
কফির সৌরভ মেটে আর পোড়া। নাসারন্ধ্রে সেঁধিয়ে স্বাদেন্দ্রিয়কে তাতিয়ে দেয়। মন হয়ে ওঠে উচাটন। তবে কী খাচ্ছি আমরা, সেটা জানা জরুরি। ধরন থেকে স্বাদ আর বানানোর প্রক্রিয়ার সঙ্গে সহবত জানাটাও প্রয়োজন। তবে না তা উপভোগ্য হবে। জমবে আড্ডা কফির সঙ্গে।
কফির সৌরভটা কেমন একটা মিষ্টি আর পোড়া পোড়া। আর এই সুরভি ঘ্রাণেন্দ্রিয়ে প্রবেশ মাত্রই অদ্ভুত প্রতিক্রিয়া হয় শরীরে ও মনে। দূর হয়ে যায় ক্লান্তি নিমেষেই। আর বেশ একটা চনমনে ভাবও চলে আসে। আসে বাড়তি উদ্যম। ইদানীং এটা আরও বেশি করে টের পাওয়া যায়। কারণ, বাড়িতে যেমন কফি পানের চল বেড়েছে, তেমনি পথেঘাটে মিলছে কফিশপ। ফলে ফুটপাত ধরে হাঁটলেই সেই সৌরভ আপনাকে উচাটন যে করবে, তাতে কোনো মতান্তর নেই।
বলতে দ্বিধা নেই, দশককাল আগেও আমাদের দেশে এত বেশি কফি পানের রেওয়াজ ছিল না; বরং শখ করে যা একটু–আধটু সেটা তো ইনস্ট্যান্ট কফির বদৌলতে। তবে আজকাল যেমন ভালোর মানের ইনস্ট্যান্ট কফি মেলে, তেমনি পাওয়াও যায় আন্তর্জাতিক মানের কফি বিন। আর প্রস্তুত ও পরিবেশন পদ্ধতিতেও যোগ হয়েছে ভুবন-মান। ফলে কফিপ্রেমীরা অনায়াসেই পেয়ে যাচ্ছেন রোস্টিং, গ্রাউন্ডিং ও ব্রিউয়িং শেষে ধোঁয়া ওঠা কফি।
কফি তো আমরা এখন দিব্যি পান করছি। নানা স্বাদের। জমছে আড্ডা বন্ধু বা প্রিয়জনের সঙ্গে। কফির কাপে উছলে পড়ছে উচ্ছ্বাস। আবার কখনো কখনো তা গল্পে গল্পে জুড়িয়েও যাচ্ছে। ঠিক সেই রফিক আজাদের কবিতার মতো: ‘ভালোবাসা মানে ঠান্ডা কফির পেয়ালা সামনে/ অবিরল কথা বলা’।
কিন্তু এত সবের পরেও কি আমরা জানছি কফির রকম–সকম। নানা স্বাদভেদ, নানা বৈশিষ্ট্য প্রস্তুত প্রণালি? কফিপ্রেমী হওয়ার সুবাদে এটুকু দাবি এই পানীয় করতেই পারে। তাই আজ আন্তর্জাতিক কফি দিবসে জেনে নেওয়া যাক কফির নানা ধরন।
প্রথমেই বলে রাখা ভালো, প্রাকৃতিকভাবে সারা বিশ্বে বহু জাতের কফি জন্মালেও প্রধানত দুই ধরনের কফিই পান করা হয়, যার ওপরে কফি দ্রবণের স্বাদ অনেকটাই নির্ভর করে। প্রথম ধরনটি হচ্ছে সর্বোৎকৃষ্ট মানের অ্যারাবিকা বিন, যাতে ক্যাফিন কিছুটা কম এবং এর দামও বেশি। দ্বিতীয় ধরনটিকে বলা হয় রোবাস্তা, এই বিনে ক্যাফিন বেশি থাকায় কিছুটা কড়া ফ্লেভারের হয় এবং এর দাম কিছুটা কম। আবার এদিকে যেমন আছে বিশেষ একটি উৎস থেকে সংগৃহীত সিঙ্গেল অরিজিন কফি বিন, তেমনি পরস্পরের সম্পূরক ফ্লেভারের মিশেলে বিভিন্ন উৎস থেকে কফি বিশেষজ্ঞরা তৈরি করেন উৎকৃষ্ট সব কফি মিশ্রণ, যাকে বলে কফি ব্লেন্ড। এসব কফি বিন চূর্ণ করে বিভিন্ন বিশেষ পদ্ধতিতে নির্যাসকে ব্রিউইং করলে তবেই পাওয়া যায় হরেক রকমের পানযোগ্য কফি।
