শুভেন্দু দাশ শুভ-সানজিদা মাহমুদ নন্দিতা
শুভেন্দু দাশ শুভ-সানজিদা মাহমুদ নন্দিতা

ফেসবুকে ভাইরাল এই গানের জুটির গল্পটা জানেন কি

আজ সন্ধ্যায় রাজধানীর তেজগাঁওয়ের ইয়ামাহা ফ্ল্যাগশিপ সেন্টারে ‘মেলোডি মোজাইক উইথ মোজি অ্যান্ড কোং’ শিরোনামের আয়োজনে গান করবেন শুভেন্দু দাশ শুভ-সানজিদা মাহমুদ নন্দিতা। পুরোনো দিনের বাংলা ও হিন্দি গানকে নতুন সাউন্ড ডিজাইনে বর্তমান প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে এই জুটি গড়ে তুলেছেন ‘মোজি অ্যান্ড কোং’। তাঁদের কভার করা ‘সাওয়ারিয়া’ গানটি নিজের ইনস্টাগ্রাম স্টোরিতে শেয়ার করেছেন মূল সুরকার এ আর রাহমান। ডুয়ো ব্যান্ডটির গড়ে ওঠার গল্প শোনালেন নাজমুল হক

অনেক দিন ধরেই সংগীতাঙ্গনে কাজ করছেন শুভেন্দু দাশ শুভ ও সানজিদা মাহমুদ নন্দিতা। কোক স্টুডিও বাংলার জন্য এই সংগীত পরিচালক-গায়ক জুটি করেছেন ‘বুলবুলি’ আর ‘দাঁড়ালে দুয়ারে’-এর মতো জনপ্রিয় দুটি কাজ। তবে আলাদা প্ল্যাটফর্ম বা ব্যান্ড গড়ার কোনো পরিকল্পনা তখন তাঁদের ছিল না।

কোনো পরিকল্পনা ছাড়াই ২০২৪ সালের অক্টোবর-নভেম্বরে পুরোনো দিনের জনপ্রিয় হিন্দি গান ‘ইয়ে রাতে ইয়ে মৌসম’-এর একটি কাভার নন্দিতার ফেসবুক পেজে প্রকাশ করেন তাঁরা। কিন্তু গানটি প্রকাশের পর শ্রোতাদের অভাবনীয় সাড়া তাঁদের নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে। আর সেই ভাবনা থেকেই জন্ম নেয় একটি ব্যান্ড। ২০২৫ সালের ৩ জানুয়ারি নিজস্ব ইউটিউব চ্যানেল ও ফেসবুক পেজের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে মোজি অ্যান্ড কোং। নামটির মধ্যেও রয়েছে একটি দর্শন। ‘মোজি’ বলতে তাঁরা বোঝান তাড়াহুড়ো নয়, বরং স্বস্তি ও স্বাচ্ছন্দ্যের সঙ্গে কাজ করার একটি মানসিকতা।

শুভেন্দুর কথায়, ‘আমাদের কাছে এটি একধরনের ব্রিদিং স্পেস—পেশাগত ব্যস্ততার বাইরে নিজেদের ভালো লাগার গান নিয়ে কাজ করার জায়গা।’ নন্দিতা বলেন, ‘আমরা আনন্দ নিয়ে, নিজেদের পছন্দ আর মুড অনুযায়ী কাজটা করি। তাই এটি আমাদের কাছে কখনোই গতানুগতিক কোনো কাজ মনে হয় না।’

তাঁদের সংগীতের মূল প্রেরণা শৈশবের স্মৃতি। মায়ের মুখে শোনা আধুনিক বাংলা গান, ক্যাসেটে বাজতে থাকা সোনালি সময়ের গান—এসবই তাঁদের সংগীতচর্চার ভিত্তি। সেই হারিয়ে যাওয়া সুরগুলোকে নতুন সাউন্ড ডিজাইনে বর্তমান প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে চান তাঁরা।

শুভেন্দু দাশ শুভ-সানজিদা মাহমুদ নন্দিতা

রাহমানের নজরে

তাঁদের যাত্রার সবচেয়ে বড় চমক স্বদেশ সিনেমার ‘সাওয়ারিয়া’ গানের কাভার। চলতি বছর এপ্রিলের এক বৃষ্টিভেজা দিনে স্টুডিওতে আড্ডার ফাঁকে গানটি গুনগুন করে গাইছিলেন নন্দিতা। তাৎক্ষণিক সেটির একটি সংক্ষিপ্ত ভিডিও ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করেন শুভ।

