বিটিএসের সদস্যরা। ছবি : বিগহিট মিউজিক
বিটিএসের সদস্যরা। ছবি : বিগহিট মিউজিক

ফিরেই কোন জাদুতে বাজিমাত করল বিটিএস

দীর্ঘ বিরতির পর ফিরেই কীভাবে আবার আগের জনপ্রিয়তা ফিরে পেল বিটিএস? উত্তরটা হলো, রোমাঞ্চকর নতুন অ্যালবামের মাধ্যমে নিজেদের শিকড়ে ফিরে গিয়ে। রোলিং স্টোন সাময়িকী তাদের চলতি মে সংখ্যায় মোট আটটি ভিন্ন ভিন্ন প্রিন্ট কভারের একটি প্যাকেজ প্রকাশ করেছে। একটি গ্রুপ কভার ও সাতটি একক কভার। গ্রুপ কভারটিতে রয়েছে বিটিএসের সাক্ষাৎকার ও ছবি। সাতটি একক কভার সাজানো হয়েছে বিটিএসের সাত সদস্যের প্রত্যেকের আলাদা আলাদা সাক্ষাৎকার এবং ছবি দিয়ে। আজকে থাকছে পত্রিকাটির গ্রুপ কভারে প্রকাশিত বিটিএসের সাক্ষাৎকার।

আরএম কখনো কখনো  নিজের অস্তিত্ব নিয়ে গভীর চিন্তায় ডুবে যান। এমনটি প্রায়ই ঘটে। তখন তিনি কখনো রেইনার মারিয়া রিলকের লেখা, আবার কখনো টাইলার, দ্য ক্রিয়েটরের গানের লিরিক মনে করেন। বিটিএসের এই ‘লিডার’ কবি রিলকে খুব পছন্দ করেন। তিনি প্রায়ই তাঁর ১৯০৫ সালের কবিতা ‘গো টু দ্য লিমিটস অব ইওর লংগিং’-এর একটি বহুল উদ্ধৃত অংশ বারবার মনে করেন, ‘জীবনে যা-ই ঘটুক না কেন, কোনো অনুভূতিই চিরস্থায়ী নয়।’

বাধ্যতামূলক সামরিক জীবনের ১৮ মাসই আরএমের কেটেছে অনিদ্রায়। মাথার চুলগুলো ছিল ছোট ছোট করে কাটা। ঠান্ডা আর্মি বাঙ্কে শুয়ে যখন কিছুতেই ঘুম আসত না তখন তিনি শুনতেন ডন টলিভার, প্লেবয় কার্টি, ডিজন-এর প্রথম অ্যালবাম। আরও শুনতেন জজির গান ‘পাস্ট ওন্ট লিভ মাই বেড’। কখনো কখনো  গানের কথা তাঁর মাথায় এত বেশি চিন্তা জাগাত যে তা সামলানো কঠিন হয়ে যেত। তখন তিনি ক্ল্যাসিক্যাল বা অ্যাম্বিয়েন্ট মিউজিক শুনতেন।

সামরিক বাহিনীতে চাকরির সময়টুকু আরএমের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর চাপ ফেলেছে। তাঁর ভাষ্যে, এই মানসিক চাপ তাঁকে একটি গুহায় ঠেলে দিয়েছিল। কিন্তু কোনো অনুভূতিই চূড়ান্ত ছিল না, এই গুহায় ঢুকে যাওয়ার অনুভূতিও চিরস্থায়ী ছিল না। দক্ষিণ কোরিয়ার সিউলে মধ্য ফেব্রুয়ারির এক রৌদ্রহীন শনিবারে আরএম তাঁর ছয় ব্যান্ডমেটের সঙ্গে ফিরে এসেছেন। তাঁরা এখন শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত হাইব-এর বিশাল সদর দপ্তরের ভেতরে একটি গুদামঘরের মতো স্টুডিওতে বসে আড্ডা দিচ্ছেন। এই কোম্পানিটি মূলত বিটিএসের অসাধারণ সাফল্যের ওপর ভিত্তি করেই তৈরি হয়ে ধীরে ধীরে বিশ্বজুড়ে বিস্তৃত হয়েছে।

