এখনো কি ব্যস্ত? ‘না, ভাই। অফিসের একটা মিটিংয়ে ছিলাম। এখন ফিরেছি।’ দুপুরে ফোন করে পাওয়া গেল না, বিকেল গড়াতে নিজেই ফোন করলেন নাহিদ হাসান। পাল্টা প্রশ্ন করলাম, ‘আপনার চাকরিও করতে হয়?’ জানালেন, গান করতেই এসেছিলেন এই শহরে। তবে বাস্তবতা সহজ নয়, চাকরিও করতে হয়। আলাপে আলাপে জানা গেল গানের স্বপ্নে ঠাকুরগাঁও থেকে ঢাকায় আসা এক তরুণের গল্প। যে গল্পে সাফল্যের আনন্দের সঙ্গে আছে হতাশা, সংগ্রাম আর বিষণ্নতা; যেমনটা তাঁর গানেও থাকে।
গানের বাড়ি
পরিবারের সবার মধ্যে নাহিদই প্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে গান করছেন। তবে বড় চাচা, তাঁর বড় ভাই-বোনেরা নিয়মিতই গাইতেন, যুক্ত ছিলেন যাত্রাপালার সঙ্গেও। এভাবেই হয়তো অজান্তেই গানের বীজ তৈরি হয় নিজের মধ্যে। তবে বগুড়ায় কলেজে ভর্তি হওয়ার পর সেটা আরও পোক্ত হয়। যখন কলেজের সেকেন্ড ইয়ারে পড়েন, তখন থেকেই বন্ধুমহলে নিয়মিত লিখতেন, গাইতেন। কলেজ শেষ হলো, গান নিয়ে স্বপ্ন দেখা আরও অনেক তরুণের মতো নাহিদেরও মনে হলো-ভালো কিছু করতে হলে ঢাকায় যেতে হবে। তবে জানতেন না, সেই শহর তাঁর জন্য লিখে রেখেছে এক দুঃখগাথা।
‘কেন এমন হলো’
২০১৪ সাল। নাহিদ সবে ঢাকায় এসেছেন। পড়েন এক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে। পাশাপাশি কাজ করেন এক মুঠোফোনের দোকানে। বিক্রয়কর্মীর চাকরি, ফোন বিক্রি করেন। খেয়ে না খেয়ে টাকা জমান। একটা মিক্সড অ্যালবাম হবে। সেখানে থাকবে নাহিদের লেখা ও সুর করা একটি গানও। অ্যালবাম আসবে ঈদে। প্রথম গান, তর সইছিল না। গানের জন্য নাহিদ নিজের জমানো আর ধার করা হাজার বিশেক টাকাও দিয়েছেন এই অ্যালবাম প্রযোজককে। কিন্তু অ্যালবাম মুক্তির আগেই সেই প্রযোজক বড় ভাই আত্মহত্যা করলেন (তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই নামটা বললেন না নাহিদ)! সেই অ্যালবাম আর আসেনি, ওই গানও আর কখনো মুক্তি দেননি।
‘ওই ঘটনা আমাকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। আমার কত স্বপ্ন ছিল, অনেক কষ্ট করে টাকা জমিয়েছিলাম; কিন্তু মানুষের জীবনের চেয়ে বড় কিছু তো আর নেই। আমি এখনো মানতে পারি না...।’ নাহিদের সেই অপ্রকাশিত গানটির নাম ‘কেন এমন হলো’; ঘটনার সঙ্গে গানের শিরোনামের এমন কাকতালীয় মিল নাহিদ দুঃস্বপ্নেও চাননি।
নতুন শুরু
এই বিয়োগান্ত ঘটনার পর নাহিদ ঠিক করেন, আর অনিশ্চিত কোথাও টাকা দিয়ে গান করবেন না। আরও সময় নেবেন। নিজে লিখবেন কি না, তখনো নিশ্চিত নন; তবে গানটা করবেন। এরপর আরও বছর তিনেক কেটে গেল, তত দিনে ১৬-১৭টি গান লিখে সুরও করে ফেলেছেন নাহিদ। গিটারও কিছুটা আয়ত্তে এসেছে।
২০১৭ সালের দিকে একদিন বনানী সুপার মার্কেটে সংগীতশিল্পী অটমনাল মুনের সঙ্গে হঠাৎ দেখা। আলাপ, পরিচয়; নম্বর বিনিময় হলো। এক বছর লেগে থাকার পর মুন নাহিদকে দিলেন নতুন গান। সেই গান রিলিজ হতে সময় লেগেছিল দেড় বছর। তাঁর জন্য এই বছর দেড়েক সময়টা ছিল অতি দীর্ঘ। ‘তখন আমার আমার বাসা মিরপুর; কাজ করি কেরানীগঞ্জে।’
