‘প্রজাপতি বিস্কুট’ সিনেমার ‘তোমাকে বুঝি না প্রিয়’ গানটি গেয়ে পরিচিতি পেয়েছেন চন্দ্রাণী ব্যানার্জি
‘প্রজাপতি বিস্কুট’ সিনেমার ‘তোমাকে বুঝি না প্রিয়’ গানটি গেয়ে পরিচিতি পেয়েছেন চন্দ্রাণী ব্যানার্জি

‘তোমাকে বুঝি না প্রিয়’ গায়িকাকে কতটা চেনেন

‘তোমাকে বুঝি না প্রিয়’ গানটি শুনেছেন? ‘প্রজাপতি বিস্কুট’ ছবির এই গান অনেকেরই পছন্দের। কিন্তু এই গানের শিল্পী চন্দ্রাণী ব্যানার্জিকে কতটা চেনেন? তাঁর কণ্ঠে শুধু এই একটি গান নয়, আছে আরও অনেক পরিচিত গান। মহীনের ঘোড়াগুলির ‘ঘরে ফেরার গান’, ভূমির ‘কান্দে শুধু মন’, ক্রসউইন্ডসের ‘ঝিকো ঝিকো করি রে’—তালিকাটা বেশ দীর্ঘ।

প্রায় তিন দশকের সংগীতজীবনে গেয়েছেন নানা ধরনের গান। নব্বইয়ের দশকের বাংলা ব্যান্ড ক্রসউইন্ডসের প্রধান গায়িকা চন্দ্রাণী ব্যানার্জি। বাংলা ব্যান্ডে প্রথম নারী রক গায়িকা হিসেবেও পরিচিত তিনি।

অথচ আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে খুব একটা দেখা যায় না তাঁকে। তাতে অবশ্য আক্ষেপ নেই শিল্পীর; বরং নিজের গান লেখা, সুর করা আর নিয়মিত সংগীতচর্চাতেই মনোযোগ তাঁর।

চন্দ্রাণী ব্যানার্জি

গানের শুরু রবীন্দ্রনাথ-নজরুলে

চন্দ্রাণী ব্যানার্জির গানের হাতেখড়ি ছোটবেলায়। বাড়িতেই শুরু হয় রবীন্দ্রসংগীত, নজরুলগীতি ও লোকগীতির চর্চা। রবীন্দ্রসংগীত ও নজরুলগীতি শিখেছেন দেবদাস মণ্ডলের কাছে। আর লোকগান শিখেছেন বড় মামার কাছে।

তবে পরবর্তী সময়ে চন্দ্রাণীর সংগীতজীবনে পাশ্চাত্য সংগীতেরও বড় প্রভাব পড়ে। কলকাতায় ইংরেজি অনার্স পড়তে এসে ওয়েস্টার্ন মিউজিকের প্রতিযোগিতায় গান গাইতেন। বাবা তাঁকে দ্য বিটলসের ‘অ্যাবে রোড’ অ্যালবামের ক্যাসেট এনে দিয়েছিলেন। এরপর ব্লুজ, জ্যাজ, কান্ট্রি মিউজিক থেকে গজল; বিভিন্ন ধরনের গান শুনেছেন তিনি।

চন্দ্রাণী ব্যানার্জি

১৯৯৫ সালে নিজের লেখা ও সুর করা ‘দ্য মিন্সট্রেল’ প্রকাশ করেন চন্দ্রাণী। গানটি শুনে প্রশংসা করেছিলেন মহীনের ঘোড়াগুলির গৌতম চট্টোপাধ্যায়। এরপরই আসে ‘ঘরে ফেরার গান’ গাওয়ার সুযোগ।

চন্দ্রাণী ব্যানার্জির ভাষায়, ‘আমি বাংলা গানে হয়তো আসতামই না। বাংলা গানে নিয়ে আসার পুরো কৃতিত্বটাই গৌতমদার।’

গৌতম চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে মঞ্চে

মহীনের ঘোড়াগুলির সঙ্গে শুধু গানই নয়, মঞ্চও ভাগ করেছেন চন্দ্রাণী। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রেসিডেন্সি কলেজে গৌতম চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে অনুষ্ঠান করেছেন তিনি। সে সময় ক্রসউইন্ডস ছিল মহীনের ব্যাকিং ব্যান্ড।

‘ঘরে ফেরার গান’-এর পাশাপাশি ‘রাবেয়া কি রুকসানা’, ‘এলো কী অসময়’সহ বিভিন্ন গান গাইতে বলতেন গৌতম। সেই অভিজ্ঞতাকে নিজের সৌভাগ্য মনে করেন চন্দ্রাণী।
তাই আজও গান লেখা বা সুর করার সময় চন্দ্রাণীর মনে প্রশ্ন জাগে, গৌতম চট্টোপাধ্যায়ের ভালো লাগত কি না।

চন্দ্রাণী ব্যানার্জি

নারী রক গায়িকা হিসেবে পথচলা

চন্দ্রাণী যখন ব্যান্ডে গান শুরু করেন, তখন নারীপ্রধান গায়িকার ধারণাটিই খুব পরিচিত ছিল না। শুরুতে শ্রোতারা অবাক হতেন, একজন নারী ব্যান্ডের প্রধান গায়িকা!
তবে সময়ের সঙ্গে সেই বিস্ময় কেটে যায়; বরং শ্রোতাদের ভালোবাসাই হয়ে ওঠে চন্দ্রাণীর পথচলার বড় শক্তি। ক্রসউইন্ডসের পাশাপাশি মহীনের ঘোড়াগুলি ও ভূমির সঙ্গেও গান করেছেন তিনি।