আবার কফির স্বাদ ও সুবাসের সঙ্গে সঙ্গে মুখের ভেতর ও জিবের স্পর্শে এর টেকশ্চার কেমন, তার নিরিখেও কফির শ্রেণিবিভেদ হয়। এসপ্রেসো মেশিনে উচ্চচাপে তৈরি কফির ওপরে বাদামি বুদ্বুদের স্তরটিকে বলে ক্রেমা। আবার দুধেল কফির ফোম বা ফ্রথের স্তরটি কিন্তু এর থেকে একেবারেই আলাদা। এসপ্রেসো মেশিন ছাড়াও সর্বজনপ্রিয় ফ্রেঞ্চ প্রেস, ড্রিপ, কোল্ড ব্রিউ ইত্যাদি পদ্ধতিতে কফি ব্রিউইং করা হয়। তবে কফিশপ বা ক্যাফেতে পরিবেশিত বেশির ভাগ কফিই শুরু হয় কফি শট দিয়ে, যা কিনা এসপ্রেসো মেশিনে করা এক আউন্স কালো কফি, যাতে প্রায় ৪০ চল্লিশ মিলিগ্রাম ক্যাফেইন থাকে। এই কফি কালো কফি হিসেবে অথবা এর সঙ্গে দুধ, ক্রিম, ক্যারামেল, চকলেট ইত্যাদির সঠিক মিশেলে বহু ধরনের কফি তৈরি করা হয়।
বিভিন্ন ধরনের অগুনতি ফ্লেভার যোগ করা যায় কফিতে, যা বলে শেষ করা যাবে না। আপাতত কয়েকটির কথা বলা যাক।
এই একেবারে বেসিক বা মৌলিক কালো কফিকে শর্ট ব্ল্যাকও বলা হয়। এক আউন্স পরিমাণের এই কালো নির্ভেজাল কফিতে সঠিক ফ্লেভার আনতে উৎকৃষ্ট মানের কফি বিনের সঙ্গে প্রয়োজন মুনশিয়ানার।
একে ইতালিয়ান ভাষায় ডপিও-ও বলা হয়, যার অর্থ দ্বিগুণ। শুনেই বোঝা যাচ্ছে, এই কফিতে এসপ্রেসোর তুলনায় দ্বিগুণ কফি থাকে। অর্থাৎ এসপ্রেসোর দুটি শট এক কাপে নিলেই হয়ে গেল ডাবল এসপ্রেসো৷
এসপ্রেসোর ডাবল শট কফি গরম পানিতে ঢাললেই তৈরি হয়ে গেল লং ব্ল্যাক। আমেরিকানোর মতো এখানে কফিতে পানি যোগ করা হয় না, বরং উল্টোটা করা হয়। তাই এতে কফির বিশেষ ফেনিল ক্রেমা অটুট থাকে৷ এসপ্রেসোর মতো না হলেও লং ব্ল্যাকও কিন্তু যথেষ্ট কড়া কফি।
এসপ্রেসো শটে গরম পানি যোগ করে তৈরি করা আমেরিকানো হলো একদম সাদাসিধে, ফেনাবিহীন এবং দেহমনে আরামদায়ক কফি। বলা হয়, এসপ্রেসোর তিতকুটে স্বাদ সইতে না পেরে মার্কিনরা এভাবে পানি মিশিয়ে খেত কফি। তাই নামটাও হয়েছে এমন।
ইতালিয়ান ভাষায় মাকিয়াত্তো অর্থ হলো দাগ লেগে গেছে এমন। খাঁটি কালো কুলীন এসপ্রেসোর শটে সাদা দুধ যোগ করে একেবারে দাগ লাগিয়ে দেওয়া কফি মাকিয়াটো বানানো হয়। এক শটের সঙ্গে দুধ আর ফোম দিলে তা শর্ট মাকিয়াটো আর এসপ্রেসোর দুটি শট ব্যবহার করে এই দুধ-কফি বানানো হলে তাকে বলে লং মাকিয়াটো।
