আলিফ আলাউদ্দিন একটি স্থিরচিত্র তাঁর ফেসবুকে পোস্ট করেন, যেখানে তিনি সংগীতের কিংবদন্তি লতা মঙ্গেশকরের কোলে বসে আছেন
আলিফ আলাউদ্দিন একটি স্থিরচিত্র তাঁর ফেসবুকে পোস্ট করেন, যেখানে তিনি সংগীতের কিংবদন্তি লতা মঙ্গেশকরের কোলে বসে আছেন

লতা মঙ্গেশকরের কোলে বসা ছোট্ট শিশুটি বাংলাদেশের কোন গায়িকা

লতা মঙ্গেশকরের কোলে বসে থাকা এই শিশুটি কে? ছবিটি আজ মঙ্গলবার আবার প্রকাশ্যে আসার পর এমন প্রশ্ন উঠেছে অনেকের মনে। শিশুটি আর কেউ নন, বাংলাদেশি একজন জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী এবং যাঁর বাবাও এ দেশের প্রখ্যাত সুরকার ও সংগীত পরিচালক। ৯ বছর বয়সে কলকাতায় গিয়ে লতা মঙ্গেশকরের সান্নিধ্য পেয়েছিলেন তিনি। কীভাবে ঘটেছিল সেই সাক্ষাৎ, এত বছর পরও সেই স্মৃতি তাঁর কাছে কতটা ঝলমলে, তা–ই জানা গেল।

উপমহাদেশের সংগীতে লতা মঙ্গেশকর এক বিস্ময়কর নাম। তাঁর গান শোনাই যেখানে একধরনের তালিম, সেখানে তাঁর সান্নিধ্য পাওয়ার সুযোগ কতটা দুর্লভ, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। অথচ মাত্র ৯ বছর বয়সেই কিংবদন্তি এই শিল্পীর কোলে বসার সুযোগ পেয়েছিলেন বাংলাদেশের সংগীতশিল্পী আলিফ আলাউদ্দীন। নব্বইয়ের দশকের শুরুতে কলকাতার একটি অনুষ্ঠানে বাবা দেশবরেণ্য সুরকার ও সংগীত পরিচালক আলাউদ্দীন আলীর সঙ্গে গিয়েছিলেন আলিফ। সেখানেই লতা মঙ্গেশকরের সঙ্গে তাঁর সেই স্মরণীয় মুহূর্ত ধরা পড়ে ক্যামেরায়।

আলিফ আলাউদ্দিন একটি স্থিরচিত্র তাঁর ফেসবুকে পোস্ট করেন, যেখানে তিনি সংগীতের কিংবদন্তি লতা মঙ্গেশকরের কোলে বসে আছেন

আজ মঙ্গলবার সেই পুরোনো স্থিরচিত্র ফেসবুকে প্রকাশ করেছেন আলিফ আলাউদ্দীন। ছবিতে দেখা যায়, লতা মঙ্গেশকরের কোলে বসে আছেন ছোট্ট আলিফ। বহু বছর পর ছবিটি আবার প্রকাশ্যে আসার পরই যেন নতুন করে ফিরে এসেছে সেই দিনের স্মৃতি। আলিফের কাছেও ছবিটি কেবল একটি ছবি নয়, তাঁর জীবনের অন্যতম মূল্যবান স্মৃতি।

ছবিটি তোলার গল্প বলতে গিয়ে আলিফ জানান, সময়টা সম্ভবত ১৯৯০ কিংবা ১৯৯১ সাল। তখন তাঁর বয়স ৯ বছর। কলকাতার ৪০০ বছর পূর্তি উপলক্ষে কলকাতা স্টেডিয়ামে একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল। সেখানে সংবর্ধনা দেওয়া হয় রুনা লায়লা, আলাউদ্দীন আলী, ভূপেন হাজারিকা ও লতা মঙ্গেশকরের মতো কিংবদন্তিদের। আলিফের পরিবারও তখন কলকাতার গ্র্যান্ড ওবেরয় হোটেলে উঠেছিল। সেই হোটেলেই রুনা লায়লার মাধ্যমে লতা মঙ্গেশকরের সঙ্গে দেখা করার সুযোগ হয় তাঁদের।

আলিফ আলাউদ্দীন

আলিফের মতে, ‘সম্ভবত ১৯৯০ কিংবা ’৯১ হবে। তখন আমার বয়স ৯ বছর। কলকাতার ৪০০ বছর নিয়ে একটি অনুষ্ঠান হবে কলকাতা স্টেডিয়ামে। সেখানে সংবর্ধনা দেওয়া হয় শ্রদ্ধেয় রুনা লায়লা আন্টি, আব্বু (আলাউদ্দীন আলী), ভূপেন হাজারিকাসহ কিংবদন্তি লতা মঙ্গেশকরকে। মনে আছে, আমরা উঠেছিলাম গ্র্যান্ড ওবেরয় হোটেলে। ওনার সঙ্গে রুনা আন্টির থ্রুতে দেখা করেছিলাম।’