গজলও চন্দ্রাণীর পছন্দের ঘরানা। একবার গজল গেয়ে প্রথম পুরস্কার পাওয়ার পরের দিনই ওয়েস্টার্ন মিউজিকের প্রতিযোগিতাতেও প্রথম হন। জগজিৎ সিংয়ের গজল গাইতেন প্রধানত। গজলের স্মৃতিমেদুরতা তাঁকে টানে।

তবে কোনো নির্দিষ্ট ঘরানায় নিজেকে আটকে রাখতে চান না। চন্দ্রাণী ব্যানার্জির কাছে মূল কথা হলো—যে গানই গাইবেন, যতটা সম্ভব ত্রুটিহীনভাবে গাইতে হবে।

চন্দ্রাণী ব্যানার্জি

ক্রসউইন্ডসে এলেন ১৯৯৯ সালে

১৯৯০ সালে সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজের কয়েকজন ছাত্র মিলে ক্রসউইন্ডস তৈরি করেন। ব্যান্ডটির প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন বিক্রমজিৎ ব্যানার্জি। শুরুতে এটি ছিল মূলত রক ব্যান্ড।

চন্দ্রাণী তখনো কলকাতায় আসেননি। ১৯৯৯ সালে ব্যান্ডের দুই সদস্য চেন্নাই চলে গেলে নতুন ভোকালিস্টের প্রয়োজন হয়। বিক্রমজিৎ গৌতম চট্টোপাধ্যায়ের কাছে ভোকালিস্ট খুঁজতে যান। গৌতমই চন্দ্রাণীর কথা বলেন।

সেই বছরই ক্রসউইন্ডসে যোগ দেন চন্দ্রাণী। তাঁর যোগদানের পর ব্যান্ডটির গানে রকের সঙ্গে লোকসংগীতের মিশেল আরও স্পষ্ট হয়। চন্দ্রাণীর নিজের ভাষায়, তাঁর শিকড় লোকগানে। ক্রসউইন্ডসের এই স্বতন্ত্র ধারাকে তাঁরা বলেন ‘ওয়ার্ল্ড রক’।
ব্যান্ডের গান লেখা ও সুর করার কাজেও বড় ভূমিকা চন্দ্রাণীর। ফলে তাঁর ভাষ্যও ক্রসউইন্ডসের সংগীতে আলাদা মাত্রা যোগ করেছে।

‘তোমাকে বুঝি না প্রিয়’কেন এত পরিচিত?

সিনেমায় খুব বেশি গান করেননি চন্দ্রাণী। কিন্তু যে কটি গান করেছেন, তার অনেকগুলোই শ্রোতাদের মনে জায়গা করে নিয়েছে। এর মধ্যে অনিন্দ্য চট্টোপাধ্যায়ের ‘প্রজাপতি বিস্কুট’ ছবির ‘তোমাকে বুঝি না প্রিয়’ অন্যতম।

চন্দ্রাণীর দাবি, গানটির জন্য তিনি তিনটি গুরুত্বপূর্ণ পুরস্কারও পেয়েছেন। তাঁর কাছে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ; কারণ, পুরস্কারের চেয়েও শ্রোতার ভালোবাসাকে বড় করে দেখেন তিনি।

সিনেমায় নিয়মিত গান না গাওয়ার জন্য অবশ্য কোনো আক্ষেপ নেই। নিজের গান লেখা, সুর করা ও ব্যান্ডের সঙ্গে কাজ করতেই বেশি ব্যস্ত থাকতে চান চন্দ্রাণী।

‘ঝিকো ঝিকো’এখনো গাওয়া হয়

ক্রসউইন্ডসের ‘ঝিকো ঝিকো করি রে’ চন্দ্রাণী ব্যানার্জির আরেক পরিচিত গান। এত বছর পরও বিভিন্ন কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের উৎসবে এই গান বাজলে তরুণ শ্রোতাদের নাচতে দেখা যায়। কনসার্টেও গানটির আবদার আসে নিয়মিত।

চন্দ্রাণী বলেন, ‘সেই কবে ঝিকো ঝিকো গেয়েছি, এখনকার বাচ্চারাও এই গানটা লাইভ শোনার জন্য উদ্‌গ্রীব হয়ে থাকে।’

তবে চন্দ্রাণীর কাছে শ্রোতাদের ভালোবাসার অর্থ আরও বড়। ‘শ্রোতাদের ভালোবাসাই একজন শিল্পীর সম্পদ,’ বলেছেন তিনি।

তিন দশক পরও নিরন্তর গান

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও নেদারল্যান্ডসেও ক্রসউইন্ডসের সঙ্গে অনুষ্ঠান করেছেন চন্দ্রাণী। বিদেশের মঞ্চেও বাংলা গানের অনুরোধ পেয়েছেন নিয়মিত।

বাংলা গানকে আন্তর্জাতিক করে তুলতে আলাদা করে কিছু করার প্রয়োজন আছে বলেও মনে করেন না চন্দ্রাণী। তাঁর মতে, বাংলা গান এমনিতেই আন্তর্জাতিক।
তিন দশকের পথচলায় সংবাদমাধ্যমের শিরোনামে নিয়মিত না থাকলেও তাতে চন্দ্রাণীর আক্ষেপ নেই। নিজের কাজ নিয়েই থাকতে চান। গান লেখা, সুর করা, গাওয়া—এই চর্চাই তাঁর কাছে মুখ্য।

বঙ্গদর্শন অবলম্বনে