যারা কফির খুব সমঝদার নয়, তারাও যে কফিটির নামের সঙ্গে পরিচিত, তা হলো কাপুচিনো। কফির ওপরে বেশি পরিমাণ বৈশিষ্ট্যপূর্ণ ফেনার স্তরযুক্ত এই কফির ওপরে আবার কোকো পাউডারও ছিটানো হয়। এক ভাগ কালো এসপ্রেসোর সঙ্গে এক ভাগ ক্রিমি ফেনিল দুধ আর এক ভাগ এই বিলাসী অনুভূতিদায়ক ফেনার সমন্বয়ে কাপুচিনো কফি তৈরি হয়। জানা যায়, ইতালির কাপুচিন ধর্মযাজকদের খয়েরি রঙের বিশেষ পোশাকের রঙের মিল আছে বলে এই কফিকে কাপুচিনো বলা হয়।
দুধ বা ক্রিম মেশানো কফিগুলোর মধ্যে ফ্ল্যাট হোয়াইটের অবস্থান একটু উঁচুতে। এতে দুধের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বুদ্বুদের মাইক্রোবাবল তৈরি করা হয়, ফলে এতে ফেনিল ভাব থাকে না। আবার এতে পুরো কফি শটেও যথেষ্ট দুধ যোগ করা হয়, তাই এতে ক্যাফেইনের পরিমাণ যথেষ্ট।
দুধের অনুপাত এসপ্রেসো শটের দ্বিগুণ হওয়ায় এতে তেমন তিতকুটে বা কড়া ভাব থাকে না। এ জন্যই হয়তো ছেলেবুড়ো সবার কাছেই ভ্যানিলা, ক্যারামেল, মোকা ফ্লেভারের লাতে এত জনপ্রিয়। এতে এসপ্রেসোর সঙ্গে বেশি করে ফেনিল দুধ দিয়ে আবার ওপরে দেওয়া হয় মজাদার আবেশী ফ্রথ বা ফেনার লেয়ার। কাপুচিনোতেও এমন ফেনা থাকলেও সেটা কফি ক্রেমানির্ভর, দুধ নয়। লাতেতে মিষ্টতা থাকে বেশ আর অগুনতি ফ্লেভারের পাওয়াও যায় দুনিয়াজুড়ে।
ইয়েমেনের উৎকৃষ্ট অ্যারাবিকা কফি বিনকে মোকা বিন বলা হলেও প্রচলিত অর্থে মোকা কফি বলতে চকলেট মেশানো কফিকেই বোঝানো হয়। এই চকলেট আগে এসপ্রেসোর সঙ্গে মেশানো যায়, তাতে ফেনিল দুধ ঢালার আগে। আবার দুধে চকলেট মিশিয়েই ফ্রথিং বা ফেনা তৈরির কাজটি করা যায় এ ক্ষেত্রে।
এগুলোই প্রধান। এ ছাড়া আরও বহু ধরনের কফি আছে। গরম এসপ্রেসো শটে এক স্কুপ ভ্যানিলা আইসক্রিম দেওয়া খেয়ালি আফোগাতো, কম পানিতে নির্যাস বের করা এসপ্রেসো ধরনের রিস্ত্রেতো, কোল্ড ব্রিউ করা আইস কফি। নানা রকম অদ্ভুত ফ্লেভার দেওয়া এমনকি মরিচ বা মসলা দেওয়া লাতে বা ইন্দোনেশিয়াতে পাওয়া যায় যে বিশ্বের সবচেয়ে দামি কফি ‘কপি লুয়াক’ নিয়েও আলোচনা চলতেই থাকে। তবে যে কফিই হোক না কেন, খেয়াল রাখতে হবে যে সেই কফি উৎপাদন যেন নীতি মেনে, নিয়মমতো করা হয়, পরিবেশদূষণ বা শ্রমিক-শোষণের যেন কোনো অবকাশ না থাকে।
আপাতত কথা নয়, বরং হয়ে যাক এক কাপ ধূমায়িত মনপছন্দ কফি!
ছবি: উইকিপিডিয়া ও পেকজেলসডটকম