
চাকমা জনগোষ্ঠীর মধ্যে প্রচলিত আছে, বিঝু উৎসবের দিন কারও বাড়িতে গেলে অবশ্যই পাজন খেতে হবে। কেবল একটি বাড়িতে নয়, খেতে হবে অন্তত ১০টি বাড়িতে। না হয় পরের জন্মে মানবজন্ম নাও হতে পারে।
পাজন অর্থাৎ পাঁচন কেবল সুস্বাদু সবজির ঘন্ট নয়, এটি চাকমা-মারমা-ত্রিপুরাসহ পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর উৎসব পালনের অন্যতম উপকরণ। ঈদে যেমন সেমাই, তেমনি বিঝু বা নববর্ষের পার্বণে পাজন অতিথি আপ্যায়নের অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গ।
চাকমা সমাজে তিন দিন ধরে উদ্যাপিত হয় বিঝু উৎসব। প্রথম দিন নদীতে ফুল ভাসানোর মধ্য দিয়ে শুরু হয় ফুল বিঝু। নানা আচার অনুষ্ঠান আর শুভেচ্ছা বিনিময়ের মধ্য দিয়ে কাটে উৎসবের প্রথম দিন। তবে মূল বিঝু নামে পরিচিত উৎসবের দ্বিতীয় দিন মূলত খানাপিনার জন্য বরাদ্দ। এ দিন বাড়ির সদর দরজা সব অতিথির জন্য খোলা। পাজন দিয়ে শুরু হয় ভোজনের পর্ব। তালিকায় থাকে আরও নানা পদের খাবারদাবার। এসবের মধ্যে আছে তরমুজসহ নানা ফল, বিন্নি চালের পিঠা, মটর ডাল দিয়ে তৈরি খাবার, দই ও নানা ধরনের পানীয়। পরিবারভেদে পদের ভিন্নতা থাকলেও একটি পদ সব বাড়িতে থাকবেই—আর তা হলো পাজন।
চাকমা বাড়িতে বিঝুর দিন নিমন্ত্রণ খেতে যাওয়াকে সংক্ষেপে বিঝু খাওয়াও বলা হয়। কোনো বাড়িতে বিঝু খাওয়া কেমন হলো, তা নির্ভর করে অনেকটা পাজনের স্বাদের ওপর। পাজন ভালো হলে অতিথির তৃপ্তি। বিঝু খাওয়াও হয় পরিপূর্ণ। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বিরতিহীন চলে পাজন খাওয়ার এই পর্ব। তাই উৎসবের তৃতীয় দিন ভোজন ক্লান্ত শরীরকে একটু বিশ্রাম দেন সবাই। বিছানায় গড়াগড়ি খাওয়ার এই দিনটির নাম গজ্যেপজ্যে বিঝু।
২০ থেকে ৩০ পদের শাকসবজি দিয়ে পাজন রান্না করা হয়। কিছুটা মিল থাকলেও বাঙালির পাঁচনের সঙ্গে পাজনের পার্থক্য রয়েছে রন্ধনপদ্ধতি ও স্বাদে। পাজনে শুঁটকিসহ বিভিন্ন ধরনের শুকনো মাছও ব্যবহার করা হয়। তাই পাজনের স্বাদ একেবারেই আলাদা।
রাঙামাটির লেখক সুগত চাকমার মতে, বাংলা ‘পাঁচন’ শব্দ থেকে পাহাড়িদের ‘পাজন’ শব্দটি এসেছে। তবে খাদ্যাভ্যাসের কারণে ‘পাঁচন’ ও ‘পাজন’ রান্নার পদগুলো হয় ভিন্ন। পাঁচনের চেয়ে অনেক বেশি পদ থাকে পাজনে। বাজারে পাওয়া যায় এমন সবজি তো থাকেই পাজনের স্বাদ বাড়ায় নানা ধরনের বুনো সবজি, আলু, কন্দ ও ফুল। সব মিলিয়ে ২৫ থেকে ৩০ বা তারও বেশি সবজি দিয়ে পাজন রান্না হয়।
পাজন রান্নার প্রস্তুতি বিঝুর বেশ আগে থেকেই শুরু হয়। এ জন্য কয়েক মাস আগে থেকে বড় মাছ শুকিয়ে রাখা হয়। এ ছাড়া কাঁচা কাঁঠাল, আম, তারা, বেতাগী (মরিচ বেতের গোড়ার অংশ), বেত প্রজাতির চাংকুল, কাট্টোল ডিঙি এবং নানা প্রকার জংলি আলু ও কন্দ সংগ্রহ করে সবাই উৎসবের আগেই।
প্রতিবছর বিঝুতে চাকমা রাজবাড়িতেও পাজন রান্না হয় বলে জানালেন চাকমা রাজা দেবাশীষ রায়ের স্ত্রী রানি য়েন য়েন। তিনি বলেন, ‘পাজন না থাকলে কি বিঝু হয়? চাকমা রাজবাড়িতে অনেক প্রকারের সবজি আর শুকানো মাছ দিয়ে পাজন রান্না হয়। যাঁরা আসেন তাঁদের সবাইকে পাজন পরিবেশন করা হয়। আমরাও বিঝুর দিন কারও বাড়িতে গেলে সামান্য হলেও পাজন মুখে দিয়ে দেখি। এটা আমাদের ঐতিহ্যের অংশ।’
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগের স্নাতকোত্তর শ্রেণির ছাত্রী ডিমানা চাকমার কাছে বিঝুর আনন্দই হলো মায়ের হাতের পাজন চেখে দেখা। এবার মায়ের সঙ্গে তিনিও রান্নায় হাত লাগাবেন। ২৫ পদের সবজির সঙ্গে শুঁটকি মাছ দিয়ে রাঁধবেন পাজন।
বিঝুর সময় রান্না করা পাজন বছরের অন্য সময়ের পাজনের চেয়ে অনেক বেশি সুস্বাদু হয় বলে মনে করেন চাকমা সম্প্রদায়ের লোকজন। এর কারণ জানতে চাইলে সংস্কৃতিকর্মী শিশির চাকমা বলেন, বিঝুর সময় অর্থাৎ চৈত্র ও বৈশাখ মাসে প্রকৃতিতে ফল-মূল ও সবজি জন্মে। অন্য ঋতুতে এসব হয় না। সে কারণে বৈশাখে পাজন রান্নায় এত পদের সমাগম ঘটানো সম্ভব হয়। আর এ জন্য বিঝু-সাংগ্রাই বৈসুক-বিষু-বিহু উৎসবে রান্না করা পাজন অন্য সময়ের চেয়ে বেশি সুস্বাদু হয়।