মঞ্চে উঠলেই তিনি ‘গুরু’। গিটার হাতে দাঁড়ালে হাজারো মানুষ একসঙ্গে গেয়ে ওঠে তাঁর গান। ‘সিনায় সিনায় লাগে টান’ থেকে ‘তারায় তারায় রটিয়ে দেব’—তাঁর গানের সঙ্গে একাধিক প্রজন্মের বেড়ে ওঠা। অথচ মঞ্চের আলো নিভে গেলে সেই জেমসই যেন হঠাৎ অদৃশ্য হয়ে যান। কোথায় থাকেন, কী করেন, কীভাবে কাটান সময়—এসব নিয়ে কৌতূহল থাকলেও ব্যক্তিজীবন নিয়ে বরাবরই আড়ালে থেকেছেন তিনি।
এই আড়ালই হয়তো জেমসকে আরও রহস্যময় করে রেখেছে। সংগীতশিল্পী হিসেবে তাঁকে চেনেন প্রায় সবাই, কিন্তু ব্যক্তি ফারুক মাহফুজ আনামকে চেনেন কতজন? জন্মদিনে সেই মানুষটির কাছেই ফিরে দেখা যাক, যিনি একসময় নওগাঁর নদীতে সাঁতার কাটতে গিয়ে মাঝনদীতে চলে যেতেন, চট্টগ্রামের আজিজ বোর্ডিংয়ের ছোট্ট ঘরে গিটার নিয়ে রাত কাটাতেন, আর এখনো অবসরে বই পড়েন, ছবি তোলেন কিংবা নির্জন কোনো জায়গায় হারিয়ে যেতে চান।
দুরন্ত সেই ছেলেটি
নিজের শৈশবের কথা বলতে গিয়ে জেমস নিজেই বলেছেন, ‘আমি ছিলাম এক্সট্রোভার্ট (বহির্মুখী), ভীষণ দুরন্তপনা করেছি ছেলেবেলায়।’ সেই দুরন্তপনার অন্যতম সঙ্গী ছিল পানি।
ছোটবেলা থেকেই সাঁতারের প্রতি ছিল তাঁর প্রবল ঝোঁক। নওগাঁয় ১০ থেকে ১২ বছর বয়সে বন্ধুদের সঙ্গে নদীতে সাঁতার কাটতে যেতেন। কখনো কখনো সাঁতরে মাঝনদীতেও চলে যেতেন। এখন আর নদীতে সাঁতার কাটার সেই সুযোগ নেই। তবে নদী যেন রয়ে গেছে তাঁর গানের ভেতর। ‘তুমি যদি নদী হও, আমি হব জেগে থাকা চর’–এর মতো গানে সেই টান স্পষ্ট।
যে ঘর থেকে শুরু
বাবা মোজাম্মেল হক, চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান ছিলেন। বাবার সরকারি চাকরির সুবাদে জেমসের পড়াশোনা হয়েছে সিলেট, রাজশাহীসহ বিভিন্ন জায়গায়। সিলেটের ব্লু-বার্ড স্কুল দিয়ে শুরু, এরপর রাজশাহী কলেজিয়েট স্কুল। কলেজজীবনের একটি অংশ কেটেছে নীলফামারী ও সিরাজগঞ্জে।
কলেজজীবনের পরই গানের প্রতি টান বাড়তে থাকে। একসময় এটিই হয়ে যায় তাঁর একমাত্র আগ্রহের জায়গা। কিন্তু পরিবারের কেউ সংগীতের সঙ্গে যুক্ত না থাকায় মা–বাবা বড় ছেলে জেমসকে গানের পেশায় দেখতে চাননি। একসময় অভিমান করে ঘর ছাড়েন তিনি। সেই পথচলারই একটি গুরুত্বপূর্ণ ঠিকানা হয়ে ওঠে চট্টগ্রামের কদমতলীর পাঠানটুলি রোডের আজিজ বোর্ডিং।
৩৬ নম্বর রুমটি ছিল জেমসের আশ্রয়। আড্ডা, গান আর স্বপ্ন—সবকিছুর সাক্ষী সেই ছোট্ট ঘর। তাঁর মতে, ‘আড্ডা আর গান যা-ই হোক না কেন, সব ওখানেই। আজিজ বোর্ডিংয়ের দিনগুলো কখনো ভুলব না।’
সেই স্মৃতি পরে উঠে এসেছে ‘আজিজ বোর্ডিং’ গানেও। ছোট্ট একটি ঘর, ছোট্ট একটি খাট, একটি টেবিল, পানির জগ আর প্রিয় গিটার—এই ছিল জেমসের তখনকার পৃথিবী। তারকা হওয়ার পর আর সেখানে যাওয়া হয়নি। তবে রুমটির বর্তমান বাসিন্দারা এখনো জেমসের জন্মদিনে কেক কাটেন। সময়-সুযোগ হলে সেখানে আবার যাওয়ার ইচ্ছার কথাও জানিয়েছেন তিনি।
