অভ্যাসটা বেশ কয়েক বছর ধরে দেখা যাচ্ছিল। বিশেষ করে শহুরে কর্মজীবী দম্পতিদের ছোট পরিবারগুলোতে। বাইরের ব্যস্ততা সামাল দিয়ে ঘরে এসে আবার চুলায় চাল চড়ানোর মতো আগ্রহ থাকে না অনেকের। তাই প্রতিদিনের খাবার বাইরে থেকে কিনে আনেন। তবে সেটা রেস্তোরাঁর খাবার নয়, ঘরেই তৈরি কোনো উদ্যোক্তার রান্না। করোনাকালে সেই অভ্যাস এক লাফে বেড়ে গেছে। এখন অনেকেই বাসায় রান্না বাদ দিয়ে বাইরে থেকে খাবার কিনে খাচ্ছেন। আর তাই ঘরে তৈরি (হোম মেড) খাবারের রাঁধুনির সংখ্যাও বেড়েছে। তাঁরা শহরের এক মাথা থেকে আরেক মাথা পর্যন্ত খাবার পৌঁছে দিচ্ছেন সময়ের আগেই। ঈদের সময় চাইলে আপনার বাসার প্রয়োজনীয় সব রান্না তাঁদের ফরমাশ দিতে পারেন।
অনেক ঘরে সপরিবার করোনায় আক্রান্ত হওয়ার খবর শোনা যায়, তাঁরা বাসায় রান্নার ঝামেলায় না গিয়ে প্রয়োজনমতো এভাবে খাবার আনাতে পারেন। অনলাইনভিত্তিক এসব খাবারের দোকানের ফেসবুক পেজ থেকে বা ফোন করে খাবার অর্ডার করা যায়।
তারিক মাহমুদ ও নাসরিন নাহার দুজনেই চাকরিজীবী, থাকেন রাজধানীতে। দুই ছেলে নিয়ে তাঁদের ব্যস্ত সময়। করোনাকালেও সকাল সকাল অফিসে যেতে হয়। বাড়ি ফিরতে সন্ধ্যা পেরিয়ে যায়। সারা দিনের কাজ সেরে বাসায় ফিরে রান্নাঘরে যেতে মন টানে না। তাই খাবারের জন্য বেছে নিয়েছেন একটি অনলাইন পেজ। নাসরিন নাহার বলেন, ‘দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে ওই পেজ থেকে খাবার নিচ্ছি। এখন তিনি আমাদের সবার টেস্ট জানেন। কার কী পছন্দ, সেটা বলেও দিতে হয় না। বাসায় অতিথি এলেও জানিয়ে দিই, সেইমতো খাবার চলে আসে।’ রান্নার বাজার খরচসহ কর্মঘণ্টা হিসাব করলে বাইরে থেকে আনা খাবারই ভালো বলে মনে করেন নাসরিনের স্বামী তারিক মাহমুদ।
অনেকে আবার পরিবার ছাড়া কাজের সূত্রে একা থাকেন। তাঁদের জন্যও এমন খাবার সুবিধার। ঢাকায় একটি দূতাবাসে কর্মরত আলী ফজল যেমন খাবার নিয়ে শুরুতে খুব ঝামেলায় ছিলেন। প্রায় চার বছর ধরে তিনি গুলশানের এক উদ্যোক্তার কাছ থেকে খাবার নিচ্ছেন। আলী ফজল বলেন, ‘যেদিন কোনো ডেজার্ট খেতে ইচ্ছা করে, খাবারের সঙ্গে সেটা দিতে বলি। প্রতিদিন সকালেই আমার তিনবেলার খাবার একসঙ্গে দিয়ে যায় তারা।’
ঢাকার বাইরে বড় শহরগুলোতে এমন অনেক উদ্যোক্তা আছেন, যাঁরা ঘরোয়া খাবার ‘হোম ডেলিভারি’ করেন। এমন কিছু উদ্যোগের কথা থাকছে এই প্রতিবেদনে।
উম্মাস কিচেন
যুক্তরাষ্ট্রে থাকার সময় ২০০৩ সালে উম্মাহ মোস্তফা প্রতিবেশী এক নারীকে দেখেছেন বাসায় রান্না করা খাবার সরবরাহ করতে। নিজে শুরু করেছিলেন বেকিং দিয়ে। দেশ–বিদেশের বিভিন্ন শেফের কাছে রান্না শেখা উম্মাহ চাকরি করতেন ঢাকার ডেনমার্ক দূতাবাসে। চাকরি ছাড়ার পর দূতাবাসের সহকর্মীদের আগ্রহেই তাঁর শুরু।
