এক লেখক মারা গেছেন। স্বর্গের প্রহরী তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আপনার পেশা?’
‘লেখক।’
স্বর্গের প্রহরী কাগজপত্র দেখে বললেন, ‘জীবনে কী কী অর্জন করেছেন?’
লেখক বললেন, ‘তিনটি উপন্যাস, দুটো গল্পগ্রন্থ, রাষ্ট্রীয় সাহিত্য পুরস্কার আর অসংখ্য প্রবন্ধ।’
স্বর্গের প্রহরী মুগ্ধ হয়ে বললেন, ‘চমৎকার! পৃথিবীতে আপনার পরিবার আপনাকে নিয়ে নিশ্চয়ই খুব গর্বিত ছিল।’
লেখক মাথা নিচু করে বলল, ‘না। তারা ভাবত আমি বেকার।’
স্বর্গের প্রহরী কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, ‘ঠিক আছে। আপনি ভেতরে আসুন। এখানে কেউ আপনাকে জিজ্ঞেস করবে না, ‘‘এগুলো করে মাসে কত টাকা পান?’”
এ পর্যন্ত লিখে অমিতাভ স্থির হয়ে আছে। রান্নাঘর থেকে বড় খালা আর মায়ের কথা শোনা যাচ্ছে। বড় খালা মাকে বললেন, ‘তোর ছেলেটাকে চাকরিতে ঢোকা।’
মা বললেন, ‘ও তো কাজ করে।’
বড় খালা অবাক হয়ে বললেন, ‘কী কাজ করে!’
‘লেখে।’
বড় খালা বিরক্ত হয়ে বললেন, ‘এসব করে সংসার চলে?’
‘চলে।’
‘কীভাবে?’
‘তার লেখা বই বের হয়, লেখার টাকা পায়, বিভিন্ন জায়গায় কাজও করে।’
বড় খালা উদাস গলায় বললেন, ‘তা হলে তো ভালোই। তবে চাকরি থাকলে ছেলেটার জীবন গোছানো হতো।’
অমিতাভের বয়স ৪৮ বছর। তাঁর ট্রিপল মাস্টার্স আর পিএইচডি ডিগ্রি আছে, সাহিত্যে রাষ্ট্রীয় পুরস্কার আছে, জাতিসংঘের প্রকল্পে কাজ করার অভিজ্ঞতা আছে, দেশে-বিদেশে বক্তৃতা দেওয়ার আমন্ত্রণ আসে, তাঁর লেখা গল্প স্কুলের পাঠ্যবইয়ে ছাপা হয়েছে। বইয়ের তাক ভরে আছে তাঁর নিজের লেখা বইয়ে; কিন্তু আত্মীয়স্বজনের কাছে এসবের ভেতরও বড় ঘাটতি আছে—তার অফিস নেই, চাকরি নেই।
সমাজে সফল মানুষ চেনার নিয়ম বেশ সহজ। কেউ সরকারি চাকরি করলে সফল, ব্যাংকার হলে সফল, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালে সফল, সেনাবাহিনীর অফিসার হলে সফল, প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক হলেও সফল। কারণ, তাঁদের প্রত্যেকের নির্দিষ্ট পরিচয় আছে—তারা কোথাও চাকরি করেন। ‘আমার ছেলে ব্যাংকে চাকরি করে’, ‘মেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ায়’, ‘মেয়ের জামাই আর্মির অফিসার’, ‘বউমা ইশকুলের শিক্ষক’—এই কথার পর আর কোনো ব্যাখ্যা লাগে না; কিন্তু ‘আমার ছেলে লেখে’—এই কথার পর প্রশ্ন আসে, ‘কী লেখে?’ যেন সাহিত্যচর্চা কোনো কাজ নয়।
একদিন অমিতাভ বড় খালার বাড়িতে নিজের লেখা কয়েকটা বই নিয়ে গেছে। বড় খালা বইগুলো দেখে বললেন, ‘এগুলো কী?’
‘আমার লেখা বই।’
‘ভালো।’
অমিতাভ ভাবল, এবার হয়তো ইতিহাস বদলাবে। বড় খালা নিজের ছেলেকে দেখিয়ে বললেন, ‘একটা বই ওকে দিস। ওর কাজে লাগবে।’
‘কোন বইটা দেব?’
‘যেটাতে চাকরি পাওয়ার কথা আছে।’
অমিতাভ চুপ করে আছে। তার কোনো বইতে চাকরি পাওয়ার কথা নেই। বড় খালা শুনে বললেন, ‘তাহলে এত বই লিখে কী লাভ?’
অমিতাভ কিছু বলার আগেই বড় খালা পরামর্শ দিলেন, ‘তুই একটা চাকরির বই লিখে ফেল। তাতে জীবনে তুই যা করতে পারিসনি, তোর লেখা বই পড়ে অন্যরা তা করতে পারবে।’
অমিতাভ বুঝতে পারল, বড় খালা তাকে ‘চাকরি পাওয়ার এক হাজার একটা কৌশল’, ‘৩০ দিনে চাকরি পাওয়ার সহজ উপায়’ টাইপ বই লিখতে পরামর্শ দিচ্ছেন। বড় খালা তাকে ঠিক ব্যর্থ মনে করেন না। ব্যর্থ মনে করলে পরামর্শ দিতেন না। তিনি তাঁকে অসম্পূর্ণ মনে করেন। আটচল্লিশ বছর বয়সে এসে অমিতাভ বুঝতে পারল, আত্মীয়স্বজনের চোখে ব্যর্থ হওয়া যতটা সহজ, সম্পূর্ণ হওয়া তার চেয়েও কঠিন। কারণ, সেই সম্পূর্ণতা আসে একটি বাক্যে ‘সে চাকরি করে।’
অমিতাভের স্ত্রীকে ছিনতাইকারী ধরেছে। তার কাছে কোনো টাকা পাওয়া যায়নি। ছিনতাইকারী বলল, ‘তোর স্বামী কী করে?’
‘লেখে।’
‘ও, তার মানে কিছু করে না। যা ভাগ।’
অমিতাভ সিদ্ধান্ত নিয়েছে, আজ থেকে সে নিজের পরিচয় দেবে, ‘চাকরি না করা মানুষ’।