আইন অধিকার

রেলওয়ের আইন মানতেই হবে

রেলপথে যেকোনো বাজার বসানো আইনত দণ্ড​নীয়। ছবি: প্রথম আলো
রেলপথে যেকোনো বাজার বসানো আইনত দণ্ড​নীয়। ছবি: প্রথম আলো

সমান্তরাল বয়ে চলা রেললাইনের দুপাশে প্রতিদিন দোকানের পসরা নিয়ে বসে থাকা লোকজন যেন একটু বেশি বেখেয়ালি। শুধু শখের বশে কি বেখেয়ালি হয় তারা? আইনকানুনের তোয়াক্কা না করে যারা এসব মানুষকে ডেকে আনে জীবনের শেষ স্টেশনে, তারা যেন ধরা-ছোঁয়ার বাইরে। লোভী ও ক্ষমতার দাপট দেখানো একদল লোক নিয়ম ভেঙে প্রতিদিন রেললাইনে গড়ে তোলে মৃত্যুর ফাঁদ। আর এ ফাঁদে পা দেয় সাধারণ দোকানি ও বিক্রেতারা। এই দোকানিদেরই-বা কী দোষ! একখণ্ড বসার জায়গায় দু-একটা মাছ, কিছু সবজি ও ফল বিক্রি করে যে মেটাতে হবে পেটের দায়। নিয়মনীতি তদারকি করার দায়িত্ব যাদের হাতে, সেই রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ এসব বিষয়ে একটু বেশিই নীরব। কয়েকটা প্রাণ ঝরে গেলে কয়েক মুহূর্তের লোক-দেখানো উচ্ছেদ অভিযান, এরপর আবার আগের সেই একই অবস্থা। ১১ সেপ্টেম্বর সকালে ঢাকার কাওরান বাজারের রেললাইনে মুহূর্তের বিভীষিকায় প্রাণ গেল চারজনের। কর্তৃপক্ষের কিছুটা ঘুম ভাঙতে দেখা যাচ্ছে। কিন্তু মনের মধ্যে একটা শঙ্কা, কয়েক দিনের উচ্ছেদ অভিযান কি থেমে যাবে অদৃশ্য সিগন্যালের দাপটে?
রেল কর্তৃপক্ষের কাছে আছে একাধিক শক্তিশালী আইন। এ আইন অনুযায়ী রয়েছে রেল এলাকা উদ্ধারে রেল কর্তৃপক্ষের অগাধ ক্ষমতা। আইন প্রয়োগের পাশাপাশি নিশ্চয়ই রেল কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব মানুষকে সচেতন করে তোলা। কিন্তু সচেতনতা সৃষ্টির উদ্যোগ তো দূরের কথা, আইনের প্রয়োগও নেই। প্রথম আলোর সংবাদ সূত্রে জানা গেছে, রাজধানী ও এর আশপাশে আট মাসে রেলওয়ে দুর্ঘটনায় ২৬৮ জনের মৃত্যু হয়েছে।
রেলওয়ে পরিচালনার জন্য দেশে আছে রেলওয়ে আইন ১৮৯০। এ আইনে রেল চলাচলের জন্য পূর্ণ দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া রেললাইনের আশপাশে যেন কোনো অবৈধ স্থাপনা না উঠতে পারে, এ জন্য কার্যকর আছে রেলওয়ে সম্পত্তি (অবৈধ দখল উদ্ধার) অধ্যাদেশ ১৯৭৯। রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনী অধ্যাদেশ ১৯৭৬ অনুযায়ী রেলওয়ের নিজস্ব নিরাপত্তা বাহিনী রয়েছে। রয়েছে রেল পুলিশ (জিআরপি)।
রেলওয়ে সম্পত্তি (অবৈধ দখল উদ্ধার) অধ্যাদেশ ১৯৭৯ অনুযায়ী রেলওয়ে সম্পত্তিতে কারও বেদখল হলে দায়ী ব্যক্তিকে সাত বছর পর্যন্ত জেল অথবা জরিমানাসহ উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করার বিধান রয়েছে। এ আইন অনুযায়ী বিনা পরোয়ানায় দায়ী ব্যক্তিকে রেলওয়ের নিরাপত্তা বাহিনী কর্তৃক গ্রেপ্তারের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী এ বিচার চলবে। আবার দেওয়ানি কার্যবিধিও ক্ষেত্রবিশেষে প্রয়োগ হবে এবং অবৈধ সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার ক্ষমতাও কর্তৃপক্ষকে দেওয়া হয়েছে। রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, রেললাইনের দুই পাশে ১১ ফুট জায়গা খালি রাখার নিয়ম রয়েছে।
সরকার রেলওয়ে নিরাপত্তাসংক্রান্ত আইনের পরিবর্তন আনার উদ্যোগ নিয়েছে। রেলের নিরাপত্তার জন্য নিয়োজিত রেলওয়ে পুলিশ ও রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর (আরএনবি) দায়িত্ব সমন্বয়ে প্রণীত রেল নিরাপত্তা বাহিনী অধ্যাদেশকে আইনে পরিণত করা হচ্ছে। এ ছাড়া রেলওয়ের সম্পত্তি পুনরুদ্ধারের জন্য নতুন আইনের বিষয়ে মন্ত্রিসভায় নীতিগতভাবে অনুমোদন করা হয়েছে।
এ তো গেল আইনকানুনের কথা, কিন্তু এর বাইরে আমাদের সাধারণ নাগরিক হিসেবে সচেতন হওয়া এবং অন্যদের সচেতন করা প্রয়োজন রয়েছে। আমরা যদি সকালবেলা কেনাকাটা জন্য কাছের রেললাইনের ধারে ফুটপাতে না যাই, তাহলে রেললাইনে বসা দোকানিরাও নিরুৎসাহিত হবে। রেললাইনের ধারে বসে থাকা দোকানিদের অন্তত তাদের জীবনের মূল্যবোধ গড়ে তোলার জন্য বোঝাতে হবে। আমরা যদি একই বিক্রেতাকে রেললাইনের পাশে না বসে অন্য কোনো নির্ধারিত জায়গায় দোকান বসানোয় উৎসাহিত করি এবং সেখান থেকে তার পণ্যটি কেনার অঙ্গীকার করি, তখন হয়তো তারা রেললাইনের পাশে অবাধে বিক্রি করতে নিরুৎসাহিত হবে; রেলপথ হবে সুরক্ষিত।
লেখক: আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট