বিশ্ববিদ্যালয়

করোনা গবেষণায় দেশের শিক্ষার্থীরা

অক্সিজেট নামের অল্প মূল্যের একটি সিপ্যাপ যন্ত্র নিয়ে কাজ করছেন বুয়েটের শিক্ষার্থীরা
ছবি: সংগৃহীত

খবরটা চোখে পড়েছিল এ বছর মে মাসে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ব্লুমবার্গ–এ প্রকাশিত এই খবরে বলা হয়েছে, ‘করোনাভাইরাস নিয়ে এরই মধ্যে ২৩ হাজারের বেশি গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছে। অথচ এখনো ভাইরাসটি সম্পর্কে আমাদের জানার পরিধি খুব ছোট।’

ভাইরাসের সঙ্গে লড়াই করতে করতেই আমরা বছরের প্রায় শেষ অংশে পৌঁছে গেছি। এখন যে আমাদের জানার পরিধি কিছুটা বিস্তৃত হয়েছে, তা নয়। বিজ্ঞানীরা গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন। উদ্ভাবকেরা চেষ্টা করছেন এমন একটা কিছু তৈরি করতে, যা এই দুঃসময় পেরোতে মানুষকে সহায়তা করবে।

বাংলাদেশের গবেষক–উদ্ভাবকেরাও চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। শিক্ষার্থীরা কেউ কেউ নিজেরা গবেষণা করেছেন, কেউবা শিক্ষকের সঙ্গে গবেষণা সহযোগী হিসেবে কাজ করছেন। করোনাসংক্রান্ত গবেষণায় দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা কী ভূমিকা রাখছেন, জানতে চেষ্টা করেছি আমরা।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়

চিকিৎসা খাত ও প্রকৌশলকে সংযুক্ত করেন বায়োমেডিক্যাল ইঞ্জিনিয়াররা। গবেষণার মাধ্যমে সেই প্রক্রিয়াই চালিয়ে যাচ্ছেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) বায়োমেডিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের শিক্ষার্থীরা। বর্তমানে আটটি গবেষণা প্রকল্প চলমান। প্রতিটি গবেষণা প্রকল্পেই বিভাগটির শিক্ষার্থীদের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ রয়েছে। মূলত, স্নাতক পর্যায়ের তৃতীয় ও চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থীরাই গবেষণাগুলো করছেন। আর সেগুলো দেখভালের দায়িত্বে রয়েছেন বিভাগের চারজন শিক্ষক—তারিক আরাফাত, জাহিদ ফেরদৌস, তওফিক হাসান ও সাঈদুর রহমান।

করোনায় আক্রান্ত রোগীদের অক্সিজেনের চাহিদা পূরণ করতে ও উচ্চগতির ভেন্টিলেশনের জন্য অক্সিজেট নামের অল্প মূল্যের একটি সিপ্যাপ যন্ত্র নিয়ে কাজ করছেন বিভাগটির শিক্ষার্থী মীমনুর রশিদ, কাওসার আহমেদ, ফারহান মুহিব ও কায়সার আহমেদ।

মীমনুর রশিদ জানান, তাঁদের এই প্রকল্প বাংলাদেশ চিকিৎসা গবেষণা পরিষদের (বিএমআরসি) অনুমোদনক্রমে ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল সম্পন্ন করার অপেক্ষায় আছে। অনুমোদন পেলে পরীক্ষামূলকভাবে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন করোনায় আক্রান্ত কয়েকজন ব্যক্তিকে এ যন্ত্রের মাধ্যমে চিকিৎসাসেবা দেওয়া হবে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের মোট পাঁচটি গবেষণা প্রকল্পে জড়িত আছেন চতুর্থ বর্ষের এই শিক্ষার্থী। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশে (আইসিডিডিআরবি) একটি ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালেও কাজ করছেন তিনি।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে কাজে লাগিয়ে বুয়েটে দুটি গবেষণা প্রকল্পের কাজ চলছে। এই প্রকল্প দুটিতে করোনায় আক্রান্ত রোগীর এক্স-রে ও সিটিস্ক্যান পর্যালোচনা এবং ফুসফুসের সংক্রমণের মাত্রা নির্ণয় নিয়ে গবেষণা করছেন লতিফুর রহমান, নুসরাত বিনতে নিজাম, মঈনুল হাসান, সাদী মোহাম্মদ, উদয় কামাল ও অনির্বাণ চক্রবত্ত৴ী।

স্বাস্থ্যকর্মীদের নিয়মিত ব্যবহার্য সামগ্রী, যেমন: মাস্ক, পিপিই ইত্যাদি অল্প সময়ে জীবাণুমুক্তকরণের জন্য ব্যবহৃত বিশেষ যন্ত্র—কেবিনেট—তৈরির কাজ করছেন তৌফিক হাসান, সুশান্ত কুমার সাহা, ফারহানা ইসলাম ও মেহনাজ উর্বি জাহাঙ্গীর।

