
চিত্রকলার প্রতি আমার আকর্ষণ বা টান, যা-ই বলি না কেন, তৈরি হয়েছে ঢাকায় আসার পর। আমার দুই মেয়ে, লারা ও মুনা ছবি আঁকা শিখত চারুকলা ইনস্টিটিউটের তৎকালীন শামসুন্নাহার শিশুকলা ভবনে। সেটা সত্তরের দশকের কথা। ওদের ছবি আঁকা শেখানোর পাশাপাশি আমিও মাঝেমধ্যে বিভিন্ন শিল্পীর ছবি প্রদর্শনী দেখতাম। দেখতে দেখতে একধরনের ভালো লাগা জন্মাল চিত্রকলার প্রতি। একবার চিত্রশিল্পী দিলারা জলির একটি চিত্রকলা প্রদর্শনীর উদ্বোধন করেছিলাম। সেটাও আজ থেকে ২০-২৫ বছর আগের কথা।
তবে চিত্রকলার সঙ্গে আত্মিক যোগাযোগ তৈরি হলো দেশ-বিদেশের বিভিন্ন চিত্রশালা ঘোরার পর থেকে। চিত্রশালা দেখা আমার একধরনের নেশা। দেশের বাইরে যাওয়ার সুযোগ হলেই, সেখানে গিয়ে আমি চিত্রশালা দেখতে যাই। এমন করে অসংখ্য চিত্রশালা দেখা হয়েছে। কলকাতা, দিল্লি, কেরালার চিত্রশালা দেখেছি। দেখেছি আমস্টারডামে ভ্যানগঘ মিউজিয়াম, লন্ডন মিউজিয়াম, ফ্রান্সের জিভারনিতে ক্লদ মঁনে মিউজিয়াম, ল্যুভর মিউজিয়ামের মতো বিশ্ববিখ্যাত চিত্রশালা। লন্ডনের টেট গ্যালারিতে পিকাসোর চিত্রকলা প্রদর্শনী দেখেছি। মোট কথা, যেখানেই গেছি, চিত্রশালা দেখার সুযোগ হাতছাড়া করিনি।
গত বছর প্যারিসে পেতি প্যালে মিউজিয়ামে রবীন্দ্রনাথের আঁকা সব ছবি নিয়ে একটি প্রদর্শনী হয়েছিল। সেটাও দেখার সুযোগ হয়েছে। আর এটাই আমার জীবনের সবচেয়ে আনন্দময় ঘটনা। ‘মোনালিসা’ দেখেছি ল্যুভর মিউজিয়ামে। ‘মোনালিসা’ দেখার তীব্র আকাঙ্ক্ষা আমার অনেক দিনের। তাই ছবির সামনে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়েও ছিলাম। কেন লোকে ছবিটিকে এত ভালো বলে, ব্যাখ্যা চেয়েছি, পাইনি। বিশ্বজুড়ে এই ছবির এত ভালো লাগা কিন্তু আমি নিজের ভেতর তেমন কিছু খুঁজে পাইনি। এটা হয়তো আমারই ব্যর্থতা।
চিত্রকলায় আমার পছন্দের অনেকটাই জুড়ে আছেন ভ্যানগঘ। তাঁর প্রতি আকর্ষণ তৈরি হয় তাঁর আত্মজীবনী পড়ে। পড়েছি আর চোখ ভিজিয়েছি। এরপর যেবার ভ্যানগঘ মিউজিয়ামে গিয়েছিলাম, অভিভূত হয়েছিলাম তাঁর জীবনাচরণ দেখে। বিস্ময় জেগেছে তাঁর বাসস্থান, শিল্পকর্ম দেখেও। তাঁর আঁকা অনেক ছবিই ভালো লেগেছে। তবে সবচেয়ে বেশি ভালো লেগেছে ‘সানফ্লাওয়ার’—ফুলদানিতে একগুচ্ছ সূর্যমুখী ফুল। ছবিটির কথা বলতেই মনে পড়ল আরেকজন বিখ্যাত শিল্পী ক্লদ মঁনের আঁকা ‘সানফ্লাওয়ারের’ কথা। এই ছবিতেও আছে ক্যানভাসজুড়ে সানফ্লাওয়ার। ক্লদ মঁনের সানফ্লাওয়ারও অসাধারণ! ছবিতে রঙের ঔজ্জ্বল্য বেশি। অন্যদিকে ভ্যানগঘের সূর্যমুখীতে নিচের পাপড়ি দুটোতে রঙের ঔজ্জ্বল্য কম। দুটো চিত্রকলা দেখে মনে হয়েছে, ভ্যানগঘের ছবি বেশি মাত্রায় জীবনের ব্যাখ্যা দেয়। ভ্যানগঘের আত্মজীবনী পড়ে, ছবিটি দেখে মনে হয়েছে, এ শিল্পীর জীবনও তো এমনই ম্রিয়মাণ।
শুধু ভ্যানগঘ নন। ভালো লাগে আরও অনেক শিল্পীর চিত্রকলা। প্রিয় শিল্পীর তালিকায় রয়েছেন জয়নুল আবেদিন, কামরুল হাসান, গণেশ পাইন ও অমৃতা শারগিল। তবে বিশেষভাবে টানেন এস এম সুলতান। তাঁর চিত্রকলায় তিনি যেভাবে নতুন ভঙ্গিতে শারীরিক অবয়ব এঁকেছেন, তা আমার কাছে এ দেশের মানুষের না-খেতে পেয়ে অপুষ্ট শরীরের বিপরীতে একটি স্বপ্নের জায়গা বলে মনে হয়। কাইয়ুম চৌধুরী, রফিকুন নবী, রোকেয়া সুলতানা, দিলারা বেগম জলি, শাহাবুদ্দিন ও ফরিদা জামানের ছবি আমার বেশ পছন্দের।
অনুলিখন: সুচিত্রা সরকার