাওয়ার সুযোগ পান হেমন্ত। কণ্ঠ শুনেই মুগ্ধ হন শৈলেশ। কয়েক দিনের মধ্যেই দুটি গান রেকর্ড করার ব্যবস্থা করে দেন তিনি।
১৯৩৭ সালে প্রকাশিত হয় হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের প্রথম গ্রামোফোন রেকর্ড। নরেশ্বর ভট্টাচার্যের কথায় ও শৈলেশ দত্তগুপ্তের সুরে গান দুটি ছিল ‘জানিতে যদি গো তুমি’ এবং ‘বলো গো বলো মোরে’। তখনো তিনি ছিলেন সংগ্রামী এক তরুণ শিল্পী, যার সামনে অনিশ্চয়তা ছিল বেশি, নিশ্চয়তা কম। কিন্তু সেই রেকর্ডই হয়ে ওঠে এক দীর্ঘ সংগীতযাত্রার ভিত্তিপ্রস্তর। কেউ তখন কল্পনাও করেনি, এই তরুণ একদিন বাংলা গান, বাংলা চলচ্চিত্র এবং উপমহাদেশের সংগীত ইতিহাসে এক অনন্য অধ্যায়ের নাম হয়ে উঠবেন।
‘ছোট পঙ্কজ’ থেকে সময়ের কণ্ঠস্বর
সংগীতজীবনের শুরুর দিকে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়কে অনেকেই ডাকতেন ‘ছোট পঙ্কজ’ নামে। কারণ, তাঁর গায়কিতে স্পষ্ট ছিল কিংবদন্তি শিল্পী পঙ্কজ মল্লিকের প্রভাব। সে সময় পঙ্কজ মল্লিক ছিলেন বাংলা গানের আকাশের সবচেয়ে উজ্জ্বল নক্ষত্রদের একজন। তরুণ হেমন্তও তাঁর গান শুনে মুগ্ধ হতেন, অনুসরণ করতেন গাওয়ার ভঙ্গি। কিন্তু দীর্ঘদিন অনুকরণে আটকে থাকেননি। ধীরে ধীরে নিজের স্বর, উচ্চারণ, আবেগ প্রকাশের ধরন এবং গায়কির ভঙ্গি গড়ে তুললেন তিনি। সেই কণ্ঠে ছিল গভীরতা, সংযম, মায়া আর একধরনের সহজাত আন্তরিকতা, যা শ্রোতাকে অনায়াসে নিজের জগতে টেনে নিত।
চল্লিশের দশকের মাঝামাঝি সময়েই তিনি বুঝিয়ে দেন, তিনি কারও অনুসারী হয়ে থাকার জন্য আসেননি। ১৯৪৪ সালে নিজের সুরে প্রকাশ করেন ‘কথা কয়ো নাকো, শুধু শোনো’ এবং ‘আমার বিরহ আকাশে প্রিয়া’—দুটি গান। বিশেষ করে ‘কথা কয়ো নাকো, শুধু শোনো’ বাংলা আধুনিক গানের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে। উচ্চারণের ভঙ্গি, কথাকে সুরের মধ্যে মিশিয়ে দেওয়ার কৌশল এবং আবেগ প্রকাশের সংযত ধরন বাংলা গানের শ্রোতাদের কাছে একেবারেই নতুন ছিল। পরবর্তী সময়ে যে হেমন্তীয় গায়কি বাংলা গানের স্বতন্ত্র ধারায় পরিণত হয়, তার প্রথম স্পষ্ট প্রকাশ দেখা যায় এই গানেই।
ঠিক এই সময়েই তাঁর জীবনে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সূচনা হয়। ইন্ডিয়ান পিপলস থিয়েটার অ্যাসোসিয়েশনের (আইপিটিএ) মাধ্যমে পরিচয় ঘটে তরুণ গীতিকার ও সুরকার সলিল চৌধুরীর সঙ্গে। বাংলা গানের ইতিহাসে এই দুই মানুষের মিলন ছিল এক যুগান্তকারী ঘটনা। একজনের কণ্ঠ আর অন্যজনের সুর ও চিন্তা মিলে তৈরি করে নতুন এক সংগীতভাষা।
