টা ট কা র স

অনেক ভুলের হয় না ক্ষমা, বললে স্যরি

আমি মানুষটা খুব নরম প্রকৃতির। কারও ওপর রাগ পুষে রাখি না। তবে জীবনে কিছু মানুষের সঙ্গে দেখা হবে, যাদের প্রতি চাইলেও রাগ ভুলতে পারবেন না। আমার জীবনেও এমন কিছু মানুষ আছে।

ছোটবেলার ঘটনা। তখন আমি ক্লাস থ্রিতে পড়ি। একদিন টিফিন পিরিয়ডে ব্যাগ থেকে টিফিন বের করতে গিয়ে দেখি, বক্সটাই নেই। অথচ সেদিন শখ করে টিফিনে স্যান্ডউইচ নিয়ে গিয়েছিলাম। নইলে প্রতিদিন তো সেই ডিমভাজি আর রুটিই জুটত কপালে!

সেদিন সবাই যখন টিফিন খেতে ব্যস্ত, আমি তখন পুরো ক্লাসে চিরুনি তল্লাশি চালাচ্ছি। কিন্তু টিফিন বক্সের কোনো হদিস নেই। পরে জানতে পারলাম, আমার বন্ধু মাইশা প্রথম পিরিয়ডেই আমার ব্যাগ থেকে টিফিন বক্স মেরে দিয়ে উদরপূর্তি করেছে। বন্ধুত্বের এমন নমুনা দেখার পর আর শত্রুর দরকার কী!

আরেকটা ছেলে ছিল, নাম সাকিব। সে যা করেছিল, সেটা এখনো ভাবলে কান্না পায়।

তখন আমার ঘন, লম্বা চুল। চুলে নানা রকম রং-ঢং করে টিউশন পড়তে গিয়েছি। স্যার ক্লাস নিচ্ছিলেন, হঠাৎ সেই বদমাশ আমার চুলে চুইংগাম লাগিয়ে দিল। এমনভাবে লাগাল যে আমার সেই শখের লম্বা, ঘন চুল আর বাঁচানো গেল না। বাসায় ফেরার পর বাবা নাপিতের কাছে নিয়ে গিয়ে সব চুল কেটে দিতে বললেন।

আসলে জীবনে এমন অনেক ঘটনাই ঘটে, যেগুলো আমরা ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখার চেষ্টা করি। এই মানুষগুলোও একসময় আমার কাছে ক্ষমা চেয়েছে বটে। কেউ বলেছে, ‘ইচ্ছা করে করিনি।’ কেউ বলেছে, ‘তখন বুঝিনি।’ কেউ আবার সরাসরি বলেছে, ‘স্যরি!’

এরপর টাক মাথা নিয়ে সহপাঠীদের হাসাহাসির ইতিহাস আর নাই–বা বললাম। একটা চুইংগামের জন্য যে এত বড় মূল্য দিতে হবে, সেটা তখন বুঝিনি। একটা বদমাইশ বন্ধু, সারা জীবনের কান্না।

যখন একটু বড় হলাম, স্কুলে আমার চেয়ে তিন বছরের এক সিনিয়র ভাইয়া ছিলেন। কী যে ভালো লাগত তাকে! একবার সে আমাকে চকলেট আর গোলাপ ফুল উপহার দিয়েছিল। উপহারের প্যাকেটটা পর্যন্ত যত্ন করে রেখে দিয়েছিলাম। কিন্তু কী লাভ!

কিছুদিন পরই দেখি, আমারই বেস্ট ফ্রেন্ড তিশা আর সেই ভাইয়া প্রেম করে বেড়াচ্ছে। ওদের একসঙ্গে দেখলে বুকটা হুঁ হুঁ করে উঠত। বন্ধুত্ব আর ভালোবাসা—দুই জায়গাতেই এমন ডাবল ধাক্কা খাওয়ার পর মানুষ আর কাকে বিশ্বাস করবে!

বড় হওয়ার পর একটা চাকরিতে ঢুকলাম। সবকিছু ভালোই চলছিল। কাল হলো এক তেলবাজ। বসকে এমন তেল দিল যে আমার বদলে প্রমোশনটা পেয়ে গেল সেই তেলবাজ মোখলেস।

ভেবেছিলাম, প্রমোশনটা হলে একটা স্কুটি কিনব। কিন্তু স্কুটি তো দূরের কথা, আমি যে মোখলেসকে অপছন্দ করি, সেটা টের পেয়ে সে বসের কাছে আমার নামে এমন দুর্নাম করল যে শেষ পর্যন্ত চাকরিটাই হারাতে হলো। 

আসলে জীবনে এমন অনেক ঘটনাই ঘটে, যেগুলো আমরা ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখার চেষ্টা করি। এই মানুষগুলোও একসময় আমার কাছে ক্ষমা চেয়েছে বটে। কেউ বলেছে, ‘ইচ্ছা করে করিনি।’ কেউ বলেছে, ‘তখন বুঝিনি।’ কেউ আবার সরাসরি বলেছে, ‘স্যরি!’

কিন্তু আপনারাই বলেন, স্যরি বললেই কি সব সমস্যার সমাধান হয়ে যায়?

যে টিফিন খেয়ে ফেলেছিল, সে কি পেরেছে আমার স্যান্ডউইচটা ফিরিয়ে দিতে? যে চুল কেটে ফেলার ব্যবস্থা করেছিল, সে কি আমার সেই চুল ফিরিয়ে দিতে পারবে? যে প্রেমটা কেড়ে নিয়েছে, সে কি সেই গোলাপ আর চকলেটের দিনগুলো ফিরিয়ে দিতে পারবে? আর মোখলেস? ওর কথা আর কী বলব!

কিন্তু ওই যে বললাম, আমি মানুষটা নরম প্রকৃতির। দুই দিনের জীবনে তিন দিনই কি আর রাগ পুষে রাখা যায়। তাই ঠিক করেছি, ওদেরও একদিন ক্ষমা করে দেব। ওরা সবাই থাকুক সুখে, আগুন জ্বলুক আমার বুকে।