ভবনটি চকচকে, ধাতব আর অত্যাধুনিক। এখানে লবির নিরাপত্তারক্ষীরা দর্শনার্থীদের এমন কঠোরভাবে থামিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেন, যা অনেক আমেরিকান পপ তারকার কাছেও কল্পনার বাইরে। ওপরের তলায় কর্মীরা ক্লিপবোর্ড হাতে এনডিএ (গোপনীয়তা চুক্তি) সই করাতে দেন।

এমনকি বাথরুমগুলোর নিরাপত্তাব্যবস্থা দেখলেও মনে হচ্ছে যেন ভবিষ্যতে চলে এসেছি। স্লাইডিং ইলেকট্রনিক দরজা দিয়ে ঢুকতে যেমন আইডি কার্ড লাগে, বের হতেও একইভাবে আইডি কার্ড দরকার হয়।

বিটিএসের সদস্যরা। ছবি : বিগহিট মিউজিক

বিটিএস যখন বিল্ডিংয়ে আছে তখন নিরাপত্তাকর্মীদের আর দোষ কোথায়? ব্যান্ডের সম্পদে সামান্য পরিবর্তন দেখা দিলেও হাইবের স্টক প্রাইসে বিশাল পরিবর্তন নেমে আসে। ২০২০ সালে দক্ষিণ কোরিয়ার  সামরিক নীতিমালায় পরিবর্তন আনা হয়েছিল শুধু বিটিএসের কথা মাথায় রেখে। যদিও শেষ পর্যন্ত দলের সাতজন সদস্যই সেনাবাহিনীতে যোগ দেন।

‘আরিরাং’ দীর্ঘ ছয় বছর পর বিটিএসের প্রথম নতুন গানের অ্যালবাম। অ্যালবামটি মুক্তির পাঁচ সপ্তাহ আগে আরএমের জীবনটা হয়ে গেছে ঠিক যেন তার প্রিয় কবিতার মতো। তিনি বললেন, ‘আমি একই সঙ্গে খুবই আনন্দ আবার প্রচণ্ড মানসিক চাপ অনুভব করছি।’

আরএমের পরনে চকচকে কালো লেদারের জ্যাকেট, ভেতরে কালো টি-শার্ট, ভারী বুট, আর ঢিলেঢালা প্যারাস্যুট প্যান্ট। বিটিএসের সদস্য না হলে কারও পক্ষে এই পোশাকে এতটা সহজে মানিয়ে নেওয়া কঠিন। তাঁর চুলের আগা হালকা রং করা, যত্ন নিয়ে এলোমেলো করে সাজানো। চোখ দুটো সতর্ক, দুষ্টুমিভরা। সব সময় যেন কিছু খুঁজছে। জীবনের শুরুর দিকে আরএম পড়াশোনাকেই বেশি গুরুত্ব দিতেন। আমরা সহজেই তাঁকে অন্য কোনো সময়ের একজন তরুণ জনপ্রিয় প্রফেসর হিসেবে কল্পনা করতে পারি। প্রফেসর হলে সম্ভবত তিনি তাঁর মোটা চশমাটা সব সময় পরতেন যেটা এখন অফ-ডিউটিতে ব্যবহার করেন।

আরএম সব সময় নিজেকে প্রশ্ন করেন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রশ্নগুলোর বেশির ভাগই ছিল তাঁর দল নিয়ে। তাঁদের গান শুনতে কেমন হওয়া উচিত? তাঁরা কিসের পক্ষে? তাঁদের কী এগিয়ে যাওয়া উচিত? তাঁর পক্ষে এটা বলা সহজ হতো যে ‘আরিরাং’ সেই সমস্ত প্রশ্নের উত্তর দেয়, কিন্তু তিনি এতটাই সত্যবাদী যে এই কথা বলতে পারেন না।

আরএম বলেন, ‘আমি এখনো বেশ বিভ্রান্ত, এবং সেনাবাহিনী থেকে ফেরার পর আমরা এটাই বুঝতে পেরেছি। আমি ভেবেছিলাম এমন কোনো সুনির্দিষ্ট, সুস্পষ্ট ঐকমত্য থাকবে যার সঙ্গে আমরা সবাই একমত হতে পারব। কিন্তু ভাবনাটা পুরোপুরি সঠিক ছিল না।  তাই চিত্রটি এখনো অস্পষ্ট। কিন্তু  যাঁরা ভাবছেন, “২০২৬ সালে বিটিএস কী?” তাঁরা এই ১৪টি গানে নিজেদের প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পেতে পারেন।’

