চ ল তি র স

বিশ্বকাপ একটি সংখ্যাতত্ত্বমাত্র

আঁকা: মায়ীশা তাহ্সিন
আঁকা: মায়ীশা তাহ্সিন

সেদিন সকালে বউকে জানালাম, আজ অফিসে যাব না। ঠান্ডা স্বরে বলল, ‘কেন? শরীর খারাপ তোমার?’

‘না। আজ ব্রাজিল হারছে।’

চোখ কপালে তুলে, ‘ওমা! তুমি ব্রাজিল!’

‘আরে বস তো ব্রাজিলভক্ত। আজ তার দাঁতের বাগান বের হবে না। তার মলিন মুখ আমার কিছুতেই সহ্য হবে না।’ শুনে বউ বলল, ‘এ জন্যই তোমাকে আজ যেতে হবে। তুমি না বলো, সহকর্মী মানে সহমর্মী। এই তোমার মানবিকতার নমুনা! ছি ছি! আর ওই ফিফার বাচ্চা! আরেকটা দলকে এমন দুর্বল টিমের সাথে ফেলায়! চ্যালচ্যালাইয়া জেতে...।’ তাকে অনএয়ারে রেখেই বললাম, ‘তুমি না ফ্রান্স! তোমার দলের সাথে পড়লে এমনিতেই প্যাকেট...।’

‘হ। যার হিসাব তার কাছে।’ বলে তার মোবাইল এগিয়ে ধরে বলল, ‘এরে দেখলেই দানব দানব লাগে। দলটাকে নাকানিচুবানি দিছে একেবারে।’

‘আজিব। তোমার মায়াকান্না কেন?’

‘হ, ওইটা তুমি বুঝবা না। আর্জেন্টিনার সমর্থকেরা যেইভাবে সারা দিন ট্রল করবে। এই জ্বালায় ব্রাজিলিয়ানরা অনলাইনেই আসবে না। আর আমার পোস্টেও লাইক কম পড়বে।’ বলে সে মোবাইল দেখিয়ে বলল, ‘দেখো, মাহী কী পোস্ট দিছে। ফাজিল!’

মাহীর পোস্ট, ‘হলুদের বুকে লাল, এখন থেকে তারা পর্তুগাল।’ পোস্টের কমেন্টস বক্সে নানান ট্রল। কিছু কমেন্টস পড়ার অযোগ্য।

রাজনৈতিক পরিভাষায় আছে, ‘শত্রুর শত্রু বন্ধু।’ কিন্তু ফুটবল সমর্থনে সবাই আর্জেন্টিনার সমর্থকদের বিরুদ্ধে।

সকালটা গেল নানান তত্ত্বে-তথ্যে।

অফিসে যাওয়ার সময় রাহাতের সঙ্গে দেখা। বলল, ‘আঙ্কেল, আমার দলের পাল্লা এখন ভারী।’ ছয় বছর বয়সী এই ছেলে কলোনির পর্তুগালের একমাত্র প্রতিনিধি। এর ভেতর এক তরুণ ওকে উদ্দেশ করে বলল, ‘তোমার দলের আয়ু আঠারো ঘণ্টা।’ ছেলেটার কথায় পরিষ্কার হলো যে তারা পর্তুগালকে চায় না।

ওদের সঙ্গে কথা বলে, হাঁটতে হাঁটতে ফকিরাপুল মোড়ের এক পত্রিকার দোকানের সামনে দাঁড়ালাম। হকার বললেন, ‘কারবারডা দেখলেন? ভাগ্যিস, তাগো খেলা ৭ তারিখে পড়ে নাই। মেসির ৭, এমবাপ্পের ৭, আবার এই হালায় হালান্ড, হেরও ৭ গোল।’ তখন এক তরুণ বলে উঠল, ‘রাতে আপনারাও নরেনটিনা হলেন।’

অম্ল-মধুর আলাপে দিন কাটল। রাত নামল। যথারীতি আর্জেন্টিনার সমর্থকদের দেওয়া ‘পর্তুজিল’ও বিদায়। বুকে পাথর চাপা দিয়ে পিরামিডের দেশটির জন্য প্রার্থনায় লিপ্ত হলো পর্তুজিলরা।