২০১৬ সাল থেকে বাসায় রান্না করা খাবার সরবরাহ করছেন, একই সঙ্গে রান্না শেখাচ্ছেন। একজনের থেকে আরেকজন, এভাবেই উম্মাস কিচেনের সুনাম ছড়িয়েছে মুখে মুখে। দূতাবাস এলাকার অনেক বিদেশি মাসের ৩০ দিনই প্রতি বেলা উম্মার রান্না করা খাবার খান। ঢাকা শহরের সব এলাকায় খাবার সরবরাহ করেন উম্মাহ। ভাত, মাছ থেকে পোলাও, রোস্ট, বিরিয়ানি, মিষ্টান্নসহ সব রকম খাবারের অর্ডার নেন তিনি। সাধারণত দুদিন আগে খাবার অর্ডার দিতে হয় তাঁর ফেসবুক পেজে বা ফোনে। নতুন গ্রাহক হলে দামের অর্ধেক টাকা অগ্রিম পাঠাতে হয়, নিয়মিত গ্রাহক হলে ‘ক্যাশ অন ডেলিভারি’।
ঠিকানা: fb.com/kitchenofummah
এইচ অ্যান্ড এফ ফুড
সালমা আলম শুরু করেছিলেন মতিঝিলের ব্যাংকপাড়ায় খাবার সরবরাহ করে। ব্যাংক থেকে ধীরে ধীরে সালমার খাবার জায়গা করে নিয়েছে ব্যাংকের কর্মীদের পারিবারিক অনুষ্ঠানগুলোতে। জন্মদিন, বিবাহবার্ষিকীসহ যেকোনো অনুষ্ঠানে তাঁরা ফোনে খাবারের অর্ডার দিতেন। ২০১৯ সালের নভেম্বরে অনলাইন উদ্যোক্তাদের সংগঠন উইমেন অ্যান্ড ই–কমার্স ফোরাম—উইয়ের ফেসবুক গ্রুপে যুক্ত হয় নাজমার খাবারের পেজ এইচ অ্যান্ড এফ ফুড। এরপর থেকে নানা ধরনের খাবারের ফরমাশ আসতে থাকে। নাজমা সরবরাহ করেন সাদা ভাত, মোরগ পোলাও, রোস্ট, কোরমা, মাছ বা মাংসের নানা পদ। নাজমার পেজের একটি বিশেষ খাবার নানা রকম ভর্তা দিয়ে খুদের ভাত।
ঠিকানা: fb.com/healthyandfreshfoodbd
সিস্টার্স কেকারি
ফেসবুকে নানা রকম কেকের ছবি দেখে বোনের সঙ্গে মিলে ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে একটা পেজ খোলেন সুমাইয়া তাবাসসুম। অনেকটা শখ করেই। চার মাস পর উই গ্রুপে যুক্ত হয়ে একটা পোস্ট দেন নিজের জেলার তুলসীমালা চাল নিয়ে। প্রচুর
সাড়া পান সেই পোস্টে। করোনাভাইরাসের প্রকোপ বাড়ার পর গত বছর ঈদুল আজহার দিন হঠাৎ একটি খাবারের অর্ডার পান সুমাইয়া। ডেলিভারি দিতে হবে শেরপুরে। ঈদে বাড়িতে থাকায়
সেই অর্ডার তিনি সরবরাহ করেন। এরপর থেকে জমে ওঠে সুমাইয়ার রান্না করা খাবারের
উদ্যোগ।
দক্ষিণ পিরেরবাগের (মিরপুর) বাসিন্দা সুমাইয়া মূলত ঢাকা শহরেই খাবার সরবরাহ করেন। কয়েকজন গ্রাহক পেয়েছেন, যাঁরা ৩০ দিন তিন বেলার খাবার নেন সিস্টার্স কেকারি থেকে। সাধারণত আগের দিন রাত পর্যন্ত অর্ডার নেন, তবে কোনো কোনো ক্ষেত্রে সকালে অর্ডার করার পরও বিকেলে খাবার মেলে সিস্টার্স কেকারিতে।
ঠিকানা: fb.com/tonu.sumiyatabassum
নাজমাস কিচেন
