ভক্তদের চমকে দিয়ে প্লেব্যাক থেকে অবসরের ঘোষণা দিয়েছেন অরিজিৎ সিং। অনেক বিশ্লেষক বলছেন, অরিজিতের প্লেব্যাক থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্তকে অবসর নয়; বরং একধরনের ‘প্রতিরোধ’ হিসেবে দেখা যেতে পারে। ভেঙে পড়া, আনুগত্যনির্ভর এক ব্যবস্থাকে প্রত্যাখ্যান করে এই গায়ক যেন শিল্পের স্বীকৃতির বদলে নিজের স্বাধীনতাকেই বেছে নিয়েছেন।
গত মঙ্গলবার গায়ক ও সুরকার অরিজিৎ সিং ঘোষণা দেন, তিনি প্লেব্যাক গান থেকে সরে দাঁড়াচ্ছেন। তাঁর এই বক্তব্য মুহূর্তের মধ্যেই ভাইরাল হয়ে যায়। তবে তিনি পরিষ্কার করে বলেন, তিনি সংগীত নয়, প্লেব্যাক ইন্ডাস্ট্রি ছাড়ছেন। আর এই পার্থক্যটিতেই লুকিয়ে আছে আসল শক্তির জায়গা।
৩৮ বছর বয়সী অরিজিৎ সিংয়ের ক্যারিয়ারে বিভিন্ন ভাষায় রেকর্ড করা গানের সংখ্যা ৭০০ ছাড়িয়েছে বলে জানা যায়। তাঁর সংগীতজীবনের শুরু হয়েছিল এক রিয়েলিটি শো দিয়ে, যেখানে তিনি জয়ীও হননি। এরপর টানা আট বছর লেগে যায় প্রথম বড় সাফল্য পেতে। ২০১৩ সালে ‘আশিকি ২’ সিনেমার ‘তুম হি হো’ গান তাঁকে এনে দেয় খ্যাতি। তারপর যা ঘটেছে, তা ইতিহাস। তবে এবার সেই ইতিহাস যেন ইচ্ছাকৃতভাবে, সচেতনভাবে এবং নির্দ্বিধায় এক নতুন মোড়ে এসে থেমেছে।
তাই যখন অরিজিৎ জানান, তিনি প্লেব্যাক গান থেকে সরে দাঁড়াচ্ছেন, তখন প্রশ্ন ওঠে, এটা কি অবসর, নাকি এক শক্তিশালী সিদ্ধান্ত? এটা কি ক্লান্তি, নাকি এমন এক বিরল স্পষ্টতা, যেখানে একজন শিল্পী বুঝে যান, কবে এমন এক ব্যবস্থার বাইরে বেরিয়ে যেতে হয়, যা নীরবতা, আনুগত্য আর নীরব সহ্যশক্তির ওপর দাঁড়িয়ে থাকে?
প্লেব্যাক থেকে সরে দাঁড়িয়ে অরিজিৎ যেন এমন এক ইন্ডাস্ট্রিকে প্রত্যাখ্যান করেছেন, যেখানে প্রতিভার পাশাপাশি সবচেয়ে বেশি মূল্য পায় আনুগত্য। তিনি এমন এক কাঠামো থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছেন, যা আর তাঁর মূল্যবোধের সঙ্গে মেলে না। আর যাঁরা চার্ট-টপার গানের বাইরেও অরিজিৎকে অনুসরণ করেছেন, তাঁরা এই মূল্যবোধের কথা ভালোই জানেন।
তিনি বরাবরই ভীষণ ব্যক্তিগত জীবন যাপন করেন। নেই আগ্রাসী প্রচারণা। নেই সাজানো হাইপ। নেই কৃত্রিম প্রাসঙ্গিকতার চেষ্টা। তাঁর কাজই কথা বলে, ছড়িয়ে পড়ে, মানুষের হৃদয়ে পৌঁছে যায়; তারপর তিনি যেন হঠাৎই আড়ালে চলে যান। ধরাছোঁয়ার বাইরে। ধাওয়া, প্যাকেজিং বা বাহারি উপস্থাপনার জন্য অনুপস্থিত।