৭ জুলাই সন্ধ্যায় পল্টন মোড়ে এক দৈনিকের সাহিত্য সম্পাদকের সঙ্গে দেখা। তিনি জার্মানির সাপোর্টার। এ দলের সাপোর্টাররা এখন নির্ভার। এই সম্পাদক শিল্পী ধ্রুব এষের বাসায় গেছেন লেখা চাইতে। ধ্রুব এষ নাকি তাঁকে বলেছেন ‘আর্জেন্টিনা হারলে লিখবেন না।’

‘খেলা’, ‘লেখা’। একই অক্ষর দিয়ে গড়া শব্দ দুটি। আর্জেন্টিনার জয়ের ওপর নির্ভর করছে একজন সম্পাদকের লেখা। আবেগের কাছে বিবেকের মূল্য নেই দুই পয়সা।

রাত দশটা বাজল। ঘরে বসে আছি। কলোনির ক্লাব থেকে ভেসে এল ভারী গর্জন। এত তাড়াতাড়ি আর্জেন্টিনা গোল দিল! গুগল থেকে দ্রুত স্কোর দেখে চোখ ছানাবড়া। দ্রুত ক্লাবের টিভির সামনে গেলাম। কাওসার দুলাভাই ওখানকার মুরব্বি। বলে বসলেন, ‘আজকে যে করেই হোক, মিসরকে জেতাতে হবে।’ তাঁর কথা শেষ হতেই একযোগে ‘ঠিক ঠিক। শালার পেনালটিনাকে সাইজ করবে।’

পেনালটিও মিস। জোরে জোরে চিৎকার, ‘মেসি মিস, মেসি মিস।’ মুখর পুরা কলোনি। চিল্লাচিল্লি শুনে ছুটে এলেন আমজাদ সাহেব। আমাকে, কাওসার দুলাভাইকে আর জাকির হোসেন মিমকে দেখে ‘যাক এখানে তিন মুরব্বি আছে, চিন্তা নাই!’ বলে চলে গেলেন তিনি।

মিম সাহেব আর্জেন্টিনার ঘোর সাপোর্টার। তার আফসোস, ‘আমাদের সাপোর্টাররা সারা দিন কইছে, মিসর শক্তিশালী টিম। ওগো মুখের কথা ফইলা গেল!’ তার কথা শেষ হতেই হাসির রোল। একটু পর মিসরের ‘গোল বাতিল’ উৎসব। আবার মিসরের স্কোর লাইনে যোগ হলো ‘দুই’। একজন বলল, ‘আল্লাহর মাইর, দুনিয়ার বাইর।’ ‘হ, হ’ রব। আরেক তরুণের উক্তি, ‘তিন দিনের দুনিয়া। তিন পীরের বিদায় এক–এক করে।’

নেইমার, রোনালদো, মেসি। শোকসন্তপ্ত পরিবেশ! পাল্টা গোল উৎসবে শেষ মুহূর্তে জলদগম্ভীর পরিবেশ কেটে গেল। ম্যাচ শেষে বকরটিনা বলল, ‘এভাবেও ফিরে আসা যায়?’ ‘হ, তা যায়। মাফিয়ার মান রেফারি বাঁচায়।’ আরেক তরুণের প্রত্যুত্তর।

হাতাহাতির পর্যায় দেখে কাওসার দুলাভাই কোমরে গামছা পেঁচিয়ে বললেন, ‘পরিবেশ ঠান্ডা করতে হবে তাড়াতাড়ি।’ পোলাপানদের ঘরে ফিরিয়ে বাসায় গেলাম। বউ বলল, ‘গোল হওয়ার মুহূর্তে কমেন্ট্রি বক্সের ঘোষণাকারীর কণ্ঠ পরীক্ষা করসো? দেখো, মিসর গোল দিলে তাদের গলার স্বর কেমন! আর আর্জেন্টিনার সময় কেমন!’

অন্তর্জাল থেকে পক্ষ-বিপক্ষ, যুক্তিতর্ক, ফিফান্টিনা, ম্যাচ অব দ্য রেফারি, ক্লাব ফুটবলের নিয়মনীতি, রুলসমারানি, মেসি ইকোনমিকস–সহ কত যে শব্দের সঙ্গে পরিচিত হলাম সপ্তাহজুড়ে!