২০২০ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে মুক্তিপ্রাপ্ত বিটিএসের তিনটি ইংরেজি গান, ‘ডায়নামাইট’, ‘বাটার’ ও ‘পারমিশন টু ড্যান্স’-এর মাধ্যমে বিটিএস বিশ্বজয়ের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছে। তারা এমন উচ্চতায় পৌঁছে গেছে যেখানে আর কোনো দক্ষিণ কোরীয় বা দক্ষিণ এশীয় ব্যান্ড পৌঁছাতে পারেনি। কিন্তু আরএম প্রায়ই একটি কথা ভেবে অবাক হন—বিশ্বও কি এই একই প্রক্রিয়ায় বিটিএসকে জয় করে ফেলেছে?

একই সন্দেহ জে–হোপের মনেও। তাঁর প্রায়ই মনে হতো, ‘এত ভালোবাসা আর মনোযোগ পাওয়া আসলে ভালো কিছু কি? হয়তো সবাই যখন আমাকে হাততালি দিচ্ছে, উল্লাস করছে, তখনই আমার সব বন্ধ করে দেওয়া উচিত। আমি ভাবতাম, আমি কি সত্যিই এটা চাই? আমার ভেতরে শুধু একটা ছোট্ট আগুন ছিল, আর সেই আগুন হঠাৎ করেই দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ল। এতে আমি প্রচণ্ড চাপ অনুভব করতাম।’
২০২২ সালে জে–হোপ বিটিএসের প্রথম সদস্য হিসেবে পূর্ণাঙ্গ একক অ্যালবাম ‘জ্যাক ইন দ্য বক্স’ প্রকাশ করেন। অ্যালবামটির ‘আর্সন’ গানটিতে  তিনি সরাসরি প্রশ্ন তোলেন, ‘আমি কি এই আগুন নিভিয়ে ফেলব, নাকি আরও উজ্জ্বলভাবে জ্বলব?’ শেষ পর্যন্ত জে–হোপ দ্বিতীয় পথটিই বেছে নেন।

আমি দলের সদস্যদের বলেছি, যদি আমরা আর নিজেদের চ্যালেঞ্জ না করি, তাহলে দল চালিয়ে যাওয়ার কোনো মানে হয় না।  পৃথিবীকে দেখাতে হবে যে আমরা এখনো এগিয়ে যাচ্ছি, এখনো নতুন কিছু খুঁজে বের করছি। বিষয়টি অনেক সময় খুব জটিল হয়ে যায়। তবু আমার মনে হয় নিজেদের কাজগুলোকে আমাদের আরও, আরও বেশি করে শেষ সীমায় নিয়ে যেতে হবে। শেষ সীমায় পৌঁছানো আমাদের জন্য যথেষ্ট নয়।’
আরএম

দলের র‍্যাপ লাইনের তৃতীয় সদস্য, বুদ্ধিদীপ্ত ও রহস্যময় ক্যারিশমাটিক সুগা মনে করেন, বিষয়টি নিয়ে তেমন কোনো প্রশ্নই ছিল না। তিনি বলেন, ‘সবাই মনে মনে কী ভাবছে বা চাইছে, সেটা আমার জানার উপায় নেই। আমরা সবাই এককভাবে কাজ করেছি কারণ, তখন দল হিসেবে কাজ করা সম্ভব ছিল না। তাই সামরিক বাহিনীতে যাওয়ার আগেই আমি জানতাম, আমরা আবার এক হবই। বাইরে থেকে এটা অবাক লাগতে পারে, কিন্তু আমাদের জন্য একসঙ্গে থাকা খুব স্বাভাবিক মনে হয়েছে। তাই এ নিয়ে আসলে কারও আলাদা মতামত ছিল না। আমি শুধু ভাবতাম, অবশ্যই আমরা আবার এক হব।’

আরএম ‘আরিরাং’ অ্যালবামের জন্য একটি স্পষ্ট লক্ষ্য ঠিক করেছিলেন, যা শেষ পর্যন্ত শিল্প ও বাণিজ্য—দুই দিক থেকেই বড় সাফল্য পায়। অ্যালবামটি প্রথম সপ্তাহেই শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই ৬ লাখ ৪১ হাজার কপি বিক্রি হয় এবং ১১৫টি দেশের অ্যাপল মিউজিকের চার্টের শীর্ষে উঠে আসে।

