
ছবিটা প্রথমে মনোযোগ দিয়ে দেখুন। তারপর চোখ বন্ধ করে ভাবুন। কল্পনায় জনবসতির শেষ প্রান্তের এই সেতুতে আস্তে আস্তে উঠে পড়ুন। এরপর হাঁটতে থাকুন। সামনে পাথুরে পাহাড়। সেতুর ওপর ধান বা কাপড় শুকাতে দেখলে ভড়কে যাবেন না। এটি সেতুই। তবে দুপাড়কে সংযুক্ত করেনি তা। অভাবিতভাবে পাহাড়ের সঙ্গে মানুষের মিতালি গড়ে তুলেছে। তবে কি পাহাড়ে ওঠার জন্যই তৈরি হয়েছে এই সেতু?
আসলে ছবিটা ভালোভাবে দেখার পর ওপরের প্রশ্নটি আর প্রশ্ন থাকা উচিত নয়। একটা সেতু শেষ হচ্ছে পাহাড়ের পাদদেশে। সেদিকে মানুষের টিকি পর্যন্ত নেই, বাড়িঘর তো দূর অস্ত। শুধু আছে নিবিড় গাছপালা। পুরো বিষয় অবলোকনের পর মনে হবে, পাহাড় তথা প্রকৃতির প্রতি এ দেশের মানুষের হৃদ্যতা সৃষ্টির জন্যই বোধ হয় কোটি কোটি টাকা খরচ করে তৈরি হয়েছে এ সেতু! এমন মৌলিক ভাবনা এ গ্যালাক্সিতে আর কেউ ভাবতে পেরেছে? জানা থাকলে উদাহরণ দিন তো। দেখি কত দম!
এই বিশ্বে নানা ধরনের আশ্চর্য স্থাপনা আছে। সেসবের ঘটা করে ভিন্ন ভিন্ন তালিকা হয়। কেউ করে সাত আশ্চর্যের বা আট আশ্চর্যের তালিকা, কারও আবার আশ্চর্যের তালিকার সংখ্যা ১০ পেরিয়ে যায়। তবে শৈশব থেকে আমরা সপ্তাশ্চর্যের তালিকা শুনে বড় হয়েছি। তাই সাতটি আশ্চর্যের তালিকার প্রতি একধরনের মুগ্ধতা আছে। তার ওপর আবার সাত হলো ‘লাকি সেভেন’। এমন একটা পাহাড়মুখী বা পাহাড়ে ওঠার ‘ডাইরেক্ট’ সেতুকে কি আনলাকি নম্বর বরাদ্দ করা যায়? তাই এই স্থাপনা কেন সপ্তম আশ্চর্য হবে না—সে প্রশ্ন জোরেশোরে ওঠা উচিত। প্রয়োজনে এ নিয়ে একধরনের মহাজাগতিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।
যে সেতু নিয়ে এত কথা, তার বিবরণ সংক্ষেপে দেওয়া যাক। সংবাদমাধ্যমের খবরে প্রকাশ, বান্দরবানের রুমা উপজেলার পলিকা খালের ওপর এই ‘বিশেষায়িত’ সেতু নির্মাণ করা হয়েছে। সেতুর কারিগর স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)। ৪ কোটি ১৪ লাখ টাকা খরচ হয়েছে এই সেতুতে। পলিকা খালের মতো বান্দরবানের শহরতলির বিক্রিছড়ার ওপর নির্মিত হয়েছে আরেকটি সেতু। সেটি নির্মাণ করেছে পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড। সেটি তৈরিতে ব্যয় হয়েছে ২ কোটি ৪৩ লাখ টাকা। সাড়ে ছয় কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা এ দুই সেতু কোনো কাজে আসছে না! ব্যবহৃত হচ্ছে ধান ও কাপড় শুকাতে।
আচ্ছা, ধান ও কাপড় শুকানোও তো দরকারি কাজ, নাকি? সেই কাজে যদি সেতু দুটি ব্যবহৃত হয়েই থাকে, তবে অন্তত উপযোগিতা একেবারেই নেই, তা কি বলা যায়?
