
বাংলা নববর্ষ ঘিরে ‘বাঁধন আছে প্রাণে প্রাণে’ সংগীতসন্ধ্যার আয়োজন করেছিল ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশন, ইন্ডিয়ান কাউন্সিল ফর কালচারাল রিলেশনস এবং এইচএসবিসি ব্যাংক। দুই বাংলার জনপ্রিয় দুই শিল্পী শ্রীকান্ত আচার্য আর অদিতি মহসিনের একক ও যুগল পরিবেশনায় ইন্দিরা গান্ধী কালচারাল সেন্টারে শুক্রবারের সন্ধ্যাটি হয়ে ওঠে মনোরম।
গুলশানের ইন্দিরা গান্ধী সেন্টারের ভেতর-বাহিরটা ছিল ছিমছাম সাজানো। সবুজ ঘাসের ওপর শামিয়ানা টানিয়ে তৈরি করা হয়েছিল মনোরম পরিবেশ। দর্শক-শ্রোতার পোশাকে ছিল নববর্ষের আমেজ। সন্ধ্যাটা রূপ নেয় এক মৃদু, সংবেদনশীল মিলনমেলায়।
শুরুতেই বক্তব্য দেন বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মা এবং এইচএসবিসি বাংলাদেশের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মাহবুব উর রহমান। তাঁদের বক্তব্যে উঠে আসে পয়লা বৈশাখের উৎসবচেতনা, বাংলা সংস্কৃতির মানবিকতা আর দুই দেশের সাংস্কৃতিক বন্ধনের কথা। প্রণয় ভার্মা নতুন বছরের শুভেচ্ছা জানিয়ে বলেন, ‘এ উৎসব আমাদের পরিচয়, আমাদের শিকড়ের কথা মনে করিয়ে দেয়, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত করে। এই সন্ধ্যা আরও বিশেষ হয়ে উঠেছে দুই বাংলার দুই গুণী শিল্পীর উপস্থিতিতে। এ ধরনের আয়োজন শুধু গান শোনার নয়, এটি একে অন্যকে আরও ভালোভাবে জানার ও বোঝার সুন্দর সুযোগ।’
মাহবুব উর রহমান বলেন, ‘একটি বৈশ্বিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে এইচএসবিসি প্রতিটি দেশের নিজস্ব সংস্কৃতিকে মূল্য দেয় এবং আমরা বিনম্রভাবে বাংলা সংস্কৃতির বিকাশ ও প্রসারে কাজ করে যাচ্ছি।’ সব মিলিয়ে তাঁদের সংক্ষিপ্ত কথার মধ্যেই আয়োজনের মর্মকথাটা উঠে আসে।
অস্থিরতা, যুদ্ধ আর অনিশ্চয়তার সময়ে মানুষের আশ্রয় হয়ে ওঠে সুর। সেই বোধ থেকেই গানের খাতা খোলেন অদিতি মহসিন। প্রায় একই রাগে দুটি গান গেয়ে শ্রোতাদের মনোজগৎ প্রস্তুত করেন অদিতি মহসিন। পরিবেশন করেন রজনীকান্ত সেনের ‘তুমি নির্মল করো’ রবীন্দ্রনাথের ‘বরিষ ধরা-মাঝে শান্তির বারি’। দুটি গানেই ধ্বনিত হয়েছে শান্তির জন্য আকুতি। তৃতীয় পরিবেশনার আগে অদিতি বলেন, বাংলা গানের আধুনিক কাঠামো বদলে দিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। সেই সূত্রে তাঁর কণ্ঠে শোনা যায় ‘তুমি ডাক দিয়েছ কোন সকালে’। গান এগোয়, আবহ বদলায়, ‘আমার প্রাণের মানুষ আছে প্রাণে’—ভিন্ন মেজাজে ধরা দেয় আবেগের অন্য রং। দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের ‘আজি, নূতন রতনে, ভূষণে যতনে’ গেয়ে ছুঁয়ে যান ঐতিহ্যের আরেক ধারা। তারপর রবীন্দ্রসংগীত ‘বিপুল তরঙ্গ’, ‘ও যে মানে না মানা’ এবং ‘যাব না যাব না ঘরে’—ক্রমে গাঢ় হয় সুরের আবেশ। দেশাত্মবোধের আবহে ‘সার্থক জনম আমার জন্মেছি এই দেশে’ গেয়ে একক পরিবেশনা শেষ করেন অদিতি। ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গের প্রেক্ষাপটে রচিত স্বদেশ পর্যায়ের গানটি দিয়ে উচ্চারিত হয় আত্মপরিচয় আর দেশের প্রতি নিবিড় ভালোবাসা।
