
ইট-কাঠের এই শহরে প্রকৃতিপ্রেমিকেরা কি হাত গুটিয়ে বসে থাকবেন! চারপাশে সবুজের অভাব ঘোচাতে শুরু করতে পারেন বিকল্প বাগান তৈরির কাজ। নগরজীবনেও এখন গ্রামের মতো ছয় ঋতুর স্বাদ কিছুটা হলেও উপভোগ করা যায়। অনেকেই এক টুকরো বারান্দা কিংবা ছাদে বিভিন্ন মৌসুমের শাকসবজি ও ফলমূলের চাষ করেন। একেকজন একেকভাবে নিজের বাগানটি সাজাতে চান। কেউ আনন্দ পান দুর্লভ গাছের সংগ্রহ গড়ে তুলতে, কেউ আবার শাকসবজি বা ফলমূল লাগিয়ে মজা পান। ইদানীং টব-আশ্রয়ী এসব বাগানের বিচিত্রতায় যোগ হয়েছে নতুন নতুন মাত্রা।
মাত্র কয়েক বছর আগেও মানুষ শুধু আলংকারিক বৃক্ষের চাষ করলেও এখন যোগ হয়েছে আরও নানা প্রাকৃতিক উপাদান। টবেই এখন ফলছে পুঁইশাক বা ডাঁটাশাকের মতো অনেক ধরনের মাঠের ফসল। প্রকৃতিতে এখন মধ্য শরৎ। আর কয়েক দিনের মধ্যেই শীতের ফুল ও শাকসবজি চাষের জন্য টবগুলো প্রস্তুত করতে হবে। তার আগে আবার স্বল্পকালীন কিছু শাকও চাষ করে নেওয়া যেতে পারে। যেমন কলমি, ডাঁটা, লালশাক, পাটশাক, ঢ্যাঁড়স ও পালংশাকের ফলন অল্প সময়ের মধ্যেই পাওয়া যায়। তা ছাড়া মরিচ, থানকুনি, পুদিনা ও বেগুনের ফলন প্রায় সারা বছরই থাকে। যাঁরা গরমের শুরুতে করলা, বরবটি, শসা, চিচিঙ্গা লাগিয়েছেন, তাঁরা নিশ্চয় আরও আগে ফলন পেয়েছেন।
আপনার ছাদে যদি এসব ফলানোর জন্য বেড তৈরি করার সুযোগ থাকে, তাহলে প্রথমেই ১০ ফুট দীর্ঘ এবং ১ ফুট প্রস্থ একটি বেড তৈরি করে নিন। তবে ছাদ থেকে একটু উঁচুতেই বেড বানানো উত্তম। তাহলে জমানো মাটি ছাদে কোনো জলাবদ্ধতা তৈরি করবে না। এ ক্ষেত্রে পানিনিষ্কাশনব্যবস্থা যথাযথ হওয়া চাই। তারপর প্রস্তুত করে নিতে হবে মাটি। এ ক্ষেত্রে ঝুরঝুরে দোআঁশ মাটিই উত্তম। মাটির তিন ভাগের এক ভাগ শুকনো গোবর সার, আড়াই শ গ্রাম সরিষার খইল এবং ১০ গ্রাম পটাশ ও টিএসপি পানি মিশিয়ে সাত দিন ভিজিয়ে রাখতে হবে। মাটি শুকিয়ে গেলে বেড বা টবে রাখার পর চারা লাগানোর কাজ শুরু করতে হবে।
শীত মৌসুমে আপনি চাষ করতে পারেন বিভিন্ন মৌসুমি ফুল আর শীতের শাকসবজি। বর্ষজীবী এসব ফুল চাষে প্রতি মৌসুমেই টাটকা বীজ বুনতে হয়। অল্প সময়ের মধ্যেই ফুল হয়, তারপর বীজ। অধিকাংশ মৌসুমি ফুলই টবজাতীয় পাত্রে লাগানোর পক্ষে আদর্শ। সেগুলো হচ্ছে অ্যাস্টার, কারনেশন, ক্যালেন্ডুলা, পিটুনিয়া, প্যানজি, সূর্যমুখী, মোরগঝুঁটি, হলিহক, জারবেরা, ন্যাস্টারসিয়াম, গাঁদা, জিনিয়া ইত্যাদি।
ঘরদোর সাজানোর জন্যও কিছু কিছু বর্ষজীবী ফুল দরকার হয়। যেমন আর্কটটিস, কারনেশন, চন্দ্রমল্লিকা, করিওপসিস, কর্নফ্লাওয়ার, কসমস, ডালিয়া, লুপিন, পপি, সুইট সুলতান, সুইট-পি ইত্যাদি। আর শাকসবজির মধ্যে টমেটো থেকে শুরু করে বেগুন, মুলা, বাঁধাকপি, শিম, পেঁয়াজ, রসুন, লালশাক, টকপালং, সরিষা, ধনেপাতা; হেন জিনিস নেই যা এখন টবে চাষ হয় না।
শাকসবজি ও ফুলের কিছু চারা পাওয়া যায় ঢাকার আসাদগেটের সরকারি হর্টিকালচার সেন্টার এবং রামপুরার বনশ্রীসংলগ্ন মেরাদিয়া বাজারসহ বিভিন্ন নার্সারিতে। ঢাকা কলেজের গেটেও কিছু কিছু চারা পাওয়া যায়। বীজের জন্য যেতে হবে পুরান ঢাকার আলুবাজারে।
এ ধরনের শাকসবজির জন্য খুব বেশি গভীরতার মাটি বা বেড প্রয়োজন হয় না। যদি বেড করার কোনো সুযোগ না থাকে, তাহলে বড় মাপের টবে যেসব গাছ রয়েছে, তার গোড়াতেই বুনে দিতে পারেন এসব শাকসবজি। ভালো ফলন পেতে হলে নিয়মিত সেচ করা প্রয়োজন। ভালোভাবে পরিচর্যা করতে পারলে অল্প সময়ের মধ্যেই ফলন পাওয়া সম্ভব। নিজের হাতে বোনা বাগানের এসব টাটকা শাকসবজি খাওয়ার চেয়ে দেখেই অনেক আনন্দ।