
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এডুকেশনাল অ্যান্ড কাউন্সেলিং সাইকোলজি বিভাগের অধ্যাপক মেহতাব খানম। তিনি আপনার মানসিক বিভিন্ন সমস্যার সম্ভাব্য সমাধান দেবেন। অল্প কথায় আপনার সমস্যা তুলে ধরুন।—বি. স.
সমস্যা
আমি স্নাতক প্রথম বর্ষে পড়ি। পরিচিত সবাই আমাকে মা-বাবার বাধ্য হিসেবেই জানে। কিন্তু কেউ জানে না তাদের সঙ্গে আমার সম্পর্ক বন্ধুত্বপূর্ণ নয়। আমার ভেতরের দ্বন্দ্ব ভাগাভাগি করার জন্যও কাউকে পাই না।
আমার মূল সমস্যা হলো ছোটবেলা থেকেই আমি নিজের মধ্যে অনবরত দুটি ব্যক্তিত্বের অত্যাচার সহ্য করে আসছি। সেখানে আবেগের প্রাধান্য থাকে বেশি। যখন যে ব্যক্তিত্ব জেতে, তখন আমি তার কথামতো কাজ করি। কিন্তু বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায়, সে কথা শুনে যা করেছি, সেটা ভুল। কারণ, সেই কথা বা পরিস্থিতির ওপর আমার নিয়ন্ত্রণ থাকে না। শেষে যখন বুঝতে পারি, তখন থেকে অনুতাপে ভুগতে থাকি। আর যা ক্ষতি হওয়ার ততক্ষণে হয়ে যায়।
এই সমস্যার জন্য জীবনে অনেক প্রিয় মানুষ ও বন্ধুকে হারিয়েছি। ক্ষতি হয়েছে পড়াশোনারও। যতই বড় হচ্ছি, সমস্যাগুলো আমার আত্মবিশ্বাস কমিয়ে দিচ্ছে। অন্যের কাছে হেয় করছে। এ ছাড়া কাউকে ভালোবাসলে তার প্রতি প্রত্যাশা বেশি থাকে। সামান্য কারণেই কষ্ট পাই। সব সময় স্বপ্ন ছিল, নিজের মতো সিদ্ধান্ত নিয়ে জীবনে এগিয়ে যাব। কিন্তু সঠিক পথ বেছে নিতে না পারার অদক্ষতা আমার সব স্বপ্ন পূরণে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। মা-বাবার কাছে কোথাও কাউন্সেলিংয়ে যাওয়ার প্রস্তাব তুলে লাভ হবে না, তা আমি জানি। আমি আর পারছি না, আমি স্বাভাবিক মন নিয়ে এগিয়ে যেতে চাই।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক, ঢাকা।
পরামর্শ
তুমি আমার কাছে ঠিক কোন প্রশ্নের সমাধান চেয়েছ, তা খুব স্পষ্ট নয়। সব সমস্যা তুমি ছুঁয়ে গিয়েছ ঠিকই, তবে একটি বিশেষ উদাহরণ থাকলে আমার পক্ষে বোঝা আরও সহজ হতো। তুমি তোমার ব্যক্তিত্বের যে দুটো সত্তার কথা বলতে চেয়েছ, এগুলোর মধ্যে একটি কি ঠিকমতো সিদ্ধান্ত না নিতে পারার কারণে অসহায় বোধ করছ এবং অনুতপ্তও হচ্ছে? আর অন্য সত্তাটি কি তাকে অদক্ষ, আত্মবিশ্বাসহীন ইত্যাদি বলে ছোট করছে? যদি তা-ই হয়, তাহলে এ দুজনের যুদ্ধ তো তোমাকে ক্রমাগত কষ্টই দিতে থাকবে। তোমার মধ্যে কিন্তু একটি স্নেহশীল, মমতাময় সত্তাও রয়েছে। তাকে এই মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি কাজে লাগানো প্রয়োজন। ব্যক্তিত্বের সেই সহমর্মী অংশটি অসহায় সত্তাটির হাত দুটো ধরে তাকে যে ভুলগুলো হয়ে গেছে, সে জন্য আন্তরিকভাবে অনুমতি দিতে পারে। অর্থাৎ যদি তুমি নিজেকে পেছনে ফেলে আসা ভুলগুলোর জন্য ক্ষমা করে দিতে পারো, তাহলে ভবিষ্যতে কিছুটা হলেও আত্মবিশ্বাস ও সাহস নিয়ে চলতে পারবে। সেই সঙ্গে তোমার যুক্তিপূর্ণ সত্তা বা মনটির মধ্যে খুঁজে দেখবে অতীতে কতগুলো কাজ তুমি খুব সাফল্যের সঙ্গে করতে পেরেছ এবং সেগুলো তোমাকে অনেক ইতিবাচক অনুভূতিও দিয়েছে। তুমি ছোট-বড় সব অর্জনের জন্য নিজেকে অবশ্যই ভালোবাসবে এবং শ্রদ্ধা করবে। তোমার চিঠিটি পড়ে এটি বোঝা গেছে যে তুমি বেশির ভাগ সময় যুক্তির চেয়ে আবেগকে বেশি প্রাধান্য দিয়ে দাও। আর পরবর্তী সময়ে অনেক বেশি কষ্ট পাও। মা-বাবার সঙ্গে শৈশব থেকেই নৈকট্য ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক থাকলে তুমি এতটা আবেগনির্ভর হতে না। শিশুরা বড় হওয়ার সময় যদি মা-বাবারা তাদের আবেগের বহিঃপ্রকাশকে উৎসাহিত করেন এবং অনেক গুরুত্ব দেন, তাহলে তারা বড় হওয়ার পর কষ্ট, রাগ ও ভয়কে সহজেই মোকাবিলা করতে সক্ষম হয়। তুমি আমার একটি ছোট উত্তরের মাধ্যমে নিজের ব্যক্তিত্বের পরিবর্তন করতে পারবে—এটি বোধ হয় আশা করা যায় না। কাউন্সেলিংয়ে বেশ কয়েকটি সেশনের মাধ্যমে জীবনের সংকটময় মুহূর্তে অনেক বেশি যুক্তিপূর্ণ চিন্তা করতে সহায়তা করা হয়। তুমি যে নিজের মনটিকে এতটা বিশ্লেষণ করতে পেরেছ, তা অত্যন্ত প্রশংসনীয়। যে টেলিসেবা নম্বরটি আমি গত সংখ্যার আগের সংখ্যায় দিয়েছি, তুমি সেখানে ফোন করে সহায়তা নিতে পারো।