
‘আপনার অভিনয় আমার ভাল্লাগে’—বাটন ফোনের যুগে গভীর রাতে এক তরুণীর এমন ফোন পেয়েই শুরু হয়েছিল অভিনেতা চঞ্চল চৌধুরীর প্রেম ও বিয়ের গল্প। মেয়েটি অবশ্য ভালো লাগার কথা বলেছিলেন তাঁর অভিনয় নিয়ে। কিন্তু চঞ্চলের মনে হয়েছিল, ব্যাপারটা হয়তো শুধু অভিনয়ে আটকে নেই—তাঁকেও হয়তো ভালো লেগেছে ওই তরুণীর!
সেই বিশ্বাস থেকে মাসখানেক ফোনে কথাবার্তা চলে চঞ্চল ও শান্তা চৌধুরীর। এর মধ্যে সামনাসামনি দেখা হয়নি। কিন্তু কথা চলার একপর্যায়ে বিয়ের সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন চঞ্চল। ফোনেই মেয়েটিকে সরাসরি জিজ্ঞেস করেন, ‘তুমি কি আমাকে বিয়ে করবে?’ উত্তরও আসে ইতিবাচক। এরপর আর দেরি করেননি দুজন। নিজেদের সিদ্ধান্তেই বিয়ে করে ফেলেন।
বিয়ের ২০ বছর পূর্ণ হওয়ার পর ২৮ আগস্ট ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে সেই শুরুর গল্পই জানিয়েছেন চঞ্চল চৌধুরী। পোস্টের শুরুতেই লিখেছেন, ‘বিশে বিষক্ষয়!’ বিয়ের আগের সেই সময়ের কথা মনে করে চঞ্চল লিখেছেন, ‘তখন বয়স বেড়ে যাচ্ছিল দ্রুত। বিয়ের জন্য পরিবারের পক্ষ থেকেও চাপ ছিল। বাবা-মা, ভাই-বোন—সবার কাছেই যেন তিনি “পুত্রদায়গ্রস্ত” হয়ে উঠেছিলাম। তাই আমার বিয়ের সিদ্ধান্তে তাই পরিবারেও নেমে আসে আনন্দের ঢেউ।’
চঞ্চলের পরিবারের সবাই আনন্দিত হলেও সবকিছু এত সহজ ছিল না বলেও জানান এই অভিনয়শিল্পী। তিনি লিখেছেন, ‘আমার পরিবার বিয়েতে খুশি হলেও শান্তার পরিবারের কয়েকজন ছিলেন ঘোর অরাজি, কেউবা নিমরাজি। কারণ, শান্তা ছিলেন চিকিৎসক; তাঁর মা–বাবার ইচ্ছা ছিল মেয়ের বিয়ে হোক কোনো চিকিৎসকের সঙ্গেই। অন্যদিকে চঞ্চল তখন অভিনয়ে পরিচিতি পেতে শুরু করেছেন।’
শেষ পর্যন্ত পরিবারের আপত্তি-অনাপত্তির হিসাব খুব একটা না কষেই নিজেদের সিদ্ধান্তে বিয়ে করেন চঞ্চল ও শান্তা। বিয়েটিও হয় দুই দফায়। প্রথম দফায় আইনি প্রক্রিয়ায় কাগজপত্রে বিয়ে, পরে ধর্মীয় অনুশাসন মেনে দ্বিতীয় দফার আনুষ্ঠানিকতা। কিন্তু কীভাবে শুরু হয়েছিল এই সম্পর্ক?
চঞ্চল জানান, শান্তার সঙ্গে তাঁর পরিচয় ২০০৫ সালে। তখন তিনি গ্রামীণফোনের বিজ্ঞাপনচিত্রে কাজ করে পরিচিতি পেতে শুরু করেছেন। চঞ্চলের বড় ভাই পুরান ঢাকার ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজে শিক্ষকতা করতেন। শান্তা ছিলেন তাঁর ভাইয়ের ছাত্রী। সে সময় চঞ্চলের বাবা অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন। বাবাকে দেখতে হাসপাতালে গেলে সেখানেই চঞ্চলকে প্রথম দেখেছিলেন শান্তা। পরে কোনোভাবে তাঁর ফোন নম্বর জোগাড় করে ফোন দেন। শুরু হয় কথাবার্তা। সেই ফোনালাপই ধীরে ধীরে এগিয়ে নেয় সম্পর্ককে। মাসখানেক কথা বলার পর একদিন চঞ্চলই শান্তাকে বিয়ের প্রস্তাব দেন। সামনাসামনি দেখা না হলেও ফোনের কথাবার্তায় তৈরি হওয়া সেই সম্পর্ককে বিয়েতে রূপ দিতে দুজনই রাজি ছিলেন।
চঞ্চলের মতে, ‘মধ্যবিত্ত পরিবারের আর পাঁচজন মা–বাবার মতো আমার বাবা-মাও বিয়ের জন্য চাপ দিচ্ছিলেন। তখনই একদিন শান্তাকে জিজ্ঞেস করি, তুমি কি আমাকে বিয়ে করবে? শান্তাও রাজি হয়ে যায়। ব্যস, এরপর আর সময় নষ্ট না করে বিয়ে করে ফেলি আমরা।’ তবে বিয়ের পরও শ্বশুরবাড়িতে সহজে জায়গা করে নিতে পারেননি চঞ্চল। শান্তার বাবা-মা শুরুতে এই বিয়ে মেনে নিতে পারেননি। তাঁরা মেয়ের জন্য চিকিৎসক পাত্রই চেয়েছিলেন। পরে অবশ্য সময়ের সঙ্গে পরিস্থিতি বদলায়। শান্তার বাবা মারা যাওয়ার পর তাঁর মা জামাই হিসেবে চঞ্চলকে মেনে নেন। এভাবেই শুরু হয়েছিল চঞ্চল ও চিকিৎসক শান্তার সংসার। দেখতে দেখতে সেই সংসার পেরিয়ে গেছে দুই দশক।
২৭ আগস্ট তাঁদের বিয়ের ২০ বছর পূর্ণ হয়েছে। দুই দশকের সংসার নিয়ে চঞ্চল লিখেছেন, ‘কখনো ভাবিইনি যে আমার মতো বাউন্ডুলের সঙ্গে ভদ্রমহিলা এত দিন সংসার করবে!’
চঞ্চল ও শান্তার সংসারে একমাত্র সন্তান শুদ্ধ। ২০ বছর পর পুরোনো সেই গল্প বলতে গিয়ে চঞ্চলের চাওয়া অবশ্য নিজের জন্য নয়। স্ত্রী শান্তা ও ছেলে শুদ্ধের জন্য সবার কাছে দোয়া চেয়েছেন তিনি। একই সঙ্গে জানিয়েছেন, সৃষ্টিকর্তার আশীর্বাদে তাঁরা ভালো আছেন।