
মনে পড়ছে কোনো একসময়ে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের একটা লেখা পড়েছিলাম। লেখাটির নাম ‘নেশা’। মানুষকে যে কত রকমের নেশায় পেয়ে বসে, লেখক তার একটি খতিয়ান দিয়েছিলেন। আজ নিজের বেলায় সেই নেশার কথা স্মরণ করছি। শৈশবে খেলাধুলার নেশা, ছাত্রজীবনে রাজনীতি ও পরবর্তীকালে সাংবাদিকতা; তারও পরে শিক্ষকতার নেশায় পেয়ে বসেছিল আমাকে।
প্রায় ৫০ বছর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতায় নিয়োজিত থেকেছি। আর মেতে থেকেছি বই পড়ার নেশায়। কোন বইটা যে প্রথম পড়েছিলাম, কাল ব্যবধানে আজ আর সেটি বলতে পারব না। তবে এইটুকু মনে আছে, দক্ষিণারঞ্জন মিত্রের ঠাকুরমার ঝুলি ও ঠাকুরদার ঝুলি ভীষণভাবে মাতিয়ে রাখত আমাকে। ছাত্রজীবনে বেশি টানত দুঃসাহসিক অভিযানের বই। পাঠ্যবইয়ের ফাঁকে ফাঁকে দেশি-বিদেশি অভিযানের গল্প নেশাগ্রস্ত করে রাখত মাতালের মতো। অভিযান বলতে হিমালয়ের অভিযান, কলম্বাসের আমেরিকা আবিষ্কার, ক্যাপ্টেন কুকের অস্ট্রেলিয়ার মুখে সাত সমুদ্র পাড়ি দেওয়া ইত্যাদি। বাংলা সাহিত্যের প্রতি টান শুরু হয় শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের বই পড়ে। প্রথম পড়ি শ্রীকান্ত। বইটি পাঠ্যবইয়ের পড়ার আড়ালে লুকিয়ে লুকিয়ে পড়তাম কিন্তু আব্বার কাছে ধরাও পড়ে যেতাম। তারপর আচ্ছামতো মার! উপন্যাস, গল্প প্রভৃতি পড়ার ক্ষেত্রে আব্বার কড়া বারণ ছিল। তবে আবারও বলি, সেই যে নেশার টান, সেই নেশা কেন যেন পড়ার জন্য ভেতর থেকে বারবার তাগাদা দিত আমায়। এরপর ছাত্র আন্দোলনে জড়িয়ে আমার দিন-রাত সমান হয়ে যায়। সেই সময় বারবার পড়া উপন্যাসটির নাম পথেরআরেকটু বেশি বয়সে রবীন্দ্রনাথের গল্প-উপন্যাস বেশি টানত। তাঁর বৌ ঠাকুরানীর হাট কবে প্রথম পড়েছি, আজ আর মনে নেই। রবিঠাকুরের আরেকটি উপন্যাস চোখের বালি। এর নায়িকা বিনোদিনী। এই চরিত্রটিকে বুঝে নিতে আমার সময় লেগেছে। ভালো লেগেছে নৌকাডুবি উপন্যাসটি। ওই আমলে এ ধরনের উপন্যাস কোন দুঃসাহসে রচিত হয়েছে, ভেবে খেই পাই না। এরপর বলতে পারি, ঘরে-বাইরে-এর কথা, এই উপন্যাসের বিমলা চরিত্রের অন্তর্দ্বন্দ্বের কথা।নষ্টনীড়’ গল্পটি এরও পরে লেখা। এখানে চারুলতার অন্তরেও সেই একই দ্বন্দ্ব। শেষের দিকে আসছে শেষের কবিতা। বড় মুগ্ধ হয়েছিলাম এটি পড়ে। অভিভূত করেছিল লাবণ্যর কাহিনি। এখনো মনে পড়ে শেষের কবিতার দুটি চরণ—‘মোর লাগি করিও না শোক, আমারও রয়েছে কর্ম, রয়েছে বিশ্বলোক।’গল্প-উপন্যাসের সঙ্গে সঙ্গে কবিতাও আমাকে দারুণভাবে আকৃষ্ট করে। শুরুটা অবশ্য রবীন্দ্র-নজরুলকে দিয়েই। পরে মধুসূধন দত্তের মেঘনাদবধ কাব্য এবং রবীন্দ্রনাথের কাব্যসম্ভার। শৈশব থেকেই নজরুলের কবিতা পড়েছি। পাঠ্যবইয়ে সংকলিত তাঁর কবিতাগুলো এত দিন পরও উচ্চকণ্ঠে আবৃত্তি করি। অগ্নিবীণা, বিষের বাঁশি, ভাঙ্গার গান, সর্বহারা, সাম্যবাদী—এই বইয়ের কবিতাগুলো ভালো লাগে। এই বয়সেও যেন শুনতে পাই, ‘দুর্গম গিরি, কান্তার-মরু, দুস্তর পারাবার’।শেষে যে কবিতাটির কথা না বললেই নয়, সেটি আমাদের সতীর্থ কবি শামসুর রাহমানের ‘স্বাধীনতা তুমি’। কবিতাটি সারাক্ষণ আমাকে আলোড়িত করে। বিশ্বাস করি আমার মতো একইভাবে সব সৎ বাঙালিকে তাড়িত করে এই কবিতা।