আসলে আমরা নেতিবাচক ভাবনা বেশি ভাবি। সেতু দিয়ে যে পারাপার হতেই হবে, এমন তো কোনো কথা নেই। আমাদের দেশে যে সেতুর বহুবিধ ব্যবহার উদ্ভাবন করার নিরন্তর চেষ্টা চলছে, সেটিকে কি স্বাগত জানানো উচিত নয়? এ দেশের কোনো সেতুতে ধান-কাপড় শুকানো হচ্ছে, কোনো সেতু আবার তৈরি হচ্ছে খেতের মধ্যে, হয়তো কৃষকদের সুবিধার জন্য! এই যে ধরুন, নতুন এই বান্দরবানের সেতু তো স্রেফ সেলফি তোলার জন্য ব্যবহার করলেও সে-ই হবে। আবার বাড়তি হিসেবে আছে পাহাড়ে ওঠার সুবর্ণ সুযোগ। এখন শুধু পাহাড়ে স্বয়ংক্রিয় সিঁড়ি বা লিফট বানিয়ে দিলেই মাথায় উঠে যাওয়া যাবে চোখের পলকে।
মানুষ একদিন জনবসতি গড়ে তুলবে, সেই আশাতেই আগেভাগে সেতু তৈরির একটা ভাবনা কাজ করেছে বলে মনে হচ্ছে। এমন দূরদর্শিতা কিন্তু সত্যিই বিরল! এসব পটভূমির কারণেও এই স্থাপনার কথা বিশ্বমঞ্চে জোর গলায় জানিয়ে দেওয়া উচিত।
সংবাদমাধ্যমের খবরে আরও একটি বিষয় বোঝা গেছে। তা হলো এ দেশের কতিপয় মানুষের ‘অস্বাভাবিক’ দূরদর্শিতা। সংশ্লিষ্ট কর্তাব্যক্তিরা বলছেন, সেতুটি হওয়ায় শহর সম্প্রসারণ হয়ে পূর্ব পাশে জনবসতি হবে। মানুষের বসবাস গড়ে উঠলে সড়কও করতে হবে। অর্থাৎ মানুষ একদিন জনবসতি গড়ে তুলবে, সেই আশাতেই আগেভাগে সেতু তৈরির একটা ভাবনা কাজ করেছে বলে মনে হচ্ছে। এমন দূরদর্শিতা কিন্তু সত্যিই বিরল! এসব পটভূমির কারণেও এই স্থাপনার কথা বিশ্বমঞ্চে জোর গলায় জানিয়ে দেওয়া উচিত। তবে আমাদের মুখসহ আরও অনেক কিছু ‘ফরসা’ (মানে উজ্জ্বল) হয়ে উঠবে। এতটাই উজ্জ্বল হবে যে বাত্তি জ্বালাতে আর বিদ্যুৎ লাগবে না!
বিখ্যাত লেখক ও কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় একদা এক কবিতায় জানিয়েছিলেন, ‘অনেক দিন থেকেই আমার একটা পাহাড় কেনার শখ’। তবে পাহাড় কে বিক্রি করে, তা তিনি জানতেন না। তিনি যদি সেতুসহ এমন এক সুজলা-সুফলা পাহাড় পেতেন, নিশ্চয়ই খুব খুশি হতেন। হয়তো সুনীলের কবিতাও এই পাহাড়মুখী সেতু নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ অনুপ্রেরণা। এ বিষয় কি একটু অনুসন্ধান করে নিশ্চিত হওয়া যায়? তথ্য হিসেবে কিন্তু বিষয়টি মন্দ হতো না।
সে যা-ই হোক, সময় পেলে একবার নাহয় ঘুরে আসা যাবে পলিকা খাল থেকে। নিশ্চয়ই এই ‘অপরূপ’ স্থাপনাকে ট্যুরিস্ট স্পট তৈরির দূরদর্শিতা অন্য কেউ দেখাবে। একদিন হয়তো সেলফি স্টিক আর মোবাইল ক্যামেরায় মুখরিত হয়ে উঠবে সেতুটি। তখন কেউ আর বলতে পারবে না, এটি মানুষের কোনো কাজে আসছে না!
কবি পূর্ণেন্দু পত্রী লিখেছিলেন, ‘...আমাদের অভ্যন্তরে স্রোতস্বিনী আছে, সেতু নেই।’ তবে ওপরের ছবিটি দেখার পর নিশ্চয়ই কবি পঙ্ক্তি বদলে দিতেন। লিখতেন, ‘স্রোতস্বিনী থাকুক আর না থাকুক, আমাদের সেতু আছে, সেতু আছে, গন্ডায় গন্ডায় সেতু আছে!’