আর্থিক সংকট ছিল। গানের পেছনে বিনিয়োগের জন্য দুটি সেমিস্টার ড্রপ করতে হয়েছে। ‘লোকাল বাসে ২৫ টাকা ভাড়া দিয়ে মিরপুর থেকে যেতাম গুলিস্তান। পাতাল মার্কেটের পাশে একটা হোটেলে খেতাম ৩০ টাকা দিয়ে, একটা রুটি-ডাল। সেখান থেকে নয়াবাজারে গিয়ে লেগুনায় উঠে যেতাম। দুপুরে খেতাম না। বিকেলের পর অফিস থেকে নাশতা খাওয়াত, সেটাই ছিল আমার দুপুরের খাবার। ফেরার পথে লেগুনায় পাঁচ টাকা দিয়ে বাবুবাজার ব্রিজের ওপার থেকে এপার আসতাম; তারপর হাঁটতাম ফার্মগেট অবধি। আমি পাক্কা চার মাসের মতো এই রাস্তাটুকু রেগুলার হেঁটেছি। ফার্মগেট থেকে ১০ টাকা ভাড়া দিয়ে ফিরতাম মিরপুরের বাসায়। মোটামুটি ১০০ টাকায় দিন পার করতাম। আসলে করতে হতো। এরপর মুন ভাইয়ের সঙ্গে করা “তোমার পিছু ছাড়ব না” গানটি মুক্তি পেয়ে আলোচিত হলো। গান নিয়ে শুরু হলো নতুন এক যাত্রা,’ বলছিলেন নাহিদ।
সর্বজনীন দুঃখ
নাহিদের প্রকাশিত গানের চেয়ে অপ্রকাশিত গানের সংখ্যা বেশি। ‘দেশের যে অবস্থা, মানুষ আসলে যেভাবে আক্রান্ত নানাভাবে, এখন আসলে নতুন গান প্রকাশ করতে ইচ্ছা করে না,’ বলছিলেন তিনি। ‘তোমার পিছু ছাড়ব না’ ছাড়াও তাঁর ‘ঘৃণা থাকুক’, ‘বাবার সাইকেল’, ‘দুঃখ দেওয়ার মানুষ’ গানগুলো আলোচিত হয়েছে। শিল্পীর নিজের প্রিয় অবশ্য কামরুল ইসলামের কবিতা থেকে করা ‘বিনায়ক’। নিজে লেখেন, কবিতা থেকেও সুর করেন নাহিদ। তাঁর গানে উঠে আসে শৈশবের স্মৃতি, প্রেম, সম্পর্ক ভাঙার যন্ত্রণা থেকে ব্যক্তিগত জীবনের টানাপোড়েনের গল্প।
এ জন্যই কি নতুন প্রজন্মের শ্রোতারা তাঁর গান পছন্দ করেন? একটু সময় নিয়ে নাহিদ বললেন, ‘এটা আসলে জানি না। আমাদের গানে তো আগে ব্যক্তিজীবন, সমাজ থেকে দৈনন্দিন জীবনের কথা খুব বেশি উঠে আসত না...এটাও একটা কারণ হতে পারে। তা ছাড়া প্রেম ভেঙে যাওয়ার দুঃখ, বিচ্ছেদের যন্ত্রণা তো সারা পৃথিবীর তরুণদের কাছে একই রকম।’
নাহিদের গানের আরেক বৈশিষ্ট্য, গানে গানে তাঁর মা-বাবার উপস্থিতি। ‘বাবার সাইকেল’ ও ‘বাবার ছেঁড়া জামা’ নামে তাঁর দুটি গান আছে। মাকে নিয়েও অপ্রকাশিত গান আছে। জানালেন, মা-বাবাকে নিয়ে আলাদা কাজের পরিকল্পনা আছে। গত ডিসেম্বরে রাজধানীতে এক ঘরোয়া আসরে মাকে নিয়ে একটি গান গাইছিলেন নাহিদ। সেখানে হাজির ছিলেন এই প্রতিবেদকও। নাহিদ উত্তরবঙ্গের মানুষ, মায়ের সমুদ্র দেখা হয়নি, পাহাড়ও নয়। গানে গানে মাকে সমুদ্র দেখানোর কথা বলছিলেন তিনি। ‘মা-বাবাকে নিয়ে আমি খুব আবেগপ্রবণ। আমার প্রথম সলো অ্যালবাম পরিচয় নেই-এর কাজ শেষ হওয়ার পর মা-বাবাকে নিয়ে একটা ইপি করতে চাই, যেখানে শুধু মা-বাবাকে নিয়ে আমার লেখা গান থাকবে। মা-বাবাকে নিয়ে লেখা কবিতাগুলোকে অডিও আকারে সবাইকে শোনাতে চাই,’ বলছিলেন নাহিদ।
নাহিদ হাসান প্লেব্যাকও করেছেন। ফাখরুল আরেফিন খানের মুক্তির অপেক্ষায় থাকা একটি সিনেমায় তাঁর ও পুতুলের গাওয়া গানের শিরোনাম ‘হাওয়াই মিঠাই’। এটাই তাঁর প্রথম সিনেমার গান। এর আগে দেব অভিনীত রাহুল মুখার্জির কিশমিশ ছবিতে গাওয়ার প্রস্তাব পেয়েছিলেন। কিন্তু পছন্দ না হওয়ায় করেননিএর
সংগ্রামের শেষ নেই
২০১৪ সালে নাহিদ যখন ঢাকায় আসেন, তখন সিডির যুগ শেষ দিকে। সময়ের পালা বদলে এখন সব ডিজিটাল। কারও মুখাপেক্ষী না হয়ে নিজেই নিজের গান প্রকাশ করতে পারেন শিল্পী। নাহিদ জানালেন, এতে অনেক সুবিধা হয়েছে ঠিকই কিন্তু এটা শিল্পীসত্তার ক্ষতিও করছে। ‘গানের সঙ্গে বিপণনটাও জড়িত। শিল্পীকে গান নিয়েই থাকা উচিত, শিল্পীর সঙ্গে বিপণনের ব্যাপারটা সাংঘর্ষিক,’ বললেন তিনি।
নাহিদ ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করতে পছন্দ করেন না। একটাই ইচ্ছা, একদিন চাকরি ছেড়ে পুরোপুরি গানে মন দেবেন, গেয়ে বেড়াবেন পুরো পৃথিবী; যে জন্য এসেছিলেন এই শহরে।