কয়েকদিন ধরে দেশে তেলেসমাতি কাণ্ডকারখানা চলছে। লেখার শুরুতেই ‘তেল’ শব্দটা দেখে যাঁরা ভেবেছেন আবার বুঝি তেলের দাম নিয়ে কান্নাকাটি শুরু করলাম, তাঁরা ভুল ট্র্যাকে উঠে পড়েছেন। তেলের কাজ তেল করেছে, দাম বাড়িয়েছে। এতে নতুন কি! একটু ভেবে দেখুন তো, গত দশ বছরে কোরবানির চামড়া আর আপনি নিজে ছাড়া কোন জিনিসের দাম বাড়েনি?
যাক, এবার মূল ঘটনায় আসি।
সম্প্রতি ঢাকার রাজপথে এআই ক্যামেরা নামক এক নতুন বড়ভাইয়ের আবির্ভাব ঘটেছে। যে কাজ শত শত ট্রাফিক ভাই বছরের পর বছর দুই হাত উপরে-নিচে, ডানে-বাঁয়ে, আড়াআড়ি, তির্যক, কখনো যোগব্যায়ামের ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে করতে পারেননি, সেই কাজ এই ক্যামেরা ভাই কয়েক দিনেই করে দেখিয়েছে।
এখন সিগনাল লাল হলে গাড়িগুলো দাঁড়ায়।
না, ভুল বললাম।
দাঁড়ায় না, দাঁড়াতে বাধ্য হয়!
একেই বলে—ঠেলার নাম বাবাজি।
তবে সমস্যা গাড়িতে না, সমস্যা আমাদের কিছু অতি প্রতিভাবান পথচারীতে।
এদের চেনার উপায় খুব সহজ।
কানের ভেতর একটা হেডফোন গুঁজে দেবে, তারপর এমন ভঙ্গিতে হাঁটবে যেন পৃথিবীর সমস্ত রাস্তা তাদের দাদার নামে সাফ-কবলা রেজিস্ট্রি করা। সামনে সিগন৵াল লাল না সবুজ, ট্রাক আসছে না ট্রেন আসছে—এসব তুচ্ছ ব্যাপার।
ওভারব্রিজ আছে?
আছে।
কিন্তু ব্যবহার করবে?
না।
কারণ, ওভারব্রিজ ব্যবহার করলে আত্মসম্মানে লাগে!
তাই এরা রাস্তার মাঝখান দিয়ে কখনো দৌড়ে, কখনো তির্যকভাবে, কখনো জিগজ্যাগ স্টাইলে, কখনো সাপের মতো এঁকেবেঁকে রাস্তা পার হবে।
এদের ধারণা, চলন্ত বাস-ট্রাকের ব্রেক সিস্টেম আসলে তাদের হাতের ইশারার সঙ্গে সংযুক্ত। তারা হাত তুললেই ১০ টনের ট্রাকও ভাববে—
‘ওহ, ভদ্রলোক রাস্তা পার হবেন, আমি বরং থেমে যাই!’
মাঝে মধ্যে ট্রাফিক পুলিশ দড়ি টানিয়ে রাখে, যাতে এরা রাস্তা পার হতে না পারে। কিন্তু সে দৃশ্য দেখলে মনে হয় দড়ির ওপাশে মানুষ না, ঈদের আগে ছাড় পাওয়া গরুর পাল দাঁড়িয়ে আছে।
তাদের সবার এমন তাড়া থাকে যে মনে হয় তাদের এই মুহূর্তেই প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে হবে (বড়টা)
সামনে বাজেট অধিবেশন। সরকারের আয় বাড়ানো দরকার। তাই আমি একটি অর্থনৈতিক প্রস্তাব দিতে চাই।
যারা যেখানে-সেখানে নিয়ম না মেনে রাস্তা পার হবে, অবৈধ পার্ক করবে, ফুটপাত দখল করে দোকান বসাবে, দেয়ালকে পাবলিক টয়লেট বানাবে—তাদের তাৎক্ষণিক জরিমানা করা হোক।
শুধু সাধারণ মানুষ কেন?