অদিতিকে মঞ্চে রেখেই এরপর সন্ধ্যার অপর শিল্পী কলকাতার শ্রীকান্ত আচার্যকে মঞ্চে আহ্বান জানান সঞ্চালক কৌশিক শংকর দাশ। শ্রীকান্তকে আলাদা করে পরিচয় করানোর খুব প্রয়োজন পড়ে না—বাংলা আধুনিক গানের শ্রোতারা তাঁকে অনেক দিন ধরেই নিজের করে নিয়েছেন। কলকাতার শিল্পী, কিন্তু বাংলাদেশের শ্রোতার কাছেও তিনি প্রায় ঘরের মানুষ। রবীন্দ্র, আধুনিক ও চলচ্চিত্র—সব গানেই আধুনিক বাংলা গানের অন্যতম জনপ্রিয় এই কণ্ঠের স্বতন্ত্র গায়কি আলাদা করে নজরে পড়ে। বাংলাদেশের শ্রোতাদের সঙ্গেও তাঁর রয়েছে নিবিড় আবেগের সম্পর্ক। রাত ৮টা ১৫ মিনিটে দুজন একসঙ্গে শুরু করেন ‘এসো হে বৈশাখ’। সেই মুহূর্তেই যেন পূর্ণতা পায় পুরো আয়োজন। নতুন বছরের আহ্বান। সন্ধ্যায় শুরু হওয়া সুরযাত্রা যেন এই গানে এসে গন্তব্যে পৌঁছায়। মঞ্চ আর দর্শকসারি তখন একাকার। সম্মিলিত উদ্যাপনের মাধ্যম হয়ে ওঠে সুর। পরে তাঁদের কণ্ঠে শোনা যায় ‘সেই ভালো সেই ভালো’। গান শুরুর আগে দুজনই স্মৃতিচারণা করেন, তুলে ধরে ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে এক মঞ্চে গাওয়ার অভিজ্ঞতা। এ সময় অদিতির প্রশংসা করে শ্রীকান্ত বলেন, দুই বাংলার সমকালীন রবীন্দ্রসংগীত শিল্পীদের মধ্যে অদিতি অন্যতম সেরা। তাঁর গায়কি, সংগীতবোধ আর পরিবেশনভঙ্গি তাঁকে আলাদা উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
একক গানে শ্রীকান্ত এগিয়ে যান নিজের পরিচিত পথে। গাইলেন ‘কেন দূরে থাকো’, ‘চলো এখনো সময় আছে’—যেখানে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের ‘এই পথ যদি না শেষ হয়’ গানের অংশও জুড়ে দেন। ‘আমায় প্রশ্ন করে নীল ধ্রুবতারা’ গানটি তিনি পরিবেশন করেন বাংলা-হিন্দির মিশেলে। রবীন্দ্রসংগীত ‘মনে কি দ্বিধা রেখে গেলে’ পরিবেশনের আগে শিল্পী বলেন, সুরের কারিকুরিতে নয়; বরং কথা ও সুরের অনন্য মেলবন্ধন এই গানের শক্তি।
প্রয়াত বন্ধু কিংশুককে স্মরণ করে গাইলেন ‘মেয়েটা ছিল সদ্য ফোটা’।
গজল গাওয়ার আগে একটু থামেন। তাঁর ভাষ্যে, কথা আর সুর একে অপরকে খুঁজে পায়। গজলের প্রতি নিজের ভালোবাসার কথা জানিয়ে পরিবেশন করলেন ‘ঝুঁকি ঝুঁকি সি’। এরপর তাঁর বহুল জনপ্রিয় দুটি গান ‘সারাটা দিন মেঘলা আকাশ’, ‘আমি খোলা জানালা তুমি দখিনা বাতাস’।
নজরুলসংগীত ‘তোমারই আঁখির মত আকাশের দুটি তারা’ দিয়ে অন্য স্বাদ এনে শেষের দিকে জানালেন, দীর্ঘ তিন বছর পর স্ত্রী ও মেয়েকে নিয়ে বাংলাদেশে এসেছেন। এক ফাঁকে বাংলা গান নিয়ে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে যাওয়ার অভিজ্ঞতার কথা তুলে বললেন, ‘বাংলা গানের প্রতি সত্যিকারের আবেগ কোথাও যদি থাকে, সেটা বাংলাদেশের মানুষদের মধ্যেই।’ স্ত্রীর লেখা ও নিজের সুর করা একটি গান গাওয়ার আগে স্মরণ করলেন প্রয়াত শিল্পী কালিকাপ্রসাদ ভট্টাচার্যকে। একুশে ফেব্রুয়ারির স্মরণে অর্ণা শীলের লেখা ‘আমি সেই দেশ খুঁজেছি কত’ গানে শেষ পরিবেশনার আগে সঙ্গে থাকা যন্ত্রশিল্পীদের পরিচয় করিয়ে দেন।
শেষে আয়োজকদের পক্ষ থেকে শিল্পীদের সম্মাননা জানান সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী, ভারত ও মধ্যপ্রাচ্যে এইচএসবিসি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং হেড অব স্ট্র্যাটেজি রঞ্জন ভট্টাচার্যসহ অন্য অতিথিরা।
পরদিন অর্থাৎ গতকাল শনিবার সন্ধ্যাতেও একই শিরোনামে অনুষ্ঠিত হয় আরেকটি আয়োজন—আবারও মেলে দুই শিল্পীর সুরের বন্ধন। এদিন ছিল আরও বেশ কিছু নতুন গানের পরিবেশনা। এদিন এসেছিলেন তথ্যমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন,সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম প্রমুখ।