র ম্য

বাদল বক্স ফিরছেন

বাদল বক্সের প্রকৃত নাম বাদল মিয়া। তবে এই নামে এখন তাকে আর ডাকা যায় না। অন্তত তিনি নিজে তা পছন্দ করেন না। তার ভাষায়, ‘বাদল মিয়া’ নামটার মধ্যে কোনো ভাইব নেই। রিলস-টিকটকের যুগে নাম এমন হতে হবে যে শুনেই মানুষ থমকে যাবে, প্রোফাইলে ঢুকবে, তারপর অন্তত তিনটা রিলস না দেখে বের হতে পারবে না।

সেই চিন্তা থেকেই বাদল মিয়া একদিন নিজেই নিজের নাম রাখলেন, বাদল বক্স।

প্রথম দিকে আমরা ভেবেছিলাম তিনি হয়তো ‘বাদল বকশি’ লিখতে গিয়ে ভুল করে ‘বক্স’ লিখেছেন। কিন্তু না, ভুল নয়। সম্পূর্ণ পরিকল্পিত।

একদিন জিজ্ঞেস করেছিলাম, আপনার নাম বাদল বক্স কেন?

তিনি আমার দিকে করুণার চোখে তাকিয়ে বলেছিলেন, ‘এই জন্যই তোদের দ্বারা কিছু হয় না। বক্স মানে বাক্স। বাক্সের ভেতরে কী আছে, মানুষ জানতে চায়। রহস্য আছে। কিউরিওসিটি আছে। মার্কেটিং আছে।’

কৌতূহল সংবরণ করতে না পেরে তির ছুড়ে দিলাম, ‘তা আপনার ভেতরে কী আছে?’

বাদল বক্স কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, ‘কনটেন্ট!;

সেদিন থেকে তাঁর নাম নিয়ে আমার আর কোনো প্রশ্ন নেই।

আমি চুপ হয়ে গেলেও মহল্লার লোকজন প্রশ্ন থামায়নি। কেউ তাকে বলে ‘খালি বাক্স’, কেউ বলে ‘বাক্স ভাই’ আর মোড়ের চায়ের দোকানের কাশেম চাচা একদিন ডেকে বলে বসেছিলেন ‘বাদল বকশিশ’।

বাদল বক্স সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদ করেছিলেন, ‘চাচা, বকশি না, বক্স।’

কাশেম চাচা চায়ে লম্বা চুমুক দিয়ে বলেছিলেন, ‘ওই একই কথা। নাম ধুয়ে কি পানি খাবি? তার চেয়ে দোকানে এসে চা খা। আমার দুটো পয়সা হোক।’

তার পর থেকে কাশেম চাচার দোকানে বাদল বক্স বাকিতে চা পান করেন না।

তার অবশ্য নিজের নাম নিয়ে যথেষ্ট গর্ব। মাঝেমধ্যে বলেন, ‘দেখিস, একদিন এই নাম ব্র্যান্ড হবে। মানুষ বলবে, “আজ বাদল বক্সে কী আছে?”’

আমি কিঞ্চিৎ ব্যঙ্গ করে বলি, ‘মানুষ বাক্স খুলতে ভয়ও তো পেতে পারে। সাপ-গোখ থাকে যদি!’

তিনিও চট করে উত্তর দেন, ‘সেটাই তো সাসপেন্স!

বাদল বক্সের যুক্তির সামনে বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকা বিপজ্জনক। কারণ, তিনি কথার এমন একটা বাক্স খুলে বসেন, সেটার ঢাকনা আর সহজে বন্ধ করা যায় না।

অনেক দিন ধরেই বাদল বক্স লাপাত্তা ছিলেন। এলাকায় তেমন একটা দেখা যাচ্ছিল না। ফেসবুকেও আশ্চর্য নীরবতা। প্রথম দিকে একটু চিন্তিতই হয়েছিলাম। পরে শুনলাম, বর্ষার দিনে শর্টস ভিডিও বানাতে গিয়ে ভেজা রাস্তায় পা পিছলে এমনভাবে আছাড় খেয়েছেন যে কোমরের হাড্ডি উনিশ-বিশ হয়ে গেছে!

ঘটনার মধ্যে অবশ্য একধরনের কাব্যিক বিচার আছে। লোকটার নাম বাদল। আর শেষ পর্যন্ত বাদলেই তার পতন!

তবে তিনি নিজে ব্যাপারটাকে অন্যভাবে দেখেন। তাঁর দাবি, ‘আমার নাম বাদল বলে কি বৃষ্টির সঙ্গে আমার পারসোনাল শত্রুতা থাকবে? বরং বৃষ্টির উচিত ছিল আমাকে সম্মান করা!’

বর্ষা তাকে সম্মান করেনি। উল্টো এক আছাড়ে প্রায় দুই মাস ঘরে ঢুকিয়ে রেখেছিল।

তাতে মহল্লার লোকজন এবং ফেসবুকবাসী ভাইবোন-বন্ধুরা বেশ শান্তিতে ছিলেন। তার রিলস আর টিকটকের যন্ত্রণা থেকে সাময়িক মুক্তি মিলেছিল। কেউ কেউ তো গোপনে বর্ষাকালের দীর্ঘায়ু কামনাও করেছিলেন।

কিন্তু কোনো বর্ষাই চিরস্থায়ী হয় না। তেমনি কোনো বাক্সই চিরকাল বন্ধ থাকে না।

বাদল বক্সও শেষ পর্যন্ত খুলেছেন। খবর যা শুনছি, এবার তিনি আগের চেয়ে দ্বিগুণ প্রস্তুতি নিয়ে ফিরছেন। ঘরবন্দী দুই মাসে নাকি এত আইডিয়া জমিয়েছেন যে একটা খাতার নামই দিয়েছেন, ‘ভাইরাল প্ল্যান ২০২৬’।

কাল মোড়ের দোকানে দেখা হতেই দাঁত বের করে বললেন, ‘তমাল, রেডি থাকিস। কামব্যাকটা এমন দেব, এলাকা কাঁপবে!’