নাটকের দৃশ্যে শামস সুমন
নাটকের দৃশ্যে শামস সুমন

‘ও আল্লাহ, ও মা’ বলতে বলতে শেষ! শেষ তিন ঘণ্টায় কী ঘটেছিল

জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারপ্রাপ্ত অভিনেতা শামস সুমন আর নেই। গতকাল মঙ্গলবার (১৭ মার্চ) সন্ধ্যায় রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। তাঁর বয়স হয়েছিল ৬১ বছর। আজ বুধবার বেলা ১১টায় চ্যানেল আই প্রাঙ্গণে তাঁর প্রথম জানাজা সম্পন্ন হয়েছে। পরিবার যুক্তরাজ্য থেকে দেশে ফিরলে রাজশাহীতে পারিবারিক কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হবে। ততক্ষণ পর্যন্ত মরদেহ রাখা হয়েছে রাজধানীর সিএমএইচের হিমঘরে।

গতকাল রাতে শামস সুমনের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়তেই বিনোদন অঙ্গনে নেমে আসে শোকের ছায়া। সহকর্মী ও ভক্তদের অনেকেই শোকে স্তব্ধ হয়ে পড়েন। সামাজিক মাধ্যমে আবেগঘন স্মৃতিচারণায় ভরে ওঠে টাইমলাইন। কেউ লিখেছেন, ‘এভাবে চলে যাওয়ার কথা না’, কেউ বলছেন, ‘শেষবার দেখা হলো না’। আবার অনেকেই জানাচ্ছেন, অল্প কিছুদিন আগেও তাঁকে তুলনামূলক সুস্থই দেখেছেন। ফলে প্রশ্ন উঠছে, হঠাৎ কী ঘটেছিল?

এ প্রশ্নের উত্তর মিলছে শামস সুমনের জীবনের শেষ কয়েক ঘণ্টার ঘটনাপ্রবাহে, যা এখন সহকর্মীদের কাছে হয়ে উঠেছে এক বেদনাদায়ক স্মৃতি।
অভিনেতা আবুল কালাম আজাদ জানান, বিকেল পৌনে চারটার দিকে ভিডিও কলে কথা হয়েছিল শামস সুমনের সঙ্গে। তখনই তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি। ‘আমি বলছিলাম, এখনই হাসপাতালে যেতে হবে। না গেলে আমি লোক দিয়ে পাঠাব। সে বলছিল, যাচ্ছি, যাচ্ছি। কিন্তু বুঝিনি—এই যাওয়াটাই শেষ হয়ে যাবে,’ বলেন আজাদ। তাঁর কণ্ঠে ছিল গভীর শোক—‘বন্ধু পাওয়া কঠিন, কিন্তু বন্ধুকে হারানো আরও কঠিন। এটা মেনে নেওয়া যায় না।’

বিকেল গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে শামস সুমনের শারীরিক অবস্থার অবনতি হয়। পাঁচটার পরপরই তাঁকে দ্রুত রাজধানীর গ্রিন রোডের একটি বেসরকারি হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে পৌঁছেও তিনি সচেতন ছিলেন—নিজের পায়ে হেঁটে চলাফেরা করেছেন, আশপাশের মানুষের সঙ্গে কথা বলেছেন।

হাসপাতালে উপস্থিত অভিনেতা মাসুদ রানা মিঠু বলেন, ‘আমি গিয়ে দেখি ভাইকে এমআরআই রুমে নেওয়া হয়েছে। কিছুক্ষণ পর নিজেই হেঁটে বের হয়ে এলেন। আমাদের দিকে তাকিয়ে হাসলেন। আমরা বললাম, ভাই আমরা আছি। উনি বললেন, আচ্ছা। তখন তো মনে হয়নি, এত বড় কিছু ঘটতে যাচ্ছে।’

অভিনেতা শামস সুমন

কিন্তু সেই স্বাভাবিকতার মধ্যেই হঠাৎ নেমে আসে বিপর্যয়। এমআরআই শেষে ড্রেসিংরুমে পোশাক পরিবর্তনের সময় আচমকা মেঝেতে লুটিয়ে পড়েন শামস সুমন। সঙ্গে সঙ্গে উপস্থিত সহকর্মীরা ছুটে যান। কয়েকজন মিলে তাঁকে তুলে ধরার চেষ্টা করেন। তখন তিনি কাতর স্বরে ‘ও আল্লাহ, ও মা’ বলতে বলতে নীরব হয়ে যান।

দ্রুত শামস সুমনকে জরুরি বিভাগে নেওয়া হয়। শুরু হয় চিকিৎসকদের প্রাণপণ চেষ্টা। প্রায় ৪০ মিনিট ধরে চলে সেই লড়াই। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আর তাঁকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়নি। সন্ধ্যা ৬টা ৪৩ মিনিটে চিকিৎসকেরা তাঁর মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেন। পরে জানা যায়, হৃদ্‌যন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে (কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট) তাঁর মৃত্যু হয়েছে।
এই আকস্মিক মৃত্যু মানতে পারছেন না শামস সুমনের সহকর্মীরা। তাঁদের অনেকেরই কথা, ‘কিছুক্ষণ আগেও যিনি হেঁটে কথা বলছিলেন, তিনিই হঠাৎ নেই—এটা বিশ্বাস করা কঠিন।’

জীবনের শেষ সময়টা শামস সুমনের জন্য সহজ ছিল না। দীর্ঘদিন কাজের বাইরে থাকা, শারীরিক জটিলতা এবং একধরনের ব্যক্তিগত নিঃসঙ্গতা তাঁকে ঘিরে ছিল। স্ত্রী ও সন্তানেরা ছিলেন দেশের বাইরে। তবু তাঁর ইচ্ছা ছিল আবার কাজে ফেরার—ক্যামেরার সামনে দাঁড়ানোর।

নাটকের দৃশ্যে শামস সুমন

নব্বইয়ের দশকে টেলিভিশন নাটকের জনপ্রিয় মুখ শামস সুমন মঞ্চ, ছোট পর্দা ও চলচ্চিত্র—সব মাধ্যমেই কাজ করেছেন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আবৃত্তি সংগঠন ‘স্বনন’ দিয়ে তাঁর সাংস্কৃতিক যাত্রা শুরু। পাশাপাশি স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনেও সক্রিয় ছিলেন তিনি।

জীবনের শেষ বিকেল পর্যন্ত যিনি হেঁটে বেরিয়ে এসে সহকর্মীদের দিকে তাকিয়ে হাসতে পেরেছিলেন, কয়েক ঘণ্টার মধ্যে তাঁর নিথর হয়ে যাওয়া—এ বাস্তবতা এখনো মেনে নিতে পারছেন না তাঁর কাছের মানুষেরা। তাঁদের ভাষায়, ‘এভাবে জীবিত একজন মানুষকে হারিয়ে ফেলা—এটা মেনে নেওয়া সত্যিই কঠিন।’