নেতা, উপনেতা, পাতিনেতা, নেতার শ্যালকের ভায়রার ভাই, দূরসম্পর্কের ভাগনের শ্বশুর—কেউ ছাড় পাবে না। (যদিও ইহা আদৌ সম্ভব নয়, কিন্তু বুদ্ধি দিতে সমস্যা কী? )
ঢাকার রাস্তা হতে পারে জাতীয় রাজস্ব আদায়ের নতুন স্বর্ণখনি!
তবে শিক্ষিত ও কিঞ্চিৎ ভদ্র শ্রেণির জন্য আরও আধুনিক একটি প্রস্তাব...
জেল নয়, জরিমানাও নয়, অন্য রকম এক শাস্তি!
ব্যস্ত রাস্তার পাশে মোবাইল কোম্পানি, ব্যাংক কিংবা বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানের স্পনসরে কয়েকটি ‘শাস্তিমূলক খাঁচা’ বসানো হোক।
যারা দোষী প্রমাণিত হবে, তাদের ১ থেকে ৬ ঘণ্টা পর্যন্ত সেই খাঁচায় বন্দী রাখা হবে।
ভাবুন একবার!
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের এই উর্বর দেশে খাঁচাবন্দী হওয়ার ১ মিনিটের মধ্যেই ভিডিও ভাইরাল।
দুই মিনিটে ফেসবুক।
পাঁচ মিনিটে টিকটক।
দশ মিনিটে ইউটিউব।
আর এক ঘণ্টার মধ্যে পুরো পরিবার, অফিস, স্কুলের বন্ধু এবং সাত পুরুষের আত্মীয়স্বজন জেনে যাবে—ভদ্রলোক সিগন৵াল না মেনে রাস্তা পার হতে গিয়ে এখন খাঁচায় বসে আছেন।
পরদিন জাতীয় দৈনিকে হয়তো এমন খবর বের হবে—
‘অমুক কোম্পানির সিনিয়র এক্সিকিউটিভ জনাব তমুক সাহেব আজ গুলশান সার্কেলে লালবাতি অমান্য করে রাস্তা পার হতে গিয়ে ‘মমিন কোম্পানির খাঁচা’-তে দুই ঘণ্টা অবস্থান করেন। তাঁকে মুক্ত করার জন্য বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি, প্রভাবশালী মহল ও আত্মীয়স্বজনের পক্ষ থেকে মোট ৩১২টি ফোন করা হয়েছে।’
এতে এক ঢিলে অনেক পাখি মারা যাবে।
আইন মানা বাড়বে।
দুর্ঘটনা কমবে।
মোবাইল কোম্পানির কল বাড়বে।
মাস্ক কোম্পানির বিক্রি বাড়বে, কারণ খাঁচা থেকে বের হওয়ার পর অনেকে মুখ লুকিয়ে চলবে।
করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোও নতুন বিজ্ঞাপনের সুযোগ পাবে।
ভাবুন তো—
‘মোখলেসের ১ নং লোহার খাঁচা—দেশের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য সংশোধনাগার।’
‘কান কাটা আবুল খাঁচা—ভুল করেছেন? থাকুন একটু!’
‘বল্টু মিয়ার নরম খাঁচা’—আজকের শিক্ষা, আগামীর নিরাপত্তা।’
‘ঘাউরা খোকনের Wifi খাঁচা’—ধীরগতির নেটওয়ার্ক, কিন্তু দ্রুত শাস্তি!’
সবশেষে খাঁচার গায়ে বড় বড় অক্ষরে লেখা থাকবে—
‘অমুক কোম্পানির তমুক খাঁচা— টেকসই, নিরাপদ এবং সামাজিকভাবে বিব্রতকর!’