একুশে পদকপ্রাপ্ত পণ্ডিত অমরেশ রায় চৌধুরী
একুশে পদকপ্রাপ্ত পণ্ডিত অমরেশ রায় চৌধুরী

৯৮ বছরে থেমে গেল অমরেশ রায়ের সুরেলা জীবন

বাংলাদেশের উচ্চাঙ্গসংগীত জগতের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র, একুশে পদকপ্রাপ্ত পণ্ডিত অমরেশ রায় চৌধুরী আর নেই। মঙ্গলবার (১২ আগস্ট) বেলা সাড়ে ১১টায় বার্ধক্যজনিত রোগে রাজশাহী নগরের খানসামার চক মহল্লার নিজ বাসভবনে শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন এই মহান সংগীতসাধক। তাঁর বয়স হয়েছিল প্রায় ৯৮ বছর।
পণ্ডিত অমরেশ রায় চৌধুরী দীর্ঘদিন বাংলাদেশের বেতার ও টেলিভিশনে নিয়মিত সংগীত পরিবেশন ও শিক্ষাদানে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। রাজশাহীর মোহিনী নিকেতনে প্রতিষ্ঠিত তাঁর নিজস্ব সংগীতাশ্রম ছিল তরুণ শিল্পীদের এক অধ্যাত্মসন্ধান কেন্দ্র। সম্প্রতি সড়ক সম্প্রসারণের কারণে তাঁর পুরোনো বাসভবন ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় খানসামার চক মহল্লার ফ্ল্যাটে থাকতেন তিনি।

সংগীত সাধনায় পথচলা
অমরেশ রায় চৌধুরীর জন্ম ও শৈশব কাটে ফরিদপুরে। ছোটবেলায় পঞ্চম শ্রেণিতে পড়াকালীন তাঁর মাতা রাজলক্ষ্মী রায়ের উৎসাহে তিনি উপমহাদেশের বিশিষ্ট উচ্চাঙ্গসংগীতশিল্পী ও সুরকার সুবীর লাল চক্রবর্তীর কাছে হাতেখড়ি লাভ করেন। কিন্তু ছায়া পতনের মতো আকস্মিক মৃত্যুর কারণে তিনি সিরাজগঞ্জের সংগীতজ্ঞ হরিহর শুক্লার কাছে কিছুদিন তালিম নেন। পরে ১৪ বছর ধরে ফরিদপুরের কোটালীপাড়ার সংগীতাচার্য তারাপদ চক্রবর্তীর তত্ত্বাবধানে ধ্রুপদ, খেয়াল ও ঠুমরিতে পারদর্শিতা অর্জন করেন। শাস্ত্রীয় সংগীতের এই দীর্ঘ অনুশীলন ছিল তাঁর জীবনের একমাত্র সাধনা। তিনি সংগীতাচার্য তারাপদ চক্রবর্তীর মতো শ্রেষ্ঠ ওস্তাদ হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন। তার পরবর্তী সময়ের সংগীত সাধনায় ময়মনসিংহের বিশিষ্ট শিল্পী ও সুরকার নিখিল চন্দ্র সেনের কাছ থেকে আধুনিক, অতুল প্রসাদী, রাগ প্রধান, নজরুল ও শ্যামা সংগীতের প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন।

একুশে পদকপ্রাপ্ত পণ্ডিত অমরেশ রায় চৌধুরী

উপাধি ও সম্মাননা
১৯৬১ সালে উপমহাদেশের ‘মিউজিক এডুকেশন বোর্ড অব ঝংকার’ থেকে উচ্চাঙ্গসংগীতে সংগীত তীর্থ উপাধিসহ অসংখ্য পদক ও পুরস্কারে ভূষিত হন। জীবদ্দশায় তিনি উপমহাদেশের নামকরা ওস্তাদ ও গুণীজনের সান্নিধ্য লাভ করেন। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ১৯৮৪ সালে ধ্রুপদ ও ধামার কিংবদন্তি ডাগর ব্রাদার্স এবং বিশিষ্ট বংশীবাদক ভিজি কারনাডের সঙ্গে দেখা ও সংগীত পরিবেশনের সুযোগ পেয়ে আন্তরিক প্রশংসা লাভ করেন। এ ছাড়া তিনি ওস্তাদ বড়ে গোলাম আলী খান, অনাথ নাথ বসু এবং চিন্ময় লাহিড়ীর কাছ থেকেও গুণগত শিক্ষা ও স্নেহপূর্ণ সমর্থন পেয়েছিলেন।
সংসার-উদাসী হয়ে সারা জীবন সংগীত সাধনায় নিয়োজিত ছিলেন অমরেশ রায় চৌধুরী। ফরিদপুরের পৈতৃক জায়গাজমি–সম্পত্তি বেদখল হলেও তাঁর খোঁজ নেওয়ার মতো কেউ ছিল না। তিনি দুই পুত্রের জনক। বড় ছেলে অভিজিত রায় চৌধুরী একজন সফল ব্যবসায়ী, আর ছোট ছেলে অমিত রায় চৌধুরী রুয়েটে শিক্ষক।

শেষ ইচ্ছা
মৃত্যুর আগে প্রথম আলোর সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘তরুণেরা আগের তুলনায় অনেক এগিয়েছে, উচ্চাঙ্গসংগীতের প্রসার বেড়েছে, তবে আলাপ-আলোচনা এখনো কিছুটা অবহেলিত।’ তাঁর শেষ ইচ্ছা ছিল তাঁর শিষ্যদের মধ্যে বেঁচে থাকা এবং তাঁর সুর ও শিক্ষা যেন পরবর্তী প্রজন্ম ধরে রাখে। তিনি বলেছিলেন, ‘আমি যখন আর থাকব না, ওরা যেন আমাকে বাঁচিয়ে রাখে। আমি আমার সুরটা ওদের মাঝে রেখে যেতে চাই।’
মঙ্গলবার বিকেল ৫টায় রাজশাহীর পঞ্চবটী মহাশ্মশানে পণ্ডিত অমরেশ রায় চৌধুরীর শেষকৃত্যানুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়।