কেন ধর্ষণ?

সালমা আলী
সালমা আলী
সাম্প্রতিক সময়ে গণমাধ্যমে ধর্ষণের নানা খবর এসেছে। কেন মানুষ এ ধরনের অপরাধে লিপ্ত হয়? কেন ধর্ষণ? বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির নির্বাহী পরিচালক সালমা আলী ধর্ষণের প্রেক্ষাপট, আইনি প্রতিকার ও প্রতিরোধ নিয়ে কথা বলেছেন অধুনার সঙ্গে। এই সময়ে ধর্ষণের নানা খবরকে সালমা আলী ‘ভয়াবহ’ বলে উল্লেখ করেছেন। আর তা বন্ধে একটি সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মানসুরা হোসাইন

অধুনা: ধর্ষণের ঘটনা কি বেড়ে গেছে?

সালমা আলী: ধর্ষণের ঘটনা শুধু বাড়াই নয়, তা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। একটু আগেই (গতকাল মঙ্গলবার) জানতে পারলাম, সিলেট মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে (ওসিসি) একজন ভর্তি হয়েছেন। গত এক সপ্তাহে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওসিসিতে ভর্তি হয়েছেন আটজন। গত তিন দিনের হিসাবেই বলা যায়, কয়েকটি ঘটনা ঘটার পর পরিবারের সদস্যরা টেলিফোনে ঘটনার কথা জানিয়েছেন। আর সম্প্রতি প্রকাশ পাওয়া রাজধানীর বনানীতে বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই ছাত্রী ধর্ষণের ঘটনা তো এখন সব জায়গায় আলোচনার বিষয়বস্তুতে পরিণত হয়েছে।

অধুনা: ধর্ষণের ঘটনার পেছনের কারণ কী? শুধুই কি যৌনতা?

সালমা আলী: যৌনতা মানুষের জীবনের একটি অন্যতম অধিকার। তবে এই যৌনতাকে বিকৃত করে উপস্থাপনই হচ্ছে ধর্ষণ। ধর্ষণের সঙ্গে যৌনতার চেয়েও ক্ষমতার বিষয়টি বেশি সম্পর্কিত। আমি পুরুষ, আমার ক্ষমতা আছে যেকোনো সময় যেকোনো নারী বা শিশুকে ভোগ করার। একজন যৌনকর্মীরও অধিকার আছে তিনি কার সঙ্গে যৌনকাজ করবেন আর কার সঙ্গে করবেন না। একজন যৌনকর্মী যদি ‘না’ করেন, তা মানা নাহলে তা হবে ধর্ষণ। একইভাবে একজন স্ত্রী স্বামীর সঙ্গে সহবাস করতে অনিচ্ছা প্রকাশ করতেই পারেন। স্ত্রীর ইচ্ছার সম্মান না দিয়ে জোর করে সহবাস করা হলেও সেটি হবে ধর্ষণ। কিন্তু এই বিষয়গুলো সমাজে প্রতিষ্ঠিত করা সম্ভব হয়নি বলেই ধর্ষণের ঘটনা বাড়ছে। ধর্ষকের হাত থেকে তিন বছরের শিশুরাও রেহাই পাচ্ছে না। পরিচিতজনদের মাধ্যমে ধর্ষণের ঘটনাও বাড়ছে। সবকিছুর মূলে আছে মূল্যবোধের অভাব। অবাধ পর্নোগ্রাফির বিস্তার, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে স্বল্প পরিচয়ের পর ওই ছেলের সঙ্গে বাছবিচার না করে মেলামেশা, বিভিন্ন চ্যানেল, বিশেষ করে পাশের দেশের বিভিন্ন চ্যানেলে যা দেখানো হয়, তা-ও ধর্ষণের মতো অপরাধকে উসকে দিচ্ছে। বিজ্ঞাপন দেখে একটি ছোট ছেলেও জানতে পারছে, শরীরকে উত্তেজিত করতে হলে কী খেতে হবে। ছেলেমেয়েরা ইন্টারনেটে কোন সাইট দেখছে, তা-ও অভিভাবকেরা কখনো নজরে আনছেন না।

অধুনা: ধর্ষণের ক্ষেত্রে এখন পর্যন্ত ধর্ষণের শিকার নারীর দিকেই তো সমাজ আঙুল তুলছে...