এদিকে স্বাস্থ্যকর্মী ও চিকিৎসকদের সুরক্ষা দেওয়ার জন্য শিক্ষার্থীরা তৈরি করেছেন ব্যাটারিচালিত বিশেষ ধরনের সুরক্ষা উপকরণ। হেলমেটের মতো এই সুরক্ষা উপকরণ পরলে মাস্ক ছাড়াই স্বাস্থ্যকর্মীরা নিরাপদে আক্রান্ত রোগীদের সেবা দিতে পারবেন। নিরবচ্ছিন্ন অক্সিজেন সরবরাহের জন্য অক্সিজেন কনসেন্ট্রেটর, সংকটাপন্ন রোগীদের সেবার জন্য ভেন্টিলেটর তৈরি নিয়েও গবেষণা করছেন বিভাগটির শিক্ষার্থীরা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

বরাবরই গবেষণায় আগ্রহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) অণুজীববিজ্ঞান বিভাগের পিএইচডি ফেলো অতুন সাহার। করোনার এই সময়ে ১২টি গবেষণা প্রকল্পে কাজ করেছেন তিনি।

অতুন সাহা মূলত গবেষণা করছেন করোনাভাইরাসের গতিবিধি, আচরণ, পরিবর্তন ইত্যাদি নিয়ে। এ ছাড়া বাংলাদেশ ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে সংক্রমিত ভাইরাসের জন্য কী ধরনের টিকা কার্যকর হবে, সেটি নিয়েও গবেষণা করছেন বলে জানান তিনি।

অতুনের গবেষণাগুলোয় সুপারভাইজার হিসেবে আছেন ঢাবির অণুজীববিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক আনোয়ার হোসেন, সহযোগী অধ্যাপক মুনাওয়ার সুলতানা ও সহকারী অধ্যাপক মিজানুর রহমান। এ ছাড়া একাধিক গবেষণা প্রকল্পে তাঁর সঙ্গী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের দুজন শিক্ষক।

মহামারির কারণে ঘরে বসেই অধিকাংশ কাজ করলেও নতুন অনেক কিছু শিখতে পেরেছেন বলে জানান অতুন। তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশে সরাসরি করোনা নিয়ে গবেষণার সুযোগ কম। তাই অনলাইন ও সফটওয়্যারকেন্দ্রিক তথ্যগুলো নিয়ে গবেষণা করছি। আগে ব্যাকটেরিয়া নিয়েই বেশি গবেষণা করতাম। তবে এখন ভাইরাস নিয়েও গবেষণার দক্ষতা বেড়েছে আমার।’

আমাদের বিভাগের শিক্ষার্থীরা নিজ আগ্রহ থেকেই এসব গবেষণাকর্ম শুরু করেছে। ঢাকার বাইরে বসেও কিছু শিক্ষার্থী আমাদের সঙ্গে গবেষণা করছে। আমরা সব সময়ই গবেষণায় যথাসম্ভব শিক্ষার্থীদের অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা করি। দেশের অন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও শিক্ষার্থীরা ভালো মানের গবেষণা করছে। তবে সমস্যা হলো, অধিকাংশ মেধাবী শিক্ষার্থী স্নাতক সম্পন্ন করার পর উচ্চশিক্ষার জন্য দেশের বাইরে চলে যায়। স্নাতকোত্তর পর্যায়ে দেশে গবেষণার আরও সুযোগ সৃষ্টি করতে পারলে আমরা এই মেধাবীদের দেশে রাখতে পারব। তখন বিদেশ থেকেও হয়তো ছেলেমেয়েরা আমাদের দেশে উচ্চশিক্ষার জন্য আসবে।
ড. তওফিক হাসান, সহকারী অধ্যাপক, বায়োমেডিকেল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, বুয়েট

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের কারণে গত মার্চে দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ হয়ে যায়। ক্যাম্পাস বন্ধ থাকায় অবসর সময়কে গবেষণার কাজে লাগাতে শুরু করেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) পাবলিক হেলথ অ্যান্ড ইনফরমেটিকস বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী মোহাম্মদ মামুন।

করোনাকালে বিভিন্ন বয়সী মানুষের মানসিক স্বাস্থ্য ও আর্থসামাজিক অবস্থাসংক্রান্ত বিষয়গুলো নিয়ে মামুন গবেষণা করছেন। তিনি বলেন, ‘গত মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত ১৬টি গবেষণার কাজ করেছি। আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের শুরু থেকেই গবেষণার কাজ শুরু করি। ল্যান্ডস্লাইডসহ বিভিন্ন খ্যাতনামা জার্নালে আমার এই গবেষণাগুলো প্রকাশিত হয়েছে। এ বছর আমার সাইটেশনের সংখ্যাও অনেক বেড়েছে।’

গবেষণার আগ্রহ থেকে বছর খানেক আগে সেন্টার ফর হেলথ ইনোভেশন, নেটওয়ার্কিং, ট্রেনিং অ্যান্ড রিসার্চ বাংলাদেশ নামে একটি সংগঠন চালু করেছেন মোহাম্মদ মামুন। জাবি ছাড়াও দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এই সংগঠনের অধীনে গবেষণার কাজ করেন। করোনাকালে মামুনের গবেষণাগুলোয় সংগঠনের সদস্যরাও জড়িত।