যাঁদের আর পাওয়া যাবে না
গানের জগতে জেমসের উত্থান যখন শুরু, তখনই জীবনের সবচেয়ে কাছের দুজন মানুষ—মা ও বাবা—চলে গেছেন। মা জাহানারা খাতুনকে নিয়ে তাঁর গানেও আছে গভীর আবেগ। ‘সবাই বলে ওই আকাশে লুকিয়ে আছে, খুঁজে দেখো, পাবে দূর নক্ষত্র মাঝে’—মাকে স্মরণ করে লেখা সেই গান আজও শ্রোতাদের কাছে পরিচিত।
ছোট ভাই রুশো এখন নওগাঁয় পারিবারিক ব্যবসা দেখাশোনা করেন। নিজের সংসার নিয়েও অবশ্য বরাবরই নীরব জেমস। চার সন্তানের বাবা তিনি—বড় ছেলে দানিশ, এরপর দুই মেয়ে জান্নাত, জাহান, জিবরান আনাম। ব্যক্তিজীবন আড়ালে রাখার কারণও স্পষ্ট করে বলেছেন, ‘আমার গানের জীবনের বাইরে ব্যক্তিজীবনটা প্রকাশিত হোক, সেটা কখনো চাইনি।’
অবসরে অন্য জেমস
মঞ্চের ব্যস্ততার বাইরে জেমসের অবসর খুব সাধারণ। টেলিভিশন দেখেন, বই পড়েন। তবে আরেকটি নেশা কয়েক বছর ধরে তাঁকে বেশ টানছে—ফটোগ্রাফি। বিদেশে স্টেজ শো করতে গেলে হাতে পাওয়া অবসর সময় কাজে লাগাতেই ক্যামেরা হাতে নেন তিনি। ধীরে ধীরে সেটি নেশায় পরিণত হয়েছে। ল্যান্ডস্কেপ তাঁর বেশি পছন্দ।
কক্সবাজারের বিভিন্ন দৃশ্যও ক্যামেরাবন্দী করেছেন। কখনো আবার মডেলদের ছবি তুলেছেন। তাঁর ভাষায়, ‘ফটোগ্রাফারমাত্রই জানে, এটা অদ্ভুত একটা নেশা। একবার ফটোগ্রাফির পোকা ঢুকলে মাথা থেকে বের করা মুশকিল।’
তবে বাংলাদেশে ছবি তুলতে গেলেই তৈরি হয় অন্য সমস্যা। তাঁকে দেখে ভক্তরা জড়ো হয়ে যান। অথচ ভালো ছবি তুলতে হলে আলোকচিত্রীকে থাকতে হয় সবার আড়ালে। তাই পিরোজপুরের ভাসমান পেয়ারা বাজারের ছবি তোলার ইচ্ছা থাকলেও কীভাবে সেটি করবেন, তা নিয়ে ভাবতে হচ্ছে তাঁকে। ভবিষ্যতে নিজের তোলা ছবি নিয়ে প্রদর্শনী করার ইচ্ছাও আছে।
সম্প্রতি ইতালি ও অস্ট্রেলিয়া সফরেও ক্যামেরা ছিল তাঁর সঙ্গী। স্টেজ শোর ফাঁকে ঘুরেছেন, ছবি তুলেছেন, সেই মুহূর্তগুলো ভাগ করে নিয়েছেন সামাজিক মাধ্যমে।
বন্ধুত্বে পুরোনো ঠিকানা
জেমসের বন্ধুদের তালিকায় যেমন স্কুল-কলেজের পুরোনো বন্ধুরা আছেন, তেমনি সংগীতজগতের সহযোদ্ধারাও আছেন। স্কুলের বন্ধু ইমতিয়াজ থাকেন কানাডার টরন্টোতে, মিমি ঢাকার একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরি করছেন। নীলফামারী কলেজের বন্ধু ওয়াজেদ চিকিৎসক, থাকেন অস্ট্রেলিয়ায়।
ব্যস্ততার কারণে নিয়মিত যোগাযোগ না হলেও দুই-তিন বছর পরপর হঠাৎ দেখা হয়ে যায় অনেকের সঙ্গে।