অরিজিৎ কখনোই ইন্ডাস্ট্রির লিখে দেওয়া নিয়ম মেনে চলেননি। তিনি নিজের গান বিক্রি করেন না, তাঁর গানই নিজেকে বিক্রি করে। কনসার্টে তিনি সরাসরি দর্শকের সঙ্গে কথা বলেন, পিআর-নিয়ন্ত্রিত নেটওয়ার্ক বা ইভেন্টের মাধ্যমে নয়। পুরস্কারের মৌসুমের রাজনীতি কিংবা গসিপনির্ভর বিতর্ক থেকেও তিনি দূরে থাকেন। আসলে কাজের বাইরে তাঁকে নিয়ে সবচেয়ে আলোচনার জন্ম হয়েছিল তখনই, যখন তিনি প্রকাশ্যে এক সুপারস্টারের বিরুদ্ধে কথা বলেছিলেন, একটি সিনেমায় রেকর্ড করা তাঁর গান ব্যবহার না করার ঘটনায়।
সেই ঘটনাতেও অরিজিৎ নিজের পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন। নাটক তৈরি করার জন্য নয়; বরং আত্মসম্মানের জায়গা থেকে। সেটি ছিল শোষণ, গেট কিপিং আর নীরবভাবে মুছে দেওয়ার সংস্কৃতিকে স্বাভাবিক বলে মেনে না নেওয়ার এক স্পষ্ট বার্তা। রোমান্টিক গানের জন্য পরিচিত এই শিল্পী আজ যেন আরও বেশি মনোযোগী নিজের মানসিক সুস্থতা ও সৃজনশীল স্বাধীনতা রক্ষায়, বিষাক্ত এক কাঠামোর ভেতরে থাকার চেয়ে। আর ইন্ডাস্ট্রির জন্য সবচেয়ে অস্বস্তিকর সত্যটা হলো—কেউই তাঁকে ব্যর্থ হিসেবে দেখছে না।
যে ইন্ডাস্ট্রিতে শিল্পীদের কাছ থেকে দীর্ঘমেয়াদি ক্যারিয়ারের বিনিময়ে অপমান সহ্য করার প্রত্যাশা করা হয়, সেই ইন্ডাস্ট্রি নেওয়ার চেয়ে দেয় অনেক কম। আজ অরিজিৎ যে জায়গায় দাঁড়িয়ে, সেখানে তিনি যেন বলছেন এক র্যাডিক্যাল কথা, তিনি এই ব্যবস্থাকে ঠিক করতে চান না। নেই কোনো ‘সংস্কারক’ হওয়ার আকাঙ্ক্ষা। নেই শহীদ হওয়ার বাসনা। নেই নায়কোচিত গল্প। তিনি কেবল এই চাকরিটাই প্রত্যাখ্যান করছেন। এক নির্লিপ্ত অথচ দৃঢ় বার্তা—এই ব্যবস্থার বাইরে থাকাই তাঁর জন্য ভালো।
এতে দোষই-বা কে দিতে পারে? ইন্ডাস্ট্রি মোটেই সুখকর জায়গা নয়। কী করা উচিত, তা বড় বিতর্কের বিষয়। তবে হয়তো প্রথম ধাপ হলো এটা স্বীকার করা, যখন আর কারও অনুমতির প্রয়োজন হয় না নিজের অস্তিত্বের জন্য, তখন চলে যাওয়া ঠিকই আছে। কেন একজন শিল্পী নিজের কাঠামো নিজে তৈরি করতে পারবেন না? কেন পচে যাওয়া এক ব্যবস্থাকে বারবার মেরামত করবেন, যখন নতুন কিছু গড়া যায়, আরও গণতান্ত্রিক, আরও চিন্তাশীল, আর সত্যিকার অর্থেই মৌলিক?
অরিজিৎ এখনো ঘোষণা দেননি, সামনে কী করবেন। তবে তাঁর সেটার প্রয়োজনও নেই। তাঁর ভক্তদের উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ নেই। তিনি সংগীত সৃষ্টি বন্ধ করছেন না। তিনি কেবল এটুকু বলছেন, নিজের সৃষ্টিকে আর অন্যের খেয়ালের ছাঁচে ঢালতে দেবেন না। তাঁর কণ্ঠ থাকবে, যত দিন তিনি চান, আর যত দিন ভক্তরা তাঁর মূল্য দেন।
ইন্ডিয়া টুডে অবলম্বনে