আরএম বলেন, ‘আমি দলের সদস্যদের বলেছি, যদি আমরা আর নিজেদের চ্যালেঞ্জ না করি, তাহলে দল চালিয়ে যাওয়ার কোনো মানে হয় না।  পৃথিবীকে দেখাতে হবে যে আমরা এখনো এগিয়ে যাচ্ছি, এখনো নতুন কিছু খুঁজে বের করছি। বিষয়টি অনেক সময় খুব জটিল হয়ে যায়। তবু আমার মনে হয় নিজেদের কাজগুলোকে আমাদের আরও, আরও বেশি করে শেষ সীমায় নিয়ে যেতে হবে। শেষ সীমায় পৌঁছানো আমাদের জন্য যথেষ্ট নয়।’ নতুন কিছু করার ইচ্ছার এই তীব্রতার কথা ভেবে তিনি নিজেই হাসেন।

বয়সের দিক থেকে দলের সবচেয়ে বড় সদস্য জিন। এখন তাঁর বয়স ৩৩। তাঁর মধ্যে একধরনের ব্যঙ্গাত্মক আকর্ষণ আছে। কণ্ঠস্বর গভীর ও পরিষ্কার টেনর (টেনর হলো পুরুষদের মধ্যে সর্বোচ্চ স্বরের কণ্ঠ)। মঞ্চে তাঁর উপস্থিতি বেশ শক্তিশালী। অনেক সময় মনে হয়, দলে নিজের জায়গা নিয়ে তাঁর অকারণ একধরনের সন্দেহ আছে। এটা নিয়ে তিনি মজা করে বলেন, তাঁর একমাত্র সুবিধা হলো তিনি ‘অন্য সদস্যদের চেয়ে বেশি সুন্দর’।

সামরিক বাহিনীতে জিনই প্রথম যোগ দিয়েছিলেন, কোল্ডপ্লের সঙ্গে করা তাঁর গান ‘দ্য অ্যাস্ট্রোনট’ প্রকাশের কিছুদিন পর। সেনাবাহিনীতে সহকারী ড্রিল সার্জেন্ট হিসেবে কাজ করার সময় তিনি নিজের সৈন্যদের জন্য বাড়তি খাবার কিনে দিতেন।  ফলে তাঁরা তাঁকে খুব ভালোবেসে ফেলেছিলেন। জিনের বিদায়ের সময়ে তাঁরা কেঁদে ফেলেছিলেন। বিদায় অনুষ্ঠানে জিন নিজেও কেঁদেছিলেন।

সেনাবাহিনী থেকে ফিরে এসে জিন অলিম্পিক গেমস প্যারিস ২০২৪-এ অলিম্পিক মশাল বহন করেন।  নেটফ্লিক্সের একটি জনপ্রিয় ভ্যারাইটি শোতে অভিনয় করেন, এবং দুটি চমৎকার ইপি (অ্যালবামের ক্ষুদ্র সংস্করণ) প্রকাশ করেন। মূলত কোল্ডপ্লের দীর্ঘদিনের ভক্ত হওয়ার কারণে তিনি একক ইপিগুলোতে তাঁর পছন্দের রক সংগীতের ধারা আরও বেশি করে তুলে ধরেছেন।

বিটিএসের সদস্যরা। ছবি : বিগহিট মিউজিক

কিন্তু এই সবকিছুর মধ্যেও জিন সব সময় দলে ফিরে যাওয়ার পথ খুঁজছিলেন। তিনি বলেন, ‘আমি অন্য সদস্যদের খুব মিস করতাম। আমি সব সময়ই ভেবেছি, যদি দল না থাকে, তাহলে এগিয়ে যাওয়ার কোনো মানে হয় না। আমার কাছে একক ক্যারিয়ার ততটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। যদি কিছু করি, সেটা হবে ভক্তরা বিরক্ত হয়ে গেলে দলের ভেতরেই নতুন কিছু করার চেষ্টা করা। অভিনয় বা এ রকম অন্য কিছুতে আমার কোনো আগ্রহ নেই।’

২০২৩ সালে সুগা তাঁর অল্টার ইগো ‘আগাস্ট ডি’ ছদ্মনামে প্রথম অফিশিয়াল একক অ্যালবাম প্রকাশ করেন। এর আগে তাঁর দুটি মিক্সটেপ ছিল, যেখানে তিনি খুব ব্যক্তিগত ও সাহসী স্বীকারোক্তির মাধ্যমে নতুন সীমা ভেঙেছিলেন। ‘অ্যামিগডালা’ গানটিতে তিনি তাঁর মা–বাবার অসুস্থতা ও নিজের জীবনের নানা ট্রমার কথা বলেন। তবে একই সঙ্গে ঘোষণা করেন যে তিনি অতীতের বোঝা থেকে মুক্ত। গানের কথায় তিনি বলেন, ‘যা আমাকে মেরে ফেলেনি, তা আমাকে আরও শক্তিশালী করেছে, আর আমি আবার পদ্মফুলের মতো ফুটে উঠছি।’

সুগা বলেন, ‘শেষ অ্যালবামের পর আমার ভেতরে আর কোনো নেতিবাচক অনুভূতি নেই।’ এ ছাড়া ২০২২ সালে তিনি গানের কথা ফুরিয়ে যাওয়ার শঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন। সেটিও তিনি কাটিয়ে উঠেছেন। তিনি বলেন,‘আমি এখন এই ব্যাপারটা নিয়ে কম চাপ নেওয়ার চেষ্টা করি। আমার সব সময়ই কিছু না কিছু বলার থাকবে, আবার একসময় ফুরিয়েও যাবে। এই চক্র কখনো শেষ হওয়ার নয়।’

আমি মনে করি, যদি “লেওভার” বের না হতো তাহলে একজন শিল্পী হিসেবে ভি আটকে থাকত কেবল একজন কঠোর পরিশ্রমী নৃত্যশিল্পী ও গায়ক হিসেবে। ভেতরের নানা রং, বৈচিত্র্যগুলো প্রকাশ করা হতো না।
ভি

জাংকুক একদম শুরু থেকেই পপ স্টারের মতো এগিয়ে গেছেন। যেন পপস্টার হওয়ার জন্যই তাঁর জন্ম। তবু বিটিএসের সবচেয়ে কনিষ্ঠ সদস্য (এখন ২৮ বছর) হিসেবে তিনি এখনো আশ্চর্যজনকভাবে বিনয়ী।

জাংকুক বলেন, ‘সত্যি বলতে, আমি এখনো নিজেকে পুরোপুরি পপ স্টার হিসেবে ভাবতে পারি না। কিন্তু মানুষ আমাকে এভাবে দেখে, ভক্তরা এভাবে ভাবে—এটা ভেবে আমি খুবই কৃতজ্ঞ। তাই আমি আরও ভালো করতে চাই, যেন একদিন নিজেকে সত্যিকারের স্টার মনে করতে পারি। কোনো একদিন!’ ২০২৩ সালে জাংকুকের একক সিঙ্গেল ‘সেভেন’ স্পটিফাইয়ে সবচেয়ে বেশি স্ট্রিমিং হওয়া গানগুলোর মধ্যে ছিল চতুর্থ।

জিমিনের কণ্ঠ আর অসাধারণ ব্যক্তিত্বের কারণে তাঁকে দলের আর সবার মধ্যেও আলাদা করা যায়। নিজের একক সাফল্যে তিনি নিজেই অবাক হয়ে গিয়েছিলেন। তার গান ‘লাইক ক্রেজি সেভেন’ মুক্তির কয়েক মাস আগেই হট হান্ড্রেড-এ এক নম্বরে পৌঁছে যায়। তিনি প্রথম কোরীয় একক শিল্পী হিসেবে এই সাফল্য অর্জন করেন। জিমিন বলেন, ‘আমি এটা একেবারেই আশা করিনি। কিন্তু এই অভিজ্ঞতার মাধ্যমে আমি বুঝেছি, আমার এখনো অনেক পথ বাকি।’

