যা পি ত র স

গবেষণায় প্রমাণিত

অনেক আগে ফেসবুকে একটা লেখা পড়েছিলাম। লেখাটা ছিল এ রকম—

‘গবেষণায় প্রমাণিত, যে লেখার শুরুতে “গবেষণায় প্রমাণিত” শব্দটা লেখা থাকে, সেটা বেশির ভাগ সময়ই ভুল হয়।’

বাক্যটি পড়ার পর আমি চিন্তায় পড়ে গেলাম। কারণ, এই কথা যদি সত্যি হয়, তাহলে এটাও ভুল। আর যদি ভুল হয়, তাহলে কথাটা সত্যি। মোটকথা, বিষয়টা এমন এক জায়গায় গিয়ে দাঁড়ায়, যেখানে গবেষক, পাঠক এবং যুক্তিবিদ তিনজনই একসঙ্গে মাথা চুলকাতে থাকে।

পৃথিবীতে ‘গবেষণায় প্রমাণিত’ উল্লেখ করে যত লেখা আছে, তার বড় একটা অংশই কোনো গবেষণা ছাড়াই লেখা হয়েছে বলে আমার দৃঢ় সন্দেহ। বলা যায়, বাঙালি জাতির একধরনের গবেষণাপ্রীতি আছে। কোনো লেখার শুরুতে ‘গবেষণায় প্রমাণিত’ দেখলেই তারা লেখাটাকে বিশ্বাস করে ফেলে। সেই গবেষণা আসলেই হয়েছে কি না, কোথায় হয়েছে, কে করেছে, গবেষণার নমুনা কতজন ছিল—এসব জানার প্রয়োজন তারা বোধ করে না।

মজার বিষয় হলো, বাঙালির সবচেয়ে পছন্দের শব্দগুলোর একটি ‘গবেষণা’, অথচ সবচেয়ে অপছন্দের কাজগুলোর একটি হলো ‘গবেষণা করা’।

অমুকের ছেলের সঙ্গে তমুকের মেয়েকে কথা বলতে দেখা গেছে? নির্ঘাত প্রেম।

তমুকের বুকে ব্যথা? অবশ্যই গ্যাস্ট্রিক।

পাশের বাসার লোকটা সারা দিন ঘরে থাকে? নিশ্চিত কোনো সন্দেহজনক কাজে জড়িত।

এখানে গবেষণার দরকার নেই। অনুমানই যথেষ্ট।

তবে এর মাঝেও হুটহাট দু–একজন গবেষক বের হয়ে যায়। যেমন আমার খালাতো ভাই সজিব।

একসময় হঠাৎ দেখি, ছেলেটা কারও সঙ্গে তেমন কথা বলে না। সারা দিন কী যেন চিন্তা করে। খুঁজতে গেলে দেখা যায় হয় জঙ্গলে বসে আছে, নয়তো লাইব্রেরিতে বই পড়ছে। মোটা মোটা খাতা ভরে কী সব লিখছে। কাউকে কিছু খুলে বলে না। জিজ্ঞেস করলে রহস্যময় হাসি দিয়ে এড়িয়ে যায়।

আমরা ভাবলাম, ছেলেটা নিশ্চয়ই বড় বিজ্ঞানী হবে।

পরে যেদিন পুলিশ তাকে ধরে নিয়ে গেল, সেদিন তার গবেষণার বিষয়টা আমরা জানতে পারলাম।

সে নাকি কয়েক বছর ধরে গবেষণা করছিল—কীভাবে নিমগাছের সঙ্গে কলম করে গাঁজাগাছ তৈরি করা যায়। যাতে মানুষ নিমপাতা খেলেও গাঁজা খাওয়ার অনুভূতি পায়।

সেদিন বুঝলাম, গবেষণারও একটা সীমা থাকা উচিত।

যা–ই হোক, গবেষণাবিমুখ এই জাতি যখন গবেষণা করতে যায়, তখনই মাঝে মাঝে বিপত্তি বাধে।

কিছুদিন আগে একটি সংবাদে দেখলাম—চুরি ও অনিয়ম ধরা পড়ায় বাংলাদেশি গবেষকদের ৩২৫টি গবেষণাপত্র প্রত্যাহার করা হয়েছে।