সালমা আলী: ধর্ষণের পর বেশির ভাগ ক্ষেত্রে পরিবার সামাজিকতার ভয়ে বিষয়টি গোপন রাখতে বাধ্য হয়। বনানীর ধর্ষণের ঘটনার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই ছাত্রী সাহস করে তা প্রকাশ করেছেন। কিন্তু এ ঘটনার ক্ষেত্রেও আমার পরিচিতজনেরাই বলছেন, মেয়ে দুটো রাতে হোটেলে গেল কেন? নারীদের যেকোনো জায়গায় যাওয়ার অধিকার আছে। রাতে গিয়েছে বলেই তাঁদের ধর্ষণ করতে হবে? বারবার আলোচনায় আসছে, ওই দুই ছাত্রীর সঙ্গে ধর্ষকদের আগে থেকেই সম্পর্ক ছিল। আগে থেকে সম্পর্ক থাকার সঙ্গে ধর্ষণের কোনো সম্পর্ক নেই। এই সমাজ শুধু ধর্ষণের শিকার নারীর দিকে আঙুল তুলে তা-ই নয়, ওই নারীকেই প্রমাণ করতে হয়, তিনি ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। ধর্ষণের পরীক্ষায় ‘টু ফিঙ্গার টেস্ট’ নিয়ে এত আলোচনার পরও তা বন্ধ হয়নি। বর্তমানে ধর্ষণের শিকার হয়ে অনেকেই সাহস করে মামলা করছেন। তবে ‘লিগ্যাল প্রসিকিউশন’ এখন পর্যন্ত নারীবান্ধব হয়নি। বনানীর ঘটনা এবং এর আগে রাজধানীতে মাইক্রোবাসে গারো তরুণী ধর্ষণের পর থানাগুলো যে ভূমিকা পালন করেছিল, তা সবার জানা।

অধুনা: ধর্ষণ প্রতিরোধে করণীয় এবং ধর্ষণের শিকার ব্যক্তির আইনি সুরক্ষা বিষয়ে আপনার সুপারিশগুলো জানতে চাচ্ছিলাম।

সালমা আলী: প্রথমত একেকটা ঘটনা ঘটে, তারপর গণমাধ্যমসহ সব জায়গায় তুমুল আলোচনা হয়, তারপর একসময় থেমে যায় সবকিছু। এ সময়ের মধ্যে তালিকায় আরও একটি ঘটনা যোগ হয়। ঘটনা যাতে ঘটতেই না পারে, সে জন্য একটি সামাজিক আন্দোলন খুব জরুরি হয়ে দেখা দিয়েছে। ধর্ষণ প্রতিরোধে বিচারহীনতার যে সংস্কৃতি, তা থেকে বের হতে হবে। ধর্ষককে দৃষ্টান্তমূলক সাজার আওতায় আনতে হবে। ২০০৩ সালে সংশোধিত নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে ধর্ষণের বিচারে যে সময় নির্ধারণ করা আছে, সেই সময়ের মধ্যেই তা শেষ করতে হবে। এই আইনের বিধিমালা প্রণয়ন করাও জরুরি। আমরা এখন পর্যন্ত ভিকটিম ও সাক্ষীর সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পারেনি। এটি অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে। আর ধর্ষণের জন্য শুধু পুরুষদের দায়ী না করে পুরুষতান্ত্রিক মনোভাবকে দায়ী করতে হবে। আর এ মনোভাব ভাঙতে হলে পুরুষদের সঙ্গে নিয়েই ধর্ষণের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। একটি ধর্ষণের ঘটনা ঘটার পর বিভিন্ন গণমাধ্যম এমনভাবে খবরটা প্রকাশ বা প্রচার করছে, তাতে বিষয়টিতে অন্যদের আরও বেশি করে সুড়সুড়ি দেওয়া হচ্ছে। এ প্রবণতা থেকে বের হতে হবে। ধর্ষণ প্রতিরোধে পরিবার এবং নারীদের সচেতনতাও বাড়াতে হবে। পাচারের শিকার যে নারী ও শিশুদের আমরা উদ্ধার করি, তাদের বেশির ভাগ বাল্যবিবাহের শিকার। তারপর ভারতসহ বিভিন্ন দেশে পাচার করার আগে বেশির ভাগকেই ধর্ষণের শিকার হতে হয়। রাজধানীসহ বিভিন্ন শহরে যে হোটেল, রেস্তোরাঁ আছে, সেগুলোতে প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নজরদারি বাড়াতে হবে। রাস্তাঘাটে নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকারকে বিশেষ ভূমিকা নিতে হবে।