কোকিল যে কষ্ট এড়াতে অন্য জাতের পাখিদের তৈরি করা বাসায় ডিম পেড়ে আসে, সে কথা কমবেশি সবারই জানা। ডিম দেখতে প্রায় একই রকম হয় বলে সরলবিশ্বাসে অন্য পাখিরাই তা দিয়ে কোকিলের ছানা ফোটায়। কিন্তু সুকণ্ঠের অধিকারী অথচ অলস কোকিল কীভাবে প্রায় হুবহু অন্য পাখির ডিমের মতো ডিম পাড়ে, সে প্রশ্নের জবাব এত দিন অজানাই ছিল। এবার হয়তো সেই ধাঁধার সুরাহা হবে।
নানা জাতের পাখির ডিমের রং ও আকৃতিতে রয়েছে বৈচিত্র্য। কিন্তু মা কোকিল অন্য পাখির মতো দেখতে ডিম পাড়ায় সক্ষম। কীভাবে তা সম্ভব হয় সে নিয়ে গবেষণার ইতিহাস প্রায় ১০০ বছরের। এবার নরওয়ের একদল বিজ্ঞানী এ রহস্যের অন্ধকার কিছুটা হলেও দূর করতে পেরেছেন। তাঁরা জানতে পেরেছেন, কোকিলের ডিমের রঙের বিষয়টি স্ত্রী কোকিলের জিনের ওপর নির্ভরশীল। এ-সংক্রান্ত একটি গবেষণা প্রতিবেদন নেচার কমিউনিকেশনস সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে।
নরওয়েজিয়ান ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির (এনটিএনইউ) জীববিদ্যার গবেষক ফ্রোড ফসোয় বলেন, পাখির শরীরে রয়েছে জেড এবং ডব্লিউ ক্রোমোজোম, যা স্তন্যপায়ী প্রাণীর এক্স এবং ওয়াই ক্রোমোজোমের মতোই কাজ করে। পুরুষ পাখি দুটি জেড এবং স্ত্রী পাখি একটি জেড ও একটি ডব্লিউ ক্রোমোজোম ধারণ করে। কোকিলের নীল ডিমে সেই জেড ক্রোমোজোম থাকে। আরেকটি ব্যাখ্যা হলো, স্ত্রী পাখির মাইটোকন্ড্রিয়াল ডিএনএর মাধ্যমে ডিমের সেই বৈশিষ্ট্য বহাল থাকে।
পাখির নীল ডিমের ক্ষেত্রে গবেষকেরা ব্যাপক বৈচিত্র্যের নমুনা পেয়েছেন। ধারণা করা হয়, এর সূচনা প্রায় ২৬ লাখ বছর আগে এশিয়া অঞ্চলে। অন্য যে পাখিদের ডিমের রং নীল, কোকিলেরা তাদের বাসায়ই নিজের ডিম রেখে আসার চেষ্টা করে। সব সময় যে এই কৌশল সফল হয়, তা নয়। কোনো কোনো পাখি কোকিলের ডিম চিনতে পেরে তা বাসা থেকে ফেলে দেয়।
গবেষক ফসোয় বলেন, বাসায় ডিম রাখার ব্যাপারটি নিয়ে কোকিল ও অন্য পাখিদের মধ্যে প্রতিযোগিতা বরাবরই চলে আসছে। আবার কোকিলের ডিম দিনে দিনে যতই অন্য পাখির ডিমের মতো হচ্ছে, অন্য পাখিরাও ডিম চেনার ব্যাপারে ক্রমশ অভিজ্ঞ ও সন্দেহপ্রবণ হয়ে উঠছে। শেষ পর্যন্ত লড়াইয়ে কে জয়ী হচ্ছে, তা অবশ্য এ গবেষণায় নিশ্চিত করে বলা সম্ভব হয়নি। তবে ইউরোপসহ বিশ্বজুড়ে কোকিল এবং তার ডিমের আশ্রয়দাতা অন্য পাখি—উভয়ের সংখ্যাই আশঙ্কাজনক হারে কমছে।
নরওয়ের ওই গবেষকেরা কেবল নীল রঙের ডিম নিয়ে অনুসন্ধান করেছেন। এ বিষয়ে আরও গবেষণার জন্য প্রচুর পরিমাণে জিনগত তথ্য-উপাত্ত দরকার। ফসোয় বলেন, সম্প্রতি তাঁরা বেশ কয়েক জাতের কোকিলের পূর্ণাঙ্গ জিন নকশা বের করেছেন। এসব তথ্য আগামী কয়েক বছরের গবেষণায় কাজে লাগবে। তাঁরা আশা করছেন, পাখির ডিমের মধ্যে সাদৃশ্য থাকার রহস্যের আরও স্পষ্ট সমাধান শিগগিরই দেওয়া যাবে।