তাঁরা আবার সাধারণ কেউ নন। নর্থ সাউথ, ড্যাফোডিল, ঢাবির মতো দেশের নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-গবেষক। কেউ অন্যের গবেষণা থেকে কপি করেছেন, কেউ গুগল থেকে তুলেছেন, কেউ হয়তো এমনভাবে লিখেছেন যে পুরোনো গবেষণার সঙ্গে হুবহু মিলে গেছে।

একজন শিক্ষকেরই নাকি ২৬টি গবেষণাপত্র প্রত্যাহার করা হয়েছে।

আমার মতে, তিনি এখন চাইলে ‘গবেষণাপত্র প্রত্যাহারের ইতিহাস ও দর্শন’ বিষয়ে পিএইচডি করতে পারেন।

এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে যেহেতু কপি-পেস্ট বিষয়ে এত দক্ষ মানুষ আছেন, তাই তাঁদের অভিজ্ঞতাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া যেতে পারে।

নতুন একটি বিভাগ খোলা হোক—

Department of Advanced Copy-Paste Engineering

প্রস্তাবিত কোর্সসমূহ:

■ CP-101: Introduction to Ctrl+C

■ CP-102: Intermediate Ctrl+V

■ CP-201: Citation Inflation and Advanced Name Dropping

■ CP-301: How to Look Busy in Google Scholar

■ CP-401: Plagiarism Detection থেকে পালানোর কৌশল

■ CP-499: Thesis Copy & Paste Project

ফাইনাল পরীক্ষায় ছাত্রদের একটি গবেষণাপত্র দেওয়া হবে। তারা যত কম শব্দ পরিবর্তন করে সেটাকে নিজের নামে জমা দিতে পারবে, সে তত বেশি নম্বর পাবে।

তবে শুধু বাংলাদেশ নয়, সারা পৃথিবীতেই আজব গবেষণার অভাব নেই।

প্রতিদিনই দেখি এমন সব শিরোনাম—

‘তরুণদের মাঝে কেন বাড়ছে পরকীয়া? কী বলছে গবেষণা।’

‘মানুষের ত্বকের সৌন্দর্য বাড়াতে কার্যকর হতে পারে ব্যাঙের মূত্রথলি, বলছে গবেষণা।’

‘সকালে তিনবার হাঁচি দিলে প্রেমে সফল হওয়ার সম্ভাবনা ১৭.৩ শতাংশ বাড়ে—দাবি গবেষকদের।’

‘যারা বালিশের ঠান্ডা পাশ খুঁজে ঘুমায় তারা নাকি বেশি বুদ্ধিমান।’

এইসব গবেষণা কারা করে, কোথায় করে, কেন করে—সেটা নিয়ে আরেকটা গবেষণা হওয়া দরকার।

এরপর আরেকটা খবর দেখলাম—

গবেষণার টাকা নিয়েও প্রতিবেদন জমা দেননি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৫৮ শিক্ষক।

এই সংবাদ পড়ে আমি কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে ছিলাম।

গবেষণা না করেও গবেষণার টাকা পাওয়া যায়—এটা তো গবেষণার জগতের এক নতুন দিগন্ত!

আমার ধারণা, প্রতিবেদন জমা না দেওয়ার পেছনেও নিশ্চয়ই গভীর গবেষণা আছে। হয়তো তাঁরা গবেষণা করছিলেন, ‘প্রতিবেদন না দিলে কী হয়?’

ফলাফল এখনো প্রকাশিত হয়নি।

সবশেষে একটা কথা।

এই যে গবেষণা নিয়ে আমি এত বড় লেখা লিখলাম, এটা কিন্তু কোনো গবেষণা ছাড়াই লিখেছি।

আমি কোনো তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করিনি, নমুনা নির্বাচন করিনি, পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করিনি—এমনকি গবেষণাপদ্ধতি অধ্যায়ও লিখিনি।

তাহলে গবেষণা ছাড়া এত বড় লেখা কীভাবে লিখলাম?

সেটাই তো আসল রহস্য।

দেখি, আপনারা গবেষণা করে বের করতে পারেন কি না।