নব্বই দশকের জনপ্রিয় অভিনেতা জাহিদ হাসান পর্দায় যেমন মানুষকে হাসান, কাঁদান ও আবেগে ভাসান, বাস্তব জীবনেও তাঁর রসবোধ কম নয়। দীর্ঘ অভিনয়জীবনে ভক্ত–শুভাকাঙ্ক্ষীরা বিভিন্ন সময় তা দেখেছেন। সম্প্রতি প্রথম আলোর সঙ্গে এক আলাপে নৃত্য ও অভিনয়শিল্পী স্ত্রী সাদিয়া ইসলাম মৌ, সংসার, সন্তান এবং নিজের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে কথা বলতে গিয়ে আবারও রসবোধের পরিচয় দিলেন। হাসতে হাসতে বললেন দাম্পত্যের মজার গল্প, আবার একই সঙ্গে তুলে ধরলেন আড়ালে লুকিয়ে থাকা নিজের কিছু অনুভূতিও।
ফুটবল বিশ্বকাপ এলে সমর্থকদের উন্মাদনায় জাহিদ হাসানও শামিল হন। আর্জেন্টিনার সমর্থক জাহিদ হাসান ছোটবেলা থেকেই ম্যারাডোনার ভক্ত, পরে মুগ্ধ হয়েছেন মেসির খেলায়। তবে এবার তাঁর চাওয়া, পর্তুগাল যেন শিরোপা জেতে। কারণ, বিশ্বের অন্যতম সেরা ফুটবলার ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর হাতে বিশ্বকাপ না দেখলে তাঁর কষ্ট লাগবে। তবে তাঁর স্ত্রী, নৃত্যশিল্পী ও অভিনেত্রী সাদিয়া ইসলাম মৌ ব্রাজিলের সমর্থক। খেলা নিয়ে দুজনের মধ্যে তাই মাঝেমধ্যেই তর্ক হয়। কিন্তু সেই তর্ক বেশি দূর এগোয় না। কারণ হিসেবে জাহিদ হাসান মজার ছলে বলেন, ‘মেয়েদের সঙ্গে কোনো দিন জেতা যায় নাকি?’
এরপর নিজের অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে জাহিদ হাসান বললেন, ‘দেখা গেল, কবে কোন কথা বলছি, সেটা টেনে নিয়ে আসে। আর আমি আধা ঘণ্টা আগে কী বলছি, সেটাই মনে থাকে না। আর ওরা তো ১৯৫২ সালে কী হইছে সেটাও মনে রাখে। আমারে একটু আগে কী বলছে, সেটা পুরোটা মনে রাখতে পারি না, শুধু সিনপসিসটা বলতে পারি।’
কথা প্রসঙ্গে দাম্পত্য জীবনের আরেকটি মজার দিকও তুলে ধরেন এই অভিনেতা। তাঁর ভাষ্য, শুধু ঝগড়ার সময় নয়, প্রায়ই স্ত্রী তাঁকে মনে করিয়ে দেন যে বাস্তব জীবন আর অভিনয় এক জিনিস নয়।
এ প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে জাহিদ বললেন, ‘কাউকে হয়তো বললাম, “খুব সুন্দর লাগতেছে তোমাকে।” তখন বলে, “এই কথাটা সবাইকে বলেন, তাই না ভাইয়া?” আবার মৌয়ের সঙ্গে হয়তো এমনভাবে কথা বলছি, তখন সে বলে, “এভাবে কথা বোলো না, ক্যামেরা নাই এখানে।”’
প্রেমের দৃশ্যের অভিনয়ের কারণে পরিবার থেকেও কম খোঁচা শুনতে হয়নি জাহিদ হাসানকে। তিনি জানান, তাঁর দুই সন্তান পুষ্পিতা ও পূর্ণ ছোটবেলা থেকেই বাবার পেশা নিয়ে নানা মজার মন্তব্য করত। মেয়ে একসময় তাঁকে প্রশ্ন করত, নাটকে যাঁদের ‘আই লাভ ইউ’ বলেন, তাঁদের চেহারা তিনি আদৌ দেখেন কি না। কেন এমন সংলাপ বলতে হয়, সেটাও জানতে চাইত। ছেলেও বিভিন্ন সময়ে একই ধরনের মন্তব্য করেছে। পরিবারের এসব প্রতিক্রিয়া তাঁকে বরং আনন্দই দেয় বলে জানান তিনি।
কথা প্রসঙ্গে নিজের জীবনের একটি ভাবনাও তুলে ধরলেন জাহিদ হাসান। তাঁর মতে, জীবনের সবচেয়ে কঠিন অভিনয়টা ক্যামেরার সামনে নয়, বরং কষ্ট লুকিয়ে স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করা। জাহিদ বললেন, ‘আমার মনে হয়, যখন কষ্টে থাকি, তখন সবচেয়ে বেশি অভিনয় করতে হয়। ছোটবেলায় এক ধরনের কষ্ট ছিল, বিশ্ববিদ্যালয়জীবনে আরেক ধরনের। এখনো আছে। আমি হয়তো একটা মিশন নিয়ে কাজ করছি, সেটা হচ্ছে না। মানুষ এমন আচরণ করছে, যেটা আমার জন্য কোনো কাজে আসছে না। সেই সময়েও মারাত্মক অভিনয় করি। আমি কষ্টে মরে যাচ্ছি, তবু মুখে হাসি রাখার চেষ্টা করি। পরে মসজিদে গিয়ে কাঁদি বা কোথাও একা বসে খারাপ লাগে।’
মানুষকে হাসাতে ভালোবাসেন জাহিদ হাসান। কিন্তু দেশ–বিদেশের বিখ্যাত সব হাসির শিল্পীদের দেখার ক্ষেত্রে তাঁর চিন্তাভাবনা একটু আলাদা। তিনি বলেন, ‘জীবনে এমন কাউকে সামনে পেলে যিনি মানুষকে হাসিতে মাতিয়ে রাখেন, আমি আগে তাঁর দুঃখটা বোঝার চেষ্টা করব। কারণ, আমি সব সময় পেছনের গল্পটা জানার, বোঝার ও দেখার চেষ্টা করি। হাসির আড়ালে যে দুঃখ-কষ্ট থাকে, সেটাই দেখতে খুব ইচ্ছে করে।’