
বাংলা গানের অনুপম সুরস্রষ্টা আলাউদ্দীন আলীর মৃত্যুবার্ষিকী আজ। ২০২০ সালের এই দিনে না–ফেরার দেশে পাড়ি জমান কিংবদন্তি এই সুরকার ও সংগীত পরিচালক। ৬৮ বছরের জীবনে তিনি যেভাবে বাংলা গানের ভান্ডার সমৃদ্ধ করেছেন, তা চিরকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবে। চলচ্চিত্র থেকে অডিও অ্যালবাম—সব জায়গাতেই তিনি উপহার দিয়েছেন কালজয়ী বহু গান।
এই বিশেষ দিনে বাবার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তাঁর সুর করা পাঁচটি গান নতুন সংগীতায়োজনে প্রকাশের উদ্যোগ নিয়েছেন তাঁর কন্যা সংগীতশিল্পী আলিফ আলাউদ্দীন ও তাঁর স্বামী, ব্যান্ড তারকা কাজী ফয়সাল আহমেদ। গানগুলো গেয়েছেন মাইলসের হামিন আহমেদ, ওয়ারফেজের পলাশ, এলিটা করিম, পুষ্পিতা এবং ব্যান্ড পেন্টাগনের সদস্যরা। গানগুলো আজ থেকেই ফেসবুক, ইউটিউবসহ সব ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে প্রকাশ পাবে।
পাঁচটি গান হলো ‘শেষ কোরো না’, ‘তোমাকে দেখলে একবার মরিতে পারি শতবার’, ‘হারানো দিনের মতো’, ‘যদি কোনো দিন কোনো মুক্তির কথা লিখতে হয়’ এবং ‘আমায় গেঁথে দাও না মাগো’। প্রথম আলোকে আলিফ জানান, খুব পরিকল্পিতভাবে নয়, বরং অনেকটা হঠাৎ করে এই আয়োজনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে বাবার সুরের প্রতি ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা থেকে সংগত কারণেই কাজটি খুব আন্তরিকভাবে করেছেন।
আলিফের ভাষ্যে, ‘আমরা চাই, বাবার গানগুলো নতুন প্রজন্মের কানে পৌঁছাক। আজ যারা গানে-সুরে বেড়ে উঠছে, তারা হয়তো জানেই না, যেসব গান তারা মাঝেমধ্যে শোনে, সেগুলোর সুরকার আলাউদ্দীন আলী।’ আলিফ আরও বলেন, ‘বাবার গানে সুরের একটি সরলতা ছিল, কিন্তু সেই সরলতার মধ্যেই গভীরতা লুকিয়ে আছে। সবাই বলেন, তাঁর গান গাওয়া সহজ নয়। আমি নিজেও তা-ই মনে করি। অনেকেই ভয় পায় এই গান গাইতে। কিন্তু সেই ভয় কাটিয়ে শিল্পীদের সামনে আসতে হবে। আমরা চেষ্টা করেছি অ্যাকুস্টিক আবহ রেখে গানের সুর ও কথা—এ দুইয়ের সৌন্দর্য যেন শ্রোতারা ঠিকমতো উপলব্ধি করতে পারেন।’
‘শেষ কোরো না’ গানটি গেয়েছেন হামিন আহমেদ। আগে এ গান শোনা গেছে অভিনেতা জাফর ইকবালের কণ্ঠে। সুর করেছিলেন আলাউদ্দীন আলী, কথা লিখেছেন মনিরুজ্জামান মনির। হামিন বলেন, ‘আলী ভাইয়ের সুরে গাওয়ার সৌভাগ্য আমার হয়নি আগে। তবে দুটি সিনেমার গানে গিটার বাজিয়েছিলাম। এ গানটা চেনা ও প্রিয়, ফলে চাপ ছিল বেশি। আলিফ অনুরোধ করেছিল, আমি রাজি হয়ে যাই। আলী ভাইয়ের গান মানেই শ্রুতিমধুর ও হৃদয়ছোঁয়া সুর। এমন উদ্যোগে অংশ নিতে পেরে ভালো লাগছে।’
‘তোমাকে দেখলে একবার মরিতে পারি শতবার’ গানটি প্রথম ব্যবহার হয়েছিল নব্বইয়ের দশকে মুক্তি পাওয়া ‘অঞ্জলি’ ছবিতে। গেয়েছিলেন মাকসুদ, পর্দায় ছিলেন শাবনাজ ও সুস্ময়। এবার গানটি গেয়েছেন ওয়ারফেজের পলাশ। এ শিল্পীর ভাষ্যে, ‘ছোটবেলার প্রিয় একটি গান এটি। মাকসুদ ভাই আমার আইডল, তাঁর গাওয়া গান নতুন সংগীতায়োজনে গাওয়ার অভিজ্ঞতা অনন্য। অনেক বড় প্রাপ্তি বলেই মনে হয়েছে।’
গানগুলোর সংগীতায়োজন করেছেন কাজী ফয়সাল আহমেদ। তিনি জানান, গানগুলোর আবহ এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে, যাতে মূল সুরের আবেদন নষ্ট না হয়, আবার নতুন প্রজন্মের কাছেও তা শ্রুতিমধুর ঠেকে।
সংগীতজীবনে আলাউদ্দীন আলী দীর্ঘ পাঁচ দশকের বেশি সময় ধরে গান তৈরি করেছেন। ‘ভালোবাসা যত বড়’, ‘একবার যদি কেউ ভালোবাসত’, ‘দুঃখ ভালোবেসে প্রেমের খেলা খেলতে হয়’, ‘শত জনমের স্বপ্ন তুমি’, ‘যে ছিল দৃষ্টি সীমানায়’, ‘সুখে থেকো ও আমার নন্দিনী’, ‘সূর্যোদয়ে তুমি’—এমন অসংখ্য গান তাঁর সুরে গাওয়া হয়েছে, যা আজও গাওয়া হয় নানা মাধ্যমে। চলচ্চিত্রে অবদানের জন্য তিনি আটবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন—এর মধ্যে সাতবার সুরকার হিসেবে এবং একবার গীতিকার হিসেবে।
প্রজন্ম বদলেছে, গান শোনার ধরন বদলেছে। তবু কিছু গান থেকে যায়, কিছু সুর কখনোই মুছে যায় না। আলাউদ্দীন আলীর গান তেমনই। এই আয়োজন সেই অমরত্বকে নতুন করে ছুঁয়ে দেখার প্রয়াস। হয়তো ভুলত্রুটি থাকবে, কিন্তু শ্রদ্ধা, ভালোবাসা আর আন্তরিকতায় এর ঘাটতি নেই—এটাই আলিফ ও ফয়সালের মূল বার্তা।