
বিভিন্ন ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে দেশের ৯ বিশিষ্ট ব্যক্তি ও ১টি প্রতিষ্ঠানকে ২০২৬ সালের একুশে পদকের জন্য মনোনীত করেছে সরকার। প্রতিষ্ঠান হিসেবে তালিকায় আছে দেশের রক ব্যান্ড ‘ওয়ারফেজ’। চলতি মাসেই তুলে দেওয়া হবে পদক। এর আগে ব্যান্ডটির সাবেক ও বর্তমান সদস্যরা হয়েছিলেন একসঙ্গে। কেউ এসেছেন কানাডা, কেউবা যুক্তরাষ্ট্র থেকে। সবার উদ্দেশ্য দিনটিকে স্মরণীয় করে রাখা।ব্যান্ডের শুরুটা ১৯৮৪ সালে। সে বছর স্কুলপড়ুয়া কয়েকজন কিশোরের হাত ধরে যাত্রা করে এই ব্যান্ড। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে হয়ে উঠেছে দেশের রক সংগীতের এক অনিবার্য অধ্যায়। দীর্ঘ চার দশকের সংগীতযাত্রায় তারা শুধু গানই তৈরি করেনি, তৈরি করেছে কয়েক প্রজন্মের অনুভব, প্রতিবাদ আর ভালোবাসার ভাষা। চার দশকের ওপরে বাংলা সংগীতে অবদান রাখায় প্রথম ব্যান্ড হিসেবে একুশে পদক পাচ্ছে ‘ওয়ারফেজ’।
ঢাকায় ফেরা
একুশে পদক গ্রহণ করতে কানাডা থেকে এসেছেন সঞ্জয় কামরান রহমান, যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাবনা করিম ও মাসুক রহমান আর চীন থেকে এসেছেন অনি হাসান। আরও কয়েকজন সাবেক সদস্যের আসার পরিকল্পনা থাকলেও শেষ মুহূর্তে আসতে পারেননি। বর্তমান লাইনআপের সঙ্গে দেশে অবস্থান করা কয়েকজন সাবেক সদস্যও একুশের পদক অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকবেন। ব্যান্ডের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ও গিটারিস্ট ইব্রাহিম আহমেদ কমল প্রথম আলোকে বলেন, ‘ওয়ারফেজ শুধু একটা ব্যান্ড নয়; এটি একটি পরিবার। একুশে পদকের তালিকা যেদিন ঘোষণা করা হলো, সেদিনই পরিকল্পনা ছিল সবাই মিলে এটা গ্রহণ করার। তবে সবকিছু এত দ্রুত হয়ে যাবে, ওরা এত দ্রুত চলে আসবে, তা কল্পনায়ও ছিল না। সবকিছু এত দ্রুত ও সহজে হয়ে গেল, স্বপ্ন স্বপ্ন লাগছে।’
তবে এর মাঝে যাঁরা আসতে পারেননি, তাঁদের জন্যও খারাপ লাগছে সবার। ব্যান্ডটির সহপ্রতিষ্ঠাতা, দলনেতা ও ড্রামার শেখ মনিরুল আলম বলেন, ‘আমাদের অরিজিনাল লাইনআপের মাঝে শুধু রাসেল আলী আসতে পারেনি। এ ছাড়া যারা আসতে পারেনি, তাদের জন্য খারাপ লাগছে। জানি তারাও অনেক কষ্ট পাচ্ছে। সবাই একসঙ্গে থাকতে পারলে বেশি ভালো লাগত।’
নস্টালজিয়ায় ভরা এক সন্ধ্যা
গত শুক্রবার দেশ ও বিদেশ থেকে আসা সব সদস্য ও তাঁদের পরিবার নিয়ে পুনর্মিলনীর আয়োজন করে ‘ওয়ারফেজ’। রাজধানীর বনানীর একটি ভেন্যুতে আয়োজন করা হয় ইফতার ও রাতের খাবারের। একসঙ্গে সময় কাটায় সব সদস্যের পরিবার। এর সঙ্গে ব্যান্ডটির অতিথি সদস্য, ইন্ডাস্ট্রির সুহৃদরাও হাজির ছিলেন এ অনুষ্ঠানে। অনেক অজানা গল্পের সঙ্গে সে সময়ের স্মৃতিচারণা করেন সবাই। মনিরুল আলম প্রথম আলোকে বলেন, ‘এটা সম্পূর্ণ আমাদের ঘরোয়া আয়োজন ছিল। যেহেতু রমজান মাস চলছে, সবাই একসঙ্গে দোয়া ও ইফতার করলাম। এরপর সেই পুরোনো গল্প। ব্যান্ডের বাইরেও ফুয়াদ নাসের বাবু ভাই, লুৎফুল আহমেদ লাবু ভাই, মানাম আহমেদ ছিলেন। আমাদের সবার পরিবার ছিল। সবাই খুব নস্টালজিক ফিল করেছি। খুব আনন্দ হয়েছে।’
আবার ফিরে যাই ১৯৮৪-তে
১৯৮৪ সালে কমল (বেজ), মীর (গিটার), নাঈমুল (গিটার), হেলাল (ড্রামস) ও বাপ্পি (ভোকাল)—এই পাঁচ কিশোর মিলে ঢাকা শহরে গড়ে তোলে ‘ওয়ারফেজ’। বাংলাদেশ প্রবেশ করল রক সংগীতের ধারায়। পরে কমল ছাড়া অন্য কেউ দলের সঙ্গে ছিলেন না। একাধিকবার বিরতি নিয়ে কমল এখনো দলের সঙ্গে আছেন। একুশে পদক ঘোষণা পর কমল যেন ফিরে গেলেন সেই সময়ে।
কমলের স্মৃতিচারণায় উঠে এল ওয়ারফেজের শুরুর কথা। বললেন, ‘তখন সবাই সেন্ট যোসেফ স্কুলের ছাত্র ছিলাম। ইনস্ট্রুমেন্ট কেনার পর আমরা একটি ব্যান্ড গঠন করি। ১৯৮৪ সালের ৬ জুন। ৮৯ লেকসার্কাস কলাবাগান ঠিকানায় যাত্রা শুরু করে ওয়ারফেজ। একুশে পদকের খবরের পর যেন সেদিনের স্মৃতিতে ফিরে গিয়েছিলাম।’ তিন দশকের বেশি সময়ের পথচলায় বারবার ভাঙাগড়ার মধ্যে এগিয়ে যায় ওয়ারফেজ। এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম ছিলেন একজন, তিনি শেখ মুনিরুল আলম টিপু। শুরুর দিকেই দলে যোগ দেন তিনি। ওয়ারফেজের সবচেয়ে খারাপ সময়গুলোয় একজন আদর্শ দলনেতার মতো হাল ধরে রেখেছিলেন ব্যান্ডের। একের পর এক লাইনআপে পরিবর্তন এলেও তিনি দৃঢ়প্রত্যয়ী ছিলেন। তিনি বলেন, ‘দেখতে দেখতে যেন চার দশক কেটে গেল। এ অর্জন শুধু ওয়ারফেজের একার নয়, এ অর্জন পুরো ব্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির ও বাংলা ব্যান্ড সংগীতের সব অনুরাগীর।’