১৭ জুলাই সকালে ঘুম থেকে উঠে শুভেন্দু দেখেন, অনেকেই তাঁদের অভিনন্দন জানাচ্ছেন। খোঁজ নিয়ে তাঁরা জানতে পারেন, মূল সুরকার এ আর রাহমান নিজের ইনস্টাগ্রাম স্টোরিতে তাঁদের গাওয়া ‘সাওয়ারিয়া’র কাভারটি শেয়ার করেছেন। খবরটি জানতে পেরে বিশ্বাস হচ্ছিল না। বারবার রাহমানের অফিশিয়াল ইনস্টাগ্রাম প্রোফাইলে ঢুকছিলেন নন্দিতা। এ স্বীকৃতি সামনে এগিয়ে যাওয়ার বড় অনুপ্রেরণা মনে করছেন তাঁরা।

ভিন্নপথে হাঁটা

সংগীতে যখন বড় আয়োজনের প্রবণতা বাড়ছে, তখন মোজি অ্যান্ড কোং হাঁটছে ভিন্নপথে। একটি গিটার ও দুটি কণ্ঠ—এই ছোট আয়োজনেই তাঁরা তৈরি করছেন নিজেদের সংগীতধারা।

শুভেন্দুর মতে, অনেক শোরগোলের ভিড়ে মানুষ এখন একটু শান্তি ও ব্যক্তিগত অনুভূতির সুর খোঁজে। দুজনই মনে করেন, ব্যস্ত নাগরিক জীবনে তাঁদের শান্ত ধারার গান শ্রোতাদের আত্মিক শান্তি জোগায়। শুভেন্দু বলেন, ‘সেদিন একজন অভিভাবক জানিয়েছেন, তাঁদের সন্তান পড়াশোনা বা অঙ্ক করার সময় ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক হিসেবে আমাদের গান শুনতে পছন্দ করে। কথাটা শুনে শৈশবের কথা মনে পড়ে গেছে।’

নন্দিতা বলেন, ‘একদিন একজন জানালেন, তাঁর মায়ের বয়স ৮০ বছরের বেশি, তাঁর ডিমেনশিয়া আছে। আমাদের গানগুলো যখন তাঁকে শোনানো হয়, একমাত্র তখন তাঁর মুখে হাসি দেখতে পাওয়া যায়। আরেক দিন একজন নারী আমাদের টেক্সট করে জানান, তাঁর প্রচণ্ড অ্যাংজাইটি বা উদ্বেগের সমস্যা রয়েছে। কোনো কিছুতেই যখন নিজেকে শান্ত করতে পারেন না, আমাদের গান শোনেন। আমাদের গানগুলো তাঁকে স্থির হতে সাহায্য করে। এগুলোই আমাদের পাওয়া।’

শুভেন্দু দাশ শুভ-সানজিদা মাহমুদ নন্দিতা

আসছে মৌলিক গান

শুভেন্দুর তথ্য, অনলাইনে তাঁদের শ্রোতাদের একটি বড় অংশ ২৫ থেকে ৩০ বছর বয়সী। ৩০ থেকে ৪৫ বছর বয়সীদের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য। আবার কনসার্টে তরুণদের পাশাপাশি প্রবীণেরাও সমান আগ্রহ নিয়ে তাঁদের গান শুনতে আসেন। এক অনুষ্ঠানে ৮০ বছর বয়সী এক নারী শ্রোতার উপস্থিতি শুভ ও নন্দিতাকে বিশেষভাবে আপ্লুত করেছিল।

নন্দিতা বলেন, ‘সেদিন এক আয়োজনে দেখি, মঞ্চের ডান দিকে অনেক প্রবীণ এক নারী। তিনি হাঁটতেও পারেন না, ওয়াকার দিয়ে হাঁটেন। তিনি চেয়ারে বসে আমাদের গান শুনলেন। গানের মধ্যেই আমি কেঁদে ফেলি। এটা যে কত বড় পাওয়া, ভাষায় প্রকাশ করতে পারব না।’

কাভার গানের পাশাপাশি এখন মৌলিক গান নিয়েও কাজ করছেন শুভ ও নন্দিতা। চলতি বছরের শেষ দিকে অ্যালবাম অথবা একাধিক সিঙ্গেল আকারে নিজেদের গান প্রকাশের পরিকল্পনা রয়েছে। মৌলিক গানে নানা ধরনের বৈচিত্র্য থাকলেও নিজেদের স্বতন্ত্র ‘সফট সাউন্ড’ ধরে রাখতে চান তাঁরা।