সংগীতজগতের বন্ধুত্বের গল্পটা আরও দীর্ঘ। আইয়ুব বাচ্চু, হামিন আহমেদ, মাকসুদ ও পার্থ বড়ুয়া—তাঁদের সঙ্গে সম্পর্কের শিকড় সেই শুরুর দিনগুলোতে। একই সময়ে পথচলা, প্রতিকূলতার মুখোমুখি হওয়া, একসঙ্গে পরিকল্পনা করা—সবকিছু মিলিয়েই তৈরি হয়েছে এই বন্ধুত্ব। এখনো ব্যান্ড মিউজিকের কোনো বিষয়, বিশেষ করে বামবা নিয়ে আলোচনা হলে তাঁরা একসঙ্গে বসেন, আড্ডা দেন।
গানের বাইরে বই-সিনেমা
অবসরে সিনেমাও দেখেন জেমস। বিশেষ পছন্দ ক্ল্যাসিক সিনেমা। সাহিত্যে তাঁর পছন্দের লেখকদের তালিকায় সবার ওপরে গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ। পছন্দ করেন নাগিব মাহফুজকেও। খাবারের তালিকায় অবশ্য একেবারেই দেশি স্বাদ—ভাত, ডাল, গরুর মাংস, আইড় মাছ, পাবদাসহ নানা ধরনের মাছ। দেশের বাইরে কোরিয়ান ও জাপানি খাবারও পছন্দ। তবে রান্নাঘরে জেমসকে পাওয়া কঠিন; রান্না করতে পারেন না বললেই চলে। ফিটনেস নিয়েও সচেতন তিনি। নিয়মিত জিমে যান, সাধারণ ব্যায়াম করেন। আর ঘোরাঘুরির তালিকায় বাংলাদেশের পর সবচেয়ে প্রিয় শহর কলকাতা, নিউইয়র্ক ও জুরিখ।
লক্ষ্য নয়, আনন্দই পথ
এত দীর্ঘ সংগীতজীবনেও নিজের জন্য কোনো নির্দিষ্ট লক্ষ্য ঠিক করেননি জেমস। তাঁর দর্শন খুব সরল—যে কাজ করতে ভালো লাগে, সেটাই করবেন। ‘প্রতিটা দিনই আমি আমার মতো করে উপভোগ করি’—বলেছেন তিনি। ‘কোনো লক্ষ্য ঠিক করে সামনে চলি না। আমি যে কাজটা করে আনন্দ পাই, সে কাজটা করি। আমার যদি আগ্রহ না থাকে, সে কাজ আমি কখনোই করি না।’
গানের ক্ষেত্রেও একই কথা। গান করতে এসে বড় কোনো লক্ষ্য স্থির করেননি। গান করাটাই তাঁর আনন্দ, তাঁর প্যাশন। সাফল্য এসেছে, জনপ্রিয়তা এসেছে, দেশ-বিদেশে অগণিত মানুষ তাঁকে ‘গুরু’ বলে ডাকছে—কিন্তু জেমসের কাছে হিসাবটা এখনো সহজ, ‘কিছু না হলেও গানই করতাম।’
নির্জনতায় ফেরার ইচ্ছা
মঞ্চে জেমস যতটা মানুষের, মঞ্চের বাইরে ততটাই নিজের। একা থাকতে ভালোবাসেন। কারণ, নীরবতায় নিজের মতো করে ভাবা যায়, কোনো একটি বিষয়ে মনোযোগ দেওয়া যায়। বাড়তি আড্ডার প্রয়োজনও বোধ করেন না। তবে গানের জন্য তিনি সব সময়ই প্রস্তুত—দেশে কিংবা দেশের বাইরে।
ভবিষ্যতের স্বপ্নের কথাও তাই শহুরে কোলাহল থেকে একটু দূরে। ঢাকা থেকে গাড়িতে দুই-তিন ঘণ্টার দূরত্বে কোনো নির্জন জায়গায় বসত গড়ার কথা ভাবেন জেমস। কাজের প্রয়োজনে ঢাকায় আসবেন, কাজ শেষ করে আবার ফিরে যাবেন নিজের সেই নির্জনতায়।
আজ জেমসের জন্মদিন। বাংলাদেশের সংগীতের এই মহাতারকা ১৯৬৪ সালের ২ অক্টোবর নওগাঁয় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পুরো নাম ফারুক মাহফুজ আনাম। কয়েক দশকের সংগীতজীবনে অসংখ্য গান দিয়ে শ্রোতাদের আনন্দ দিয়েছেন, তৈরি করেছেন নিজস্ব এক জগৎ। সেই জগতের দরজা সবার জন্য পুরোপুরি খোলা নয়। তাই হয়তো মঞ্চের জেমসকে সবাই চেনে, কিন্তু মঞ্চের বাইরের মানুষটিকে জানার আগ্রহ কখনো ফুরোয় না।