গিটারের ঝংকার, চেনা গানে সম্মিলিত কণ্ঠ আর মুহুর্মুহু হর্ষধ্বনি—শনিবার সন্ধ্যায় সিডনির হিলসং কনভেনশন সেন্টার যেন হয়ে উঠেছিল দুই বাংলার রকপ্রেমীদের মিলনমেলা। নগরবাউল জেমস ও কলকাতার ফসিলস ব্যান্ডের রূপম ইসলামকে একই মঞ্চে দেখতে সেখানে জড়ো হয়েছিলেন দুই হাজারের বেশি দর্শক। দুই শিল্পীর পরিবেশনায় সন্ধ্যা থেকে রাত পর্যন্ত উচ্ছ্বাসে মেতেছিলেন প্রবাসী বাঙালিরা।
মিলনায়তনের বাইরে তখন দর্শকদের দীর্ঘ সারি। তাই নির্ধারিত সময় সন্ধ্যা ছয়টার বদলে আয়োজন শুরু হয় সাড়ে ছয়টার দিকে। রাত সাতটার কিছু আগে মঞ্চে আসেন রূপম ইসলাম। ‘হাসনুহানা’, ‘একলা ঘর’, ‘অ্যাসিড’সহ প্রায় ১৫টি গান পরিবেশন করেন তিনি। সোয়া এক ঘণ্টার প্রাণবন্ত পরিবেশনায় শুরু থেকেই দর্শকদের মাতিয়ে রাখেন রূপম। তাঁর সঙ্গে গলা মেলানোর পাশাপাশি করতালি ও হর্ষধ্বনিতে সাড়া দেন দর্শকেরা।
রূপম ইসলামের পরিবেশনা শেষ হওয়ার পর অপেক্ষা ছিল জেমসের। সংক্ষিপ্ত বিরতি পেরিয়ে রাত পৌনে নয়টার দিকে আলো-আঁধারির মঞ্চে দেখা দেন নগরবাউল। তাঁকে দেখামাত্র হর্ষধ্বনি ও করতালিতে ফেটে পড়ে পুরো মিলনায়তন। জেমসও শ্রোতাদের অপেক্ষা দীর্ঘ করেননি; স্বভাবসুলভ অল্প কথায় সরাসরি ডুব দেন গানে। ‘দুষ্টু ছেলের দল’, ‘মীরাবাঈ’, ‘তারায় তারায়’, ‘সুন্দরীতমা’ থেকে হিন্দি গান ‘ভিগি ভিগি’—একের পর এক জনপ্রিয় গানে সুর মেলায় দুই হাজারের বেশি কণ্ঠ। মঞ্চের জেমস আর দর্শকসারির শ্রোতারা তখন যেন এক অভিন্ন গানের দল।
উচ্ছ্বাসে ভরা মিলনায়তনের আবহ হঠাৎই বদলে যায় জেমসের কণ্ঠে প্রিন্স মাহমুদের কথা ও সুরে ‘মা’ গানটি শুরু হতেই। কিছুক্ষণ আগেও যাঁরা গানের তালে মেতে ছিলেন, মুহূর্তেই যেন নীরব হয়ে যান তাঁরা। আবেগঘন গানটির প্রতিটি পঙ্ক্তি গভীর মনোযোগে শোনেন দর্শকেরা; অনেকের চোখেমুখেও ফুটে ওঠে আবেগ।
অপেক্ষা ছিল জেমসের আরেক জনপ্রিয় গান ‘বাবা’র জন্যও। দর্শকসারি থেকে অনেকে গানটি গাওয়ার অনুরোধ করেন। তবে এদিন সেটি জেমসের পরিবেশনার তালিকায় ছিল না। সেই অপূর্ণতা ছাপিয়ে রাত সাড়ে ১০টা পর্যন্ত একের পর এক গান আর মঞ্চজুড়ে উপস্থিতিতে দর্শকদের মুগ্ধ করে রাখেন জেমস। করতালি ও শ্রোতাদের সম্মিলিত কণ্ঠে শেষ হয় নগরবাউলের পরিবেশনা।
গানের পাশাপাশি আয়োজনজুড়ে ছিল উৎসবের আবহ। মিলনায়তনের উন্নত শব্দব্যবস্থা ও আলোকসজ্জা পরিবেশনাগুলোকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলে। বাইরে দেশীয় খাবারের স্টল ঘিরে জমে ওঠে প্রবাসী বাঙালিদের আড্ডা। কনসার্টের এক পর্যায়ে বেঙ্গলি সিনে ক্লাবের পক্ষ থেকে সহযোগী ও পৃষ্ঠপোষকদের মঞ্চে ডেকে কৃতজ্ঞতা জানানো হয়। জেমসও তাঁদের স্বাগত জানান। কনসার্ট শেষে দর্শকদের কথায়ও উঠে আসে সেই মুগ্ধতা। সিডনির বাসিন্দা তালাত মাহমুদ বলেন, ‘সিডনিতে দীর্ঘদিন পর এমন গোছানো আয়োজন দেখলাম। রূপমের পারফরম্যান্স আর গুরু জেমসের গান—প্রবাসী বাঙালিদের জন্য রাতটা সত্যি মনে রাখার মতো।’
অনিতা বিশ্বাসের ভালো লেগেছে দর্শকদের সম্মিলিত অংশগ্রহণ। তিনি বলেন, ‘জেমস যখন “তারায় তারায়” আর “ভিগি ভিগি” গাইছিলেন, মনে হচ্ছিল পুরো হল এক হয়ে গেছে। প্রবাসে বসে এমন অনুভূতি পাওয়া সত্যিই বিরল।’ আয়োজন নিয়ে একই রকম উচ্ছ্বাসের কথা জানান আরেক দর্শক কামরুল হাসান।
দর্শকদের এই উচ্ছ্বাসের পেছনে ছিল দুই রক তারকাকে আবার এক মঞ্চে দেখার দীর্ঘ প্রতীক্ষা। এর আগে ২০২৪ সালে ভারতের একটি কনসার্টে একসঙ্গে গান করেছিলেন জেমস ও রূপম। এবার সিডনিতে তাঁদের সাক্ষাতের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর কনসার্টটি ঘিরে আগ্রহ আরও বেড়ে যায়। শনিবার রাতে দুই বাংলার দুই তারকার পরিবেশনায় অবশেষে পূর্ণতা পায় প্রবাসী সংগীতপ্রেমীদের সেই অপেক্ষা।