তোমাকে ছাড়াই আজ বৃষ্টি দেখব। ভীষণ জেদ চেপেছে আমার। সুজাতারাই কেন কেবল লাখপতি স্বামী নিয়ে সুখে থাকে? আর মন হারিয়ে আমাদের পড়ে থাকতে হয় আস্তাকুঁড়ে। এর একটা বিহিত হওয়া দরকার। বৃষ্টি এলে কতই না জ্বালিয়েছি তোমাকে। মাঝরাতে ফোনে ডেকে তুলেছি বৃষ্টি দেখব বলে। তুমি তখন পড়াশোনার শেষে মাত্র ঘুমাতে গেছ। তবু কাঁচা ঘুম ভেঙে আমার সঙ্গে বৃষ্টির গান শুনতে। তুমি রাজপুরিতে...আমি পর্ণ কুটিরে, তবু আমাদের এ পাগলামি আটকাতে পারেনি কেউ। আজ মুক্ত আকাশ তোমাকে ডেকেছে, ভীষণ তাড়া তোমার। খুঁজে দেখলাম, শেকলের চাবিটা আমার হাতে, খুলে দিলাম ভালোবেসে। তাই বলে ছ্যাঁকা খাওয়া ব্যর্থ প্রেমিকদের মতো নিজকে নিয়ে খেলব নাকি? কখনো না। একলা একলাই ভালো থাকব। বৃষ্টি দেখব, বৃষ্টির গান শুনব। তাই বৃষ্টির আওয়াজ পেয়ে এই মাঝরাতে হলের ছাদে উঠেছি। মুঠোফোনটা রেখে এসেছি। আজ আমি প্রেমিক নই, কবি। তাই একলা ছাদের রেলিংয়ে গা ঢাকা দিয়ে অন্ধকারে চেয়ে আছি বৃষ্টি দেখার ভান করে। আকাশটা আজ ভীষণ কালো। সে কালোয় বৃষ্টি দেখা যায় না। কেবল শব্দ শোনা যায়—মাঠে-ঘাসে বৃষ্টির ফোঁটা আছড়ে পড়ার শব্দ, অনেকটা আর্তনাদের মতো। আশ্চর্য! কদিন আগেও বৃষ্টিগুলো নূপুরের মতো বাজত। চক্রান্ত! সবাই আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে। দুই হাতে কান চেপে ধরলাম। বেশ কাজ হলো তাতে। এখন কোনো আওয়াজ নেই। স্তব্ধ নীরবতা আর ভেজা বাতাসের ঝাপটায় বৃষ্টি এখন পুরোটাই অনুভূতিতে। অনুভব করতে লাগলাম তাকে। চোখ বুজতেই ভয় গ্রাস করল আমাকে। শূন্যতার ভয়। কিসের যেন চাপা দীর্ঘশ্বাস সে শূন্যতায়। শেষকালে দেবদাস হয়ে গেলাম নাকি? নিজের ওপর চরম রাগ হলো। দূর, এর চেয়ে সবার মতো আয়েশ করে ঘুমিয়ে থাকলেও হতো। পকেট হাতড়ে মার্বেলটা হাতে নিলাম। নীল একটা মার্বেল। আমাকে দেওয়া তার প্রথম উপহার। ‘এটা সব সময় সঙ্গে রাখবা’ কথাটা মনে আছে। তাই পদত্যাগ করার দিন থেকে এ পর্যন্ত বেশ কয়েকবার ছুড়ে ফেলেছি এটাকে হারিয়ে ফেলার জন্য, পরে খুঁজে পেতে ভীষণ কষ্টও হয়েছে। তবু রাগ কমেনি, সব দোষ যেন ওটার! আচ্ছা, এখান থেকে ছুড়ে দিলে কেমন হয়? আর পাওয়া যাবে না নিশ্চিত। কী ভেবে পকেটে রেখে দিলাম। বুকপকেটে। না! অনেক হয়েছে। এবার রুমে ফিরি। উঠে পড়লাম। কিন্তু মন যে মানছে না। পৃথিবীকে বোঝাতে হবে, আমার কিছুতেই কিছু যায়-আসে না। উদাসীনতা দিয়ে শূন্যতাকে জয় করেছি আমি। বৃষ্টিটা আমি দেখেছি একলাই, পেরেছি আমি। ভাবতে ভাবতেই বিছানায় পৌঁছে গেলাম। একটানা ঝুমঝুম আওয়াজে চোখ জড়িয়ে এল ঘুমে। ব্যস, শুরু হলো একই গল্পের পুনরাবৃত্তি। একটা চাঁদনি রাত। একটা উঁচু জায়গা...ঘাসে মোড়া। সেখানে বসে আছি আমি আর একটা ছোট্ট পরি। বাতাসে চুল উড়ছে ওর। একটা চাদরে দুজন কোনো রকমে মুড়ে আছি, ওম নিচ্ছি দুজনের। কয়েক কদম সামনে নাম না জানা নদীটা বইছে। আমরা মুগ্ধ হয়ে চুপচাপ তাই দেখছি দুজনে। দৃশ্যে আজ নতুন একটা জিনিস আছে। আমাদের মাঝে একটা ছাতা, কেন যেন আজ ঝুম বৃষ্টি হচ্ছে—মাঠে, ঘাসে, আমাদের ছাতার ওপর নূপুরের আওয়াজ তুলে। বৃষ্টিমাখা বাতাস ঝাপটা দিয়ে গেল। শিউরে উঠলাম দুজন একসঙ্গে। যাক, আজও না হয় একসঙ্গেই বৃষ্টি দেখি। কাল থেকে সন্ন্যাসী হব। দেখে নিয়ো, ঠিকই পারব!!স্বরাজ দেবসোহরাওয়ার্দী হল, বাকৃবি, ময়মনসিংহ।