চল্লিশের দশকের শেষ দিকে সলিল চৌধুরীর লেখা ও সুরে প্রকাশিত হয় ‘কোনো এক গাঁয়ের বধূর কথা’। দুর্ভিক্ষপীড়িত বাংলার প্রেক্ষাপটে নির্মিত প্রায় ছয় মিনিটের এই গান বাংলা গানের প্রচলিত রীতিনীতিকে চ্যালেঞ্জ জানায়। প্রেম কিংবা প্রকৃতির বদলে এখানে উঠে আসে গ্রামীণ জীবনের সংগ্রাম, ক্ষুধা, বেদনা ও ইতিহাসের নির্মম বাস্তবতা। গানের কাঠামো, ছন্দের বৈচিত্র্য এবং আখ্যানধর্মী উপস্থাপনা সে সময়ের বাংলা গানে ছিল প্রায় অভূতপূর্ব। ‘গাঁয়ের বধূ’ শুধু জনপ্রিয় হয়নি, বাংলা আধুনিক গান যে সামাজিক বাস্তবতা ও সময়ের ইতিহাসকেও ধারণ করতে পারে, সেই ধারণাকে প্রতিষ্ঠা করেছিল।
পর্দায় উত্তমকুমারের ব্যক্তিত্ব ছিল মার্জিত, রোমান্টিক ও আকর্ষণীয়। আর হেমন্তের কণ্ঠে ছিল একধরনের উষ্ণতা, কোমলতা ও বিষণ্ন সৌন্দর্য। এই দুই সত্তা মিলেই তৈরি হয়েছিল বাংলা সিনেমার এক অনন্য রোমান্টিক নায়ক-ইমেজ।
এরপর একের পর এক সৃষ্টি। ‘রানার’, ‘অবাক পৃথিবী’, ‘পাল্কীর গান’, ‘ঘুম ভাঙার গান’—সলিল চৌধুরীর সুরে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠ হয়ে উঠল সময়ের দলিল। ‘রানার’-এর ক্লান্ত অথচ অবিরাম ছুটে চলা ডাকহরকরা, ‘অবাক পৃথিবী’-র হতাশা কিংবা ‘পাল্কীর গান’-এর মানবিক আবেগ—সবকিছুতেই ধরা পড়েছে এক বদলে যাওয়া সমাজের প্রতিচ্ছবি।
এই সময়ে হেমন্ত আর শুধু জনপ্রিয় গায়ক নন। তিনি হয়ে উঠেছেন একটি সময়ের কণ্ঠস্বর। তাঁর গানে প্রেম আছে, কিন্তু তার সঙ্গে আছে মানুষের জীবনসংগ্রাম, সমাজবাস্তবতা এবং ইতিহাসের দীর্ঘশ্বাসও। বাংলা গানের ইতিহাসে খুব কম শিল্পীই এমনভাবে ব্যক্তিগত অনুভূতি ও সামষ্টিক অভিজ্ঞতাকে এক সুতোয় গেঁথে দিতে পেরেছেন।
উত্তমকুমারের কণ্ঠ হয়ে ওঠা
বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে অভিনেতা ও প্লেব্যাক শিল্পীর যত সফল জুটি রয়েছে, তার মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং প্রভাবশালী জুটিগুলোর একটি নিঃসন্দেহে উত্তমকুমার ও হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। পঞ্চাশের দশকের মাঝামাঝি সময়ে শুরু হওয়া এই যাত্রা শুধু কয়েকটি জনপ্রিয় গানের জন্ম দেয়নি; বরং বাংলা সিনেমার রোমান্টিক নায়কের একটি স্থায়ী শ্রুতিময় পরিচয়ও নির্মাণ করেছিল।
১৯৫৫ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘শাপমোচন’ ছবিকে অনেকেই এই জুটির স্বর্ণযাত্রার সূচনা বলে মনে করেন। ছবিতে উত্তমকুমারের পর্দার উপস্থিতির সঙ্গে হেমন্তের মায়াময়, গভীর ও আবেগঘন কণ্ঠ এমনভাবে মিশে গিয়েছিল যে দর্শকদের কাছে দুজনকে আলাদা করে ভাবা কঠিন হয়ে পড়ে। এরপর ‘হারানো সুর’, ‘সপ্তপদী’, ‘মায়ামৃগ’, ‘দুই ভাই’, ‘ইন্দ্রাণী’, ‘জীবন তৃষ্ণা’, ‘হাত বাড়ালেই বন্ধু’সহ অসংখ্য ছবিতে উত্তমের ঠোঁটে শোনা গেছে হেমন্তের কণ্ঠ।
পর্দায় উত্তমকুমারের ব্যক্তিত্ব ছিল মার্জিত, রোমান্টিক ও আকর্ষণীয়। আর হেমন্তের কণ্ঠে ছিল একধরনের উষ্ণতা, কোমলতা ও বিষণ্ন সৌন্দর্য। এই দুই সত্তা মিলেই তৈরি হয়েছিল বাংলা সিনেমার এক অনন্য রোমান্টিক নায়ক-ইমেজ। ‘তুমি যে আমার’, ‘এই পথ যদি না শেষ হয়’, ‘নীড় ছোট ক্ষতি নেই’, ‘হাত বাড়ালেই বন্ধু’, ‘মায়ামৃগ’ ছবির গান কিংবা ‘হারানো সুর’-এর সুরেলা মুহূর্তগুলো আজও আলোচনার বিষয়।
একসময় এমন অবস্থা তৈরি হয়েছিল যে বহু দর্শকের কাছে উত্তমকুমারের কণ্ঠস্বর মানেই ছিল হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠ। পর্দায় উত্তমকে দেখলে দর্শক স্বাভাবিকভাবেই হেমন্তের গান শুনতে চাইতেন। বাংলা চলচ্চিত্রে একজন অভিনেতা ও একজন গায়কের মধ্যে এত গভীর আত্মিক সংযোগ খুব কমই দেখা গেছে। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন কারণে এই জুটির মধ্যে দূরত্ব তৈরি হলেও তাঁদের একসঙ্গে সৃষ্টি করা কাজ বাংলা চলচ্চিত্র ও সংগীতের ইতিহাসে চিরস্থায়ী হয়ে আছে।
বাংলা জনপ্রিয় সংস্কৃতির ইতিহাসে উত্তমকুমার ও হেমন্ত মুখোপাধ্যায় শুধু একটি সফল জুটি নন, তাঁরা একটি যুগের প্রতীক। একজন ছিলেন বাঙালির স্বপ্নের নায়ক, অন্যজন সেই স্বপ্নের কণ্ঠস্বর।
মুম্বাই জয় ও হলিউডে বাংলা গান
১৯৫১ সালে পরিচালক হেমেন গুপ্তের আহ্বানে মুম্বাই যান হেমন্ত। সুর করেন ‘আনন্দমঠ’ ছবির সংগীত । এরপর হিন্দি চলচ্চিত্রেও তাঁর উত্থান শুরু হয়। ‘ইয়ে রাত ইয়ে চাঁদনী ফির কাহাঁ’, ‘হ্যায় আপনা দিল তো আওয়ারা’, ‘না তুম হামে জানো’, ‘চুপ হ্যায় ধরতি’—এসব গান তাঁকে সর্বভারতীয় জনপ্রিয়তা এনে দেয়। সুরকার হিসেবেও তিনি ছিলেন সমান সফল। ‘নাগিন’ ছবির সংগীতের জন্য অর্জন করেন ফিল্মফেয়ার পুরস্কার।
হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের জীবনের গৌরবময় অর্জনগুলোর একটি আসে ১৯৭২ সালে। হলিউডের ইংরেজি ভাষার চলচ্চিত্র ‘সিদ্ধার্থ’-এ ব্যবহৃত হয় তাঁর গাওয়া বাংলা গান ‘ও নদী রে’ ও ‘পথের ক্লান্তি ভুলে’। শুধু তা–ই নয়, কনরাড রুকস পরিচালিত ছবিটির আংশিক সংগীত পরিচালনাও করেছিলেন তিনি। এর মধ্য দিয়ে শশী কাপুর, সিমি গ্রেওয়াল অভিনীত আন্তর্জাতিক মূলধারার একটি ইংরেজি ছবিতে বাংলা গান পৌঁছে যায় বিশ্বদর্শকের কাছে। ‘ভাষা না বুঝেও’ বিদেশি দর্শক মুগ্ধ হয়েছিল তাঁর কণ্ঠে। সংগীতের ভাষা যে সর্বজনীন, তার উজ্জ্বল প্রমাণ হয়ে আছে সেই ঘটনা।
রবীন্দ্রনাথকে আপন করে তোলার কণ্ঠ
রবীন্দ্রসংগীতের নিজস্ব ঐতিহ্য ও পরম্পরা রয়েছে। সেই ধারাকে সমৃদ্ধ করেছেন বহু কিংবদন্তি শিল্পী। তবে অনেক সংগীত সমালোচকের মতে, বৃহত্তর মধ্যবিত্ত শ্রোতাদের কাছে রবীন্দ্রনাথকে সহজ ও গ্রহণযোগ্য করে তোলার ক্ষেত্রে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের ভূমিকাও ছিল বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
তিনি রবীন্দ্রসংগীতের প্রচলিত কাঠামো ভাঙেননি; বরং নিজের সহজ, সংযত ও আবেগঘন গায়কির মাধ্যমে গানগুলোকে সাধারণ মানুষের জীবনের আরও কাছাকাছি নিয়ে এসেছিলেন।
তাঁর কণ্ঠে ‘আমার আর হবে না দেরি’, ‘কেন পান্থ এ চঞ্চলতা’, ‘আমার এই পথ চাওয়াতেই আনন্দ’, ‘পথের শেষ কোথায়’ কিংবা ‘পুরানো সেই দিনের কথা’ শুধু সংগীতপ্রেমীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; পৌঁছে গেছে পাড়ার জলসা, মধ্যবিত্তের ড্রয়িংরুম, রেডিওর অনুষ্ঠান এবং দৈনন্দিন জীবনের নানা মুহূর্তে। এ কারণেই অনেকের কাছে হেমন্তের কণ্ঠে রবীন্দ্রনাথ হয়ে উঠেছেন আরও আপন, আরও অন্তরঙ্গ। তাঁর গাওয়া রবীন্দ্রসংগীতের জনপ্রিয়তা প্রমাণ করে, গভীর শিল্পমান বজায় রেখেও কীভাবে একটি গান বৃহত্তর শ্রোতাসমাজের হৃদয়ে জায়গা করে নিতে পারে।
আজও সমকালীন
দ্বিমত নেই মান্না দে অসাধারণ শিল্পী, কিশোর কুমার ছিলেন বিস্ময়কর প্রতিভা। মোহাম্মদ রাফি, মুকেশ কিংবা তালাত মাহমুদও নিজ নিজ জায়গায় কিংবদন্তি। এর বাইরে বাংলা গানের শ্রোতার কাছে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের অবস্থান আলাদা। কারণ, তাঁর কণ্ঠে বাঙালি শুধু গান শোনে না, নিজের জীবনকেই খুঁজে পায়। ভাদ্রের গুমোট দুপুর, পৌষের কুয়াশা, ফাল্গুনের হাওয়া কিংবা শ্রাবণের টুপটাপ বৃষ্টি—প্রতিটি ঋতুর জন্য যেন তাঁর আলাদা গান আছে। প্রেমের জন্য আছে, বিচ্ছেদের জন্য আছে, অপেক্ষার জন্য আছে, স্মৃতির জন্য আছে। আছে নিঃসঙ্গ মানুষের দীর্ঘশ্বাস, আবার আছে জীবনের প্রতি গভীর মমতাও। তাঁর কণ্ঠে রবীন্দ্রনাথ যেমন আপন হয়ে ওঠেন, তেমনি আধুনিক গান পায় নতুন ভাষা। সলিল চৌধুরীর গণমুখী গান থেকে শুরু করে উত্তমকুমারের রোমান্টিক পর্দা-ব্যক্তিত্ব—সবকিছুর মধ্যেই তিনি রেখে গেছেন নিজের অনন্য ছাপ। এই কারণেই হেমন্ত মুখোপাধ্যায় বাঙালির সাংস্কৃতিক স্মৃতির অংশ, আবেগের অংশ, জীবনযাপনের অংশ। ১৯৮৯ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর তিনি পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন, এখনো তাঁর গান প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে পাড়ি দিচ্ছে।
সূত্র: হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের আত্মজীবনী, আনন্দবাজার,ইটিভি ভারত,প্রহর।