লতা মঙ্গেশকরের সঙ্গে আলিফদের দেখা হয়েছিল ২০ থেকে ২৫ মিনিট। সময়টা দুপুর ১২টা বা সাড়ে ১২টার দিকে বলে মনে করতে পারেন আলিফ। তবে সেই মুহূর্তে তাঁর চেয়ে বেশি উচ্ছ্বসিত ছিলেন তাঁর মা সংগীতশিল্পী সালমা সুলতানা। আলিফ বলেন, ‘আমার তো বয়স তখন কম। আমার চেয়ে আম্মুর এক্সাইটমেন্টটা ছিল অনেক বেশি। আম্মু তাঁর অনেক বড় ফ্যান ছিলেন। আম্মুর থ্রুতে তো আমি লতাজির গান শুনেছি। আম্মুর চোখেমুখে যে অভিব্যক্তি ছিল, ওটা দেখে আমিও খুব এক্সাইটেড ছিলাম।’

আলাউদ্দীন আলীর সঙ্গে সংগীতশিল্পী মেয়ে আলিফ আলাউদ্দীন

তবে বয়স কম হওয়ায় তখন এই মুহূর্তের গুরুত্ব পুরোপুরি উপলব্ধি করতে পারেননি আলিফ। তাঁর ভাষায়, ‘ওটার বিশালতা বোঝার জন্য তো একটা বয়স লাগে। তখন তো একটা বাচ্চা মানুষ। গেছি, ছবি তুলেছি; একজন বড় তারকার সঙ্গে ছবি তুলেছি। এখন আমি বুঝি, আমি কতটা লাকি। এই জীবনে লতাজির মতো একজন ব্যক্তিত্বের সঙ্গে দেখা হয়েছে আমার।’

সেই অনুষ্ঠানে গানও করেছিলেন লতা মঙ্গেশকর, রুনা লায়লা ও ভূপেন হাজারিকা। আর আলিফের বাবা আলাউদ্দীন আলী রুনা লায়লার সঙ্গে সংগীত পরিবেশন করেছিলেন। সব মিলিয়ে সফরটি হয়ে উঠেছিল আলিফের শৈশবের এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়।

সংগীতশিল্পী কাজী ফয়সাল আহমেদ ও আলিফ আলাউদ্দীন।

ছবিটি তোলার মুহূর্তের স্মৃতিও এখনো স্পষ্ট আলিফের মনে। তিনি বলেন, ‘এল সেই মাহেন্দ্রক্ষণ, রুনা আন্টি আমাদের নিয়ে যাবেন কিংবদন্তি লতা মঙ্গেশকরের রুমে। লিফটে আম্মু রুনা আন্টিকে বললেন, “রুনা আপা, আমার খুব নার্ভাস লাগছে।” রুনা আন্টি হাসলেন, বললেন, “ইটস ওকে।” ওনার হোটেল স্যুইটে বসলাম। উনি রুম থেকে বের হতেই সবাই দাঁড়িয়ে গেলাম। কেমন যেন দ্যুতিময় তিনি।’

এরপরই আসে ছবিটি তোলার পালা। আলিফ বলেন, ‘কিংবদন্তি নিজেই তাঁর পাশে আমাকে আদর করে বসালেন, ছবি তুললেন। তানি লায়লা (রুনা লায়লার মেয়ে), সে–ও ছবি তুলল।’

সেই সাক্ষাতের আরেকটি মুহূর্তও আলিফের মনে গভীরভাবে গেঁথে আছে। তাঁর মায়ের ছবি তোলার সময় লতা মঙ্গেশকরের প্রতি তাঁর মা সালমা সুলতানার শ্রদ্ধাবোধ দেখে বিস্মিত হয়েছিলেন তিনি। আলিফ বলেন, ‘লতাজি উঠে দাঁড়াতে যাচ্ছেন, আম্মু তাঁর পাশে দাঁড়িয়ে থাকলেন। ওনাকে উঠতে দিলেন না। আমি অবাক হয়ে দেখলাম, কী অদ্ভুত শ্রদ্ধাবোধ! এটা আমার আব্বু-আম্মু দুজনেরই ছিল।’

আলিফ আলাউদ্দীন

ছবিটি তখন প্রিন্ট করে অ্যালবামে তুলে রাখা হয়েছিল। বহু বছর পর আলিফের স্বামী কাজী ফয়সাল আহমেদ ছবিটি স্ক্যান করেন। এরপর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবিটি প্রকাশ করেন আলিফ। ছবিটি প্রকাশের পর পাওয়া মানুষের প্রতিক্রিয়াই তাঁকে নতুন করে উপলব্ধি করিয়েছে, জীবনের সেই ছোট্ট মুহূর্ত আসলে কত বড় প্রাপ্তি ছিল।
আলিফের মতে, ‘লতাজি নিজেই কিন্তু আমাকে কোলে বসিয়েছিলেন, আমাকে ধরে ছবিটা তুলেছেন। তাঁর মতো একজন কিংবদন্তিকে আমি দেখতে পেরেছি, তাঁর পাশে বসতে পেরেছি, এ অনুভূতি বলে বোঝানোর মতো নয়।’

৯ বছর বয়সে পাওয়া সেই সান্নিধ্যের গুরুত্ব হয়তো তখন বুঝতে পারেননি আলিফ আলাউদ্দীন। তবে সময়ের সঙ্গে সেই মুহূর্তের মূল্য আরও গভীরভাবে উপলব্ধি করেছেন তিনি। লতা মঙ্গেশকরের কোলে বসা ছবিটি তাই তাঁর কাছে আজীবনের জন্য একটি অসাধারণ স্মৃতি হয়ে রয়েছে।