২০২০ সালে দেশে করোনার সংক্রমণ শুরুর পর থেকে বাসায় তৈরি খাবার সরবরাহ করছেন নাজমা পারভীন। তিনিও উই গ্রুপে যুক্ত আছেন নাজমাস কিচেন নামে। শুরু করেছিলেন আচার বানিয়ে বিক্রির মাধ্যমে। করোনার প্রকোপ বাড়ার পর রান্না করা খাবারের ফরমাশ আসতে থাকে নাজমাস কিচেনে। রমজানে ইফতারি ছাড়াও সাহ্রিতে খাবার দিচ্ছেন তিনি। ঈদের জন্য অর্ডার নিচ্ছেন।
ঠিকানা: fb.com/nazmaskitchenn
দিবাস ডেলিকেসি
২০১৮ সাল থেকে ফারাহ ইউসুফ রান্না করা খাবার সরবরাহ করলেও ২০২০ সালে এসে সেটা কয়েক গুণ বেড়ে গেছে। এর প্রধান কারণ করোনা বলেই জানালেন ফারাহ। দিবাস ডেলিকেসি নামের তাঁর পেজে এখন এত খাবারের ফরমাশ আসে যে একা পেরে উঠছেন না। আগের দিন তাঁর পেজে অর্ডার করতে হয়। প্রয়োজনীয় আলোচনা শেষে ঢাকা শহরে খাবার সরবরাহ করেন ফারাহ। সব ধরনের প্রধান খাবার অর্ডার নেন তিনি। ফারাহ জানালেন, তাঁর হাতের বিশেষ দুটি পদ আনারস ইলিশ আর তেহারি।
ঠিকানা: fb.com/Deebas.Delicacy
এনস কিচেন
যেকোনো বেলার জন্য যেকোনো ধরনের খাবার অর্ডার করতে পারেন ফাতেমা আবেদিনের এনস কিচেনে। ২০২০ সালের জানুয়ারি মাস থেকে ঢাকায় নিয়মিত অনলাইন অর্ডার দিয়ে খাবার সরবরাহ করছেন তাঁরা। এনস কিচেনে সবচেয়ে জনপ্রিয় দেশি খাবার, ছোট মাছ ও ভর্তা। সাধারণত এক দিন আগে খাবারের অর্ডার দিলেই পরদিন খাবার মেলে।
ঠিকানা: fb.com/Ns-Kitchen-768804389921888
নাসরিন কিচেন
চট্টগ্রামের কাফকো হাউজিং কলোনি এলাকায় অনলাইনে খাবার সরবরাহ করেন নাসরিন আক্তার। ভাত, মাছ, মাংস, পোলাও, বিরিয়ানি, মেজবানিসহ চট্টগ্রমের বিশেষ বিশেষ পদের খাবারও অর্ডার নেন নাসরিন। অনলাইন পেজে বা ফোনে খাবার ফরমাশ দেওয়ার পর সেই অনুযায়ী সরবরাহ করেন নাসরিন।
ঠিকানা: fb.com/nasrinkitchen
সুস্বাদু আহার
পুরো চট্টগাম শহরেই খাবার সরবরাহ করেন নিশাত তাসনিম। সব ধরনের খাবার রান্না করলেও তাঁর বিশেষ পরিচিতি মিলেছে রোস্ট ও পোলাওয়ের জন্য। ঈদের দিনের জন্যও কেউ চাইলে খাবার অর্ডার করতে পারেন নিশাতের পেজ সুস্বাদু আহারে। অর্ডারের পরিমাণ বেশি হলে শহরের বাইরের উপজেলায়ও ডেলিভারি করেন। সাধারণত ২৪ ঘণ্টা আগে খাবারের ফরমাশ দিতে হয় নিশাতকে।
ঠিকানা: fb.com/susshaduahaar/
স্নিগ্ধাস কিচেন
মাকসুদা বেগমের উদ্যোগ স্নিগ্ধাস কিচেন। চট্টগ্রাম শহরের সব এলাকায়ই খাবার সরবরাহ করেন মাকসুদা। বিভিন্ন রকম ফ্রোজেন ফুড, বিরিয়ানি, কাবাব, মিষ্টান্ন, মেজবানি, কালাভুনাসহ যেকোনো পদ অর্ডার নেন মাকসুদা।
ঠিকানা: fb.com/Snigdhaskitchen 1
এনএস ফুড কর্নার
দুপুর বা রাতের খাবার ছাড়াও পোলাও, বিরিয়ানি, সেমাইসহ নানা রকম খাবারের অর্ডার নেন বগুড়া শহরের এনএস ফুড কর্নার। ২০১৯ সালের
নভেম্বর থেকে নিয়মিত বাসায় রান্না করা খাবার সরবরাহ করছে তারা। ফেসবুক পেজে থাকা ফোনে অর্ডার করলেই খাবার পৌঁছে যাবে আপনার বাড়িতে। ঠিকানা:fb.com/nsfoodcorner