কনসার্টে বিটিএস। ছবি: এএফপি

২০২১ সালে জিমিন বলেছিলেন, দল ছাড়া নিজেকে কল্পনা করা তাঁর পক্ষে কঠিন। এখনো সেই ভাবনা বদলায়নি। তিনি বলেন, ‘আমার চিন্তাধারা বদলায়নি। যদি কিছু বদলেও থাকে, তা হলো—বিটিএস ও বিটিএসের অংশ হিসেবে ভালো করা এখন আমার সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার। তবে একই সঙ্গে আমি একজন ব্যক্তি হিসেবেও আরও ভালো গায়ক হতে চাই। আমার টিমমেটরা সবাই এত অসাধারণ যে তাঁদের মধ্যে নিজের মূল্য বাড়াতে ও তাঁদের ছায়ায় ঢাকা না পড়তে আমাকে আরও উন্নতি করতে হবে।’

ব্যান্ডের তেজোদীপ্ত ব্যারিটোন কণ্ঠের অধিকারী ভি। অভিনেতা হিসেবেও মাঝেমধ্যে কাজ করেন। তাঁর প্রথম অ্যালবাম ‘লেওভার’–এর গানগুলো ছিল কিছুটা আর এন বি ধরনের। সঙ্গে একটু জ্যাজের প্রভাবও ছিল। ভি বলেন, ‘আমি মনে করি, যদি “লেওভার” বের না হতো তাহলে একজন শিল্পী হিসেবে ভি আটকে থাকত কেবল একজন কঠোর পরিশ্রমী নৃত্যশিল্পী ও গায়ক হিসেবে। ভেতরের নানা রং, বৈচিত্র্যগুলো প্রকাশ করা হতো না।’

লিড সিঙ্গেল ‘সুইম’ শুরু থেকেই বিশেষ মনে হয়েছিল। অন্যদিকে ‘হুলিগ্যান’ গানটি তৈরি হয় এল গুনিনচোর সঙ্গে কাজ করে, যেখানে জাংকুক আবার র‍্যাপে ফিরে আসেন। স্টুডিওতে কাজ করার সময় প্রত্যেকের আলাদা স্টাইল ছিল। সুগা চুপচাপ পর্যবেক্ষণ করতেন, জে-হোপ হঠাৎ করে তীব্র র‍্যাপ দিয়ে সবাইকে চমকে দিতেন, আর জিমিন চুপচাপ শুনে পরে নিখুঁতভাবে নিজের অংশটি করতেন।অ্যালবামের নাম ‘আরিরাং’ রাখা হয় একটি প্রাচীন কোরিয়ান লোকগানের নাম থেকে। যদিও তাঁরা সরাসরি ‘কোরিয়ানত্ব’ জোর করে দেখাতে চাননি, তবু কোরীয় ভাষার ব্যবহার বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন।

ভি আরও জানান, ভবিষ্যতে তিনি পপ অ্যালবামও করতে চান। তিনি বলেন, ‘পপ মিউজিকও আমি ভালোবাসি, পপ নিয়ে কাজ করার চেষ্টা করে আসছি। কখন হবে জানি না, কিন্তু একদিন আমি অবশ্যই এটা করতে চাই।’ সামরিক জীবনে তিনি চেষ্টা করেছিলেন সংগীত জীবনকে কিছু সময়ের জন্য ভুলে গিয়ে নিজেকে নতুন করে গড়ে তুলতে। তিনি বলেন, ‘আমি অনেক ব্যায়াম করেছি, অনেক বই পড়েছি, অনেক গান শুনেছি। এতে আমার শরীর আর মন দুটোই পুনর্গঠনের সুযোগ পেয়েছিল।’
ভি পড়েছেন নোবেলজয়ী কোরীয় লেখক হান কাং ও জাপানি রহস্য লেখক কেইগো হিগাশিনোর বই। গল্পে ডুবে গিয়ে তিনি নিজেকে চরিত্রগুলোর একজন হিসেবে কল্পনা করতেন।

শুরুর দিকে বিটিএসের সবাই কালো পোশাক আর গলায় সোনার চেইন পরতেন। আর এমনকি জাংকুকও র‍্যাপ করতেন। তাঁদের প্রথম গান ‘নো মোর ড্রিম’ ২০১৩ সালে প্রকাশ পায়। গানটির বেসলাইন ডক্টর ড্রে  ও স্নুপ ডগের  ‘ডিপ কভার’-এর মতো শোনাত। সেই সময়ের বিটিএস ছিল খুব প্রাণবন্ত, গানগুলো ছিল কিছুটা অ্যাগ্রেসিভ  হিপ-হপ স্টাইলের।

কিন্তু একই বছরের ‘কফি’ ও ‘আউট্রোঃ লাভ ইন স্কুল’-এর মতো গান থেকেই তাঁদের ধারা বদলাতে শুরু করে। গায়কদের ভূমিকা বাড়তে থাকে। পরে যখন তাঁরা ইংরেজি গান দিয়ে বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় হন, তখন অনেক সাধারণ শ্রোতাই হয়তো জানত না যে তাঁদের শুরুটা এতটা র‍্যাপ-ভিত্তিক ছিল।

নতুন অ্যালবামে বিটিএস সেই পুরোনো স্টাইল আবার ফিরিয়ে আনতে চেয়েছে, তবে আরও পরিণতভাবে। আরএম বলেন, ‘আমরা ২০১৩ সালে একসঙ্গে শুরু করেছিলাম। এই অ্যালবামটা নতুন শুরু, কিন্তু নিজেদের অজান্তেই আমরা আবার সেই শুরুর সময়ের এনার্জিতে ফিরে যাচ্ছি। বিশ্বকে দারুণ কিছু করে দেখানোর তীব্র ইচ্ছা আমাদের মধ্যে আবার ফিরে এসেছে।’

জিন বলেন, ‘আমি প্রথমে অন্যদের সঙ্গে একমত ছিলাম না। আমি ভাবতাম, আমাদের সবচেয়ে জনপ্রিয় গানগুলোই আমাদের পরিচয়। কিন্তু অনেক আলোচনা শেষে বুঝলাম, আমাদের আসল পরিচয় আমাদের সেই পুরোনো সংগীতেও আছে।’
বিটিএসের দীর্ঘদিনের প্রযোজক পিডগ জানান, এই অ্যালবামে সচেতনভাবে হিপ-হপ শেকড় ধরে রাখা হয়েছে, যদিও এতে বিভিন্ন ধরনের সংগীত মিশে আছে। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে জিন ছাড়া বিটিএসের সদস্যরা একসঙ্গে লস অ্যাঞ্জেলেসের একটি বাড়িতে থাকেন এবং প্রায় দুই মাস ধরে প্রতিদিন ৭-৮ ঘণ্টা করে কাজ করেন। প্রযোজক ডিপ্লোসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক শিল্পীর সঙ্গে তাঁরা কাজ করেন।

এই অ্যালবামে প্রত্যেক সদস্যের আলাদা স্বর ও স্টাইলকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ভি বলেন, ‘আমরা ভাবছিলাম, এককভাবে  কাজ করার পর সবাই নিজস্ব মতামত প্রতিষ্ঠার ওপরেই বেশি  জোর দেবে। কিন্তু অবাক হয়ে দেখলাম, সবাই আরও খোলা মনের অধিকারী হয়ে এসেছে।’

লিড সিঙ্গেল ‘সুইম’ শুরু থেকেই বিশেষ মনে হয়েছিল। অন্যদিকে ‘হুলিগ্যান’ গানটি তৈরি হয় এল গুনিনচোর সঙ্গে কাজ করে, যেখানে জাংকুক আবার র‍্যাপে ফিরে আসেন। স্টুডিওতে কাজ করার সময় প্রত্যেকের আলাদা স্টাইল ছিল। সুগা চুপচাপ পর্যবেক্ষণ করতেন, জে-হোপ হঠাৎ করে তীব্র র‍্যাপ দিয়ে সবাইকে চমকে দিতেন, আর জিমিন চুপচাপ শুনে পরে নিখুঁতভাবে নিজের অংশটি করতেন।
অ্যালবামের নাম ‘আরিরাং’ রাখা হয় একটি প্রাচীন কোরিয়ান লোকগানের নাম থেকে। যদিও তাঁরা সরাসরি ‘কোরিয়ানত্ব’ জোর করে দেখাতে চাননি, তবু কোরীয় ভাষার ব্যবহার বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন।

অনেক নতুন গান তৈরি হলেও সব গান অ্যালবামে রাখা সম্ভব হয়নি। সুগা বলেন, বাকি গানগুলো ভবিষ্যতে একক প্রজেক্টে ব্যবহার করা হতে পারে। দলটি একসঙ্গে ইতিহাস তৈরি করেছে। আলাদা হয়ে আবার নিজ নিজভাবে সফল হয়েছে, এবং আবার একত্রিত হয়েছে। এখন তাদের লক্ষ্য কী? সুগা বলেন, ‘আমাদের এখন উপভোগ করা উচিত। আগে আমরা খুব প্রতিযোগিতামূলক মনোভাব নিয়ে চলতাম। শুধু লক্ষ্য অর্জনের পেছনেই ছুটতাম। নিজেদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের কথা ভাবতাম না। এখন আমরা একটু শান্ত হয়ে কাজটা উপভোগ করতে পারি, যেহেতু আমাদের বয়সও বেড়েছে।’

ফেব্রুয়ারিতে রিহার্সালের সময় জিমিন গ্রুপের বাকি সদস্যদের প্রস্তাব দেন যে তাঁদের ট্যুর শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই স্টুডিওতে ফিরে গিয়ে আরেকটি অ্যালবাম রেকর্ড করা উচিত। কিন্তু সুগার মাথায় অন্য একটি ভাবনা আসে। তিনি বলেন, ‘সময় খুব দ্রুত চলে যাচ্ছে, আর ট্রেন্ডও খুব তাড়াতাড়ি বদলে যাচ্ছে। তাই আমি ভাবছি, আমাদের কিছুদিন সিঙ্গেল রিলিজ করে দেখা উচিত কি না। দেখুন, গত সেপ্টেম্বরেই আমরা অ্যালবামের প্রি-রেকর্ডিং পর্যায় শেষ করেছিলাম। কিন্তু এটি রিলিজ হতে এত সময় লেগে গেল। তাই যখন আমরা অ্যালবামটি তৈরি করি, তখন মার্চ ও এপ্রিলের ট্রেন্ড বা কোন ধরনের জনরা জনপ্রিয় হবে, সে সম্পর্কে আমাদের কোনো ধারণাই ছিল না। ভালো গান তৈরি করার চেষ্টা করাটা বেশ কঠিন ছিল। এসব অনেক কারণেই হয়তো আমরা একটি সিঙ্গেল তৈরি করব, হয়তো একটি মিনি অ্যালবাম, বা এ ধরনের কিছু একটা।’

বিটিএসের সদস্যরা ‘ব্যাড বানি’র মতো বিশ্বমঞ্চে নিজস্ব ভাষায় সফল হওয়ার দিকটাও লক্ষ করছেন। তাঁরা এ কথাও স্বীকার করেন যে অসংখ্য ভক্তের পাশাপাশি  তাঁদের প্রতি বিদ্বেষী কিছু মানুষও আছেন। বিটিএসের নতুন গান ‘২.০’ তাঁদেরকে উদ্দেশ্য করেই গাওয়া। এই বিষয়ে আরএম বলেন, ‘আসলেই এমন অনেকেই আছেন যাঁরা  বাড়িতে বসে প্রার্থনা করেন—বিটিএস ভেঙে পড়ুক, ধ্বংস হয়ে যাক। আমরাও ভাবি, ঠিক আছে। দুই-তিন বছর আমরা আলাদা ছিলাম। তিন বছর কেটে গেছে। আর্মিরা আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে, পৃথিবী আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে। আপনারা অল্প সময়ের জন্য খানিকটা আনন্দ করতে পেরেছেন।’ তাহলে কি বিটিএস এখনো কমেন্ট পড়ে? সুগা বললেন, ‘কখনো না’।

আরএম স্বীকার করলেন, ‘মাঝে মাঝে’। শুনে হাসিতে ফেটে পড়ল পুরো দল। ‘২.০’-এর দম্ভোক্তি খানিকটা তাদের প্রতিদ্বন্দ্বীদের উদ্দেশ্যেও করা হয়েছে বলে মনে হয়। কিন্তু এই মুহূর্তে ঠিক কারা বিটিএসের প্রতিদ্বন্দ্বী?  তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে যখন টেইলর সুইফট, ব্রুনো মার্স বা হ্যারি স্টাইলসের নাম বলা হয়, আরএম নম্রভাবে বলেন, ‘তাঁরা আমাদের চেয়ে বড় শিল্পী। আমরা তো খুবই ক্ষুদ্র, কোরিয়ার একটি বয় ব্যান্ডমাত্র।’
সারা দিনে আরএমের বলা এই একটিমাত্র কথাই খুব একটা বিশ্বাসযোগ্য মনে হলো না।

রোলিং স্টোন অবলম্বনে