আশা ভোসলে ও লতা মঙ্গেশকর। এএফপি ফাইল ছবি
আশা ভোসলে ও লতা মঙ্গেশকর। এএফপি ফাইল ছবি

লতার ছায়া থেকে বেরিয়ে যেভাবে নিজের পরিচয় তৈরি করেছিলেন আশা

লতা মঙ্গেশকর ও আশা ভোসলে ভারতের সংগীত দুনিয়ায় সমীহ জাগানিয়া নাম। কাকতালীয়ভাবে দুই বোনই প্রয়াত হয়েছেন ৯২ বছর বয়সে। ক্যারিয়ারের পরের দিকে বৈচিত্র্যময় গানে পাওয়া গেছে আশাকে, নিজের আলাদা পরিচয় তৈরি করতে পেরেছেন তিনি। কিন্তু ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে কাজটা তত সহজ ছিল না, বড় বোনের আড়ালে ঢাকা পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা ছিল। সেখান থেকে বেরিয়ে কীভাবে নিজের পরিচয় তৈরি করলেন আশা?

শুরু থেকেই আশার পরিচয় ছিল এক কঠিন তুলনার ভেতর দিয়ে। বড় বোন লতা মঙ্গেশকর তখন প্রতিষ্ঠিত—নিখুঁত কণ্ঠের প্রতীক। সেই আলোয় ঢাকা পড়ে যাওয়ার ভয় ছিল ছোট বোন আশার মনে। তিনি নিজেই পরে স্বীকার করেছিলেন, একটা সময় তিনি মনে করতেন, তিনি হয়তো কখনোই দিদির ছায়া থেকে বেরোতে পারবেন না।
কিন্তু এখানেই আলাদা হয়ে ওঠেন আশা ভোসলে। প্রতিযোগিতা ছিল, কিন্তু তা ছিল নিঃশব্দ। প্রকাশ্যে কখনোই দ্বন্দ্ব নয়, বরং নিজের ভেতরেই লড়াই। সেই লড়াইয়ের ফল—নিজের গানের ধরন পাল্টে ফেলা। যেখানে লতার কণ্ঠ ছিল ক্লাসিক্যাল আর মেলোডির নিখুঁত উদাহরণ, সেখানে আশা বেছে নিলেন ভিন্ন পথ—পশ্চিমা ধাঁচ, ক্যাবারে, পপ, জ্যাজ, এমনকি ‘বোল্ড’ গানেও নিজের স্বাক্ষর রাখলেন।

এ পরিবর্তন ছিল সচেতন। আশা বুঝেছিলেন, একই পথে হাঁটলে তিনি চিরকাল তুলনার শিকার হবেন। তাই নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করা ছাড়া তাঁর সামনে আর কোনো পথ খোলা ছিল না। আর সেখানেই তৈরি হয় এক আলাদা পরিচয়, যেখানে তিনি শুধু ‘লতার বোন’ নন, বরং নিজস্ব এক অনন্য কণ্ঠস্বর।

এ যাত্রা অবশ্য সহজ ছিল না। ব্যক্তিগত জীবনের টানাপোড়েন, অল্প বয়সে বিয়ে, সংসারের চাপ—সবকিছু সামলে এগোতে হয়েছে আশাকে। তবু তিনি থেমে থাকেননি। বরং প্রতিটি আঘাত তাঁকে আরও শক্ত করেছে।

সময় গড়িয়েছে, সেই সঙ্গে বদলেছে আশার কণ্ঠের রং। রোমান্টিক গান থেকে শুরু করে নাচের গান, গজল থেকে পপ—সবকিছুতেই তিনি সমান স্বচ্ছন্দ। এই বহুমুখিতাই তাঁকে আলাদা করে দেয়। তিনি শুধু গান গাইতেন না, প্রতিটি গানে চরিত্র তৈরি করতেন, যা শ্রোতার মনে দীর্ঘদিন ধরে থেকে যায়।

আশা ভোসলে ১৯৮০ সালে বিয়ে করেন আর ডি বর্মনকে

অনেক সময় আশাকে ভুল করেও অন্য কারও সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা হতো, বিশেষ করে ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে। কিন্তু সে ভুলও একদিন শক্তিতে পরিণত হয়। তিনি নিজের স্বর, উচ্চারণ, স্টাইল—সবকিছু এমনভাবে বদলে নেন, যা তাঁকে সম্পূর্ণ আলাদা করে দেয়।

আশা ভোসলের কণ্ঠে যেমন ছিল দুষ্টুমি, তেমনই ছিল গভীরতা। যেমন ছিল আবেদন, তেমনই ছিল ব্যথা। এই বহুমাত্রিকতাই তাঁকে ভারতীয় সংগীতের অন্যতম বহুমুখী শিল্পীতে পরিণত করেছে।

দীননাথ মঙ্গেশকরের পাঁচ সন্তানের মধ্যে সবচেয়ে বড় লতার ওপর ভাইবোন আর সংসারের দায়িত্ব এসে পড়েছিল অপরিণত বয়সেই। বাবার চলে যাওয়া একঝটকায় বড় করে দিয়েছিল তাঁকে, পেশাদারভাবে ছবিতে অভিনয়-গানের শুরুও সেখান থেকেই। ‘দুনিয়াদারি’র সঙ্গে ছোট বয়স থেকেই পরিচয় হয়ে গিয়েছিল বলেই বোধ হয় ভাইবোনদের ব্যাপারে একটু বেশিই রক্ষণশীল ছিলেন লতা। সে কারণেই হয়তো মেনে নিতে পারেননি বোন আশার মাত্র ষোলো বছর বয়সে বিয়ের সিদ্ধান্ত। বস্তুত, আশার সে সিদ্ধান্তই নাকি তাঁর সঙ্গে সাময়িক দূরত্ব তৈরি করেছিল মঙ্গেশকর পরিবারের। তাঁর প্রিয় লতা দিদিরও। যদিও ছোটবেলায় তিনিই দিদির ‘প্রিয়’ বোন ছিলেন।

নাসরিন মুন্নি কবীরের সাক্ষাৎকারভিত্তিক বই ‘লতা মঙ্গেশকর: ইন হার ওউন ভয়েস’-এ আশা লিখেছেন, ‘ছোটবেলায় ভাইবোনদের মধ্যে আমিই ছিলাম দিদির সবচেয়ে কাছের। আমাকে কোলে নিয়ে ছুটে বেড়াত সারাক্ষণ।’ ‘সেকেন্ড বেস্ট’ তকমা নিয়েও দিদিকে শিল্পী হিসেবে কোন জায়গায় রাখতেন আশা, তারও আভাস মেলে এ বইয়ে।
তবে অভিমানের চোরা স্রোত কি একেবারেই ছিল না? শোনা যায়, ‘অ্যায় মেরে ওয়তন কে লোগো’ প্রথমে গাওয়ার কথা ছিল আশা ভোসলের। সুরকার সি রামচন্দ্রের সঙ্গে রিহার্সালও দিয়েছিলেন আশা। অন্যদিকে, গীতিকার কবি প্রদীপ গানটি তাঁকে দিতে চাননি। লতার কাছে প্রস্তাব যাওয়ার পরে একসঙ্গে মহড়াও দেন দুই বোন। শেষ পর্যন্ত দিল্লিতে প্রজাতন্ত্র দিবসের অনুষ্ঠানে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী-রাষ্ট্রপতির উপস্থিতিতে গেয়েছিলেন লতাই।

হিন্দি প্লেব্যাকে সুরাইয়া-শমশাদ–পরবর্তী সময়ে যেমন ‘পাতলি আওয়াজ’ নিয়েও জায়গা তৈরি করে নিচ্ছিলেন লতা, অন্যদিকে স্বকীয়তায় গীতা দত্তের শূন্যস্থান পূরণ করছিলেন আশা। ও পি নাইয়ার, আর ডি বর্মনের হাত ধরে বৈচিত্র্যের যে নিজস্ব ‘ঘরানা’ তৈরি করলেন আশা, তা নিয়ে গর্বিত ছিলেন তাঁর দিদি। পরবর্তীকালে প্রকাশ্যে স্বীকার করতেন, আশার মতো সব ধরনের গান তিনি গাননি। যশ চোপড়া একবার বলেছিলেন, ‘‘আমার ছেলের (আদিত্য চোপড়া) প্রথম ছবি “দিলওয়ালে দুলহনিয়া লে জায়েঙ্গে”র জন্য লতাজির কাছেই প্রথমে যাই। তিনি বলেছিলেন, “জারা সা ঝুম লু ম্যায়” ভালো গাইবেন আশা।’ ‘গান কেড়ে নেওয়া’র বিপরীতে এমন উদাহরণও ছিল। আর সে কারণেই তাঁদের নামের পাশে ‘প্রথম’ বা ‘দ্বিতীয়’র র‍্যাঙ্কিং চলে না। সে কারণেই হয়তো তাঁরা কিংবদন্তি।

হিন্দুস্তান টাইমস, টাইমস অব ইন্ডিয়া ও আনন্দবাজার